সপ্তগ্রামের বিজেপি নেতার তৃণমূলে যোগদান:২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজার আগেই হুগলি জেলার রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় রদবদল ঘটে গেল। দীর্ঘ ছয় বছর পর গেরুয়া শিবিরের মোহ ত্যাগ করে নিজের পুরনো ঘরে ফিরলেন এক প্রভাবশালী মুখ। শ্রীরামপুরের এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কয়েক হাজার কর্মী-সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে শাসকদলের পতাকা হাতে তুলে নিলেন তিনি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে দক্ষিণবঙ্গের রাজনীতিতে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে, যা আগামী নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সপ্তগ্রামের বিজেপি নেতার তৃণমূলে যোগদান: হুগলির রাজনীতিতে বড়সড় চমক
বাংলার বিধানসভা ভোটের নির্ঘণ্ট প্রকাশ হওয়ার আগেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভাঙা-গড়ার খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে হুগলি জেলায় গেরুয়া শিবিরের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এল সপ্তগ্রামের বিজেপি নেতার তৃণমূলে যোগদান। দেবব্রত বিশ্বাস, যিনি একসময় সপ্তগ্রাম পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হিসেবে ঘাসফুল শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন, তিনি ২০১৯ সালে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে দীর্ঘ সময় সেখানে থাকার পর অবশেষে তাঁর মোহভঙ্গ হয়েছে।
শুক্রবার শ্রীরামপুরে তৃণমূলের জেলা নেতৃত্বের উপস্থিতিতে তিনি পুনরায় ঘাসফুল শিবিরে নাম লেখান। তাঁর এই দলবদল শুধুমাত্র একজন নেতার পরিবর্তন নয়, বরং কয়েক হাজার কর্মীর শাসকদলে অন্তর্ভুক্তি হুগলি জেলায় পদ্ম শিবিরের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। দেবব্রতবাবুর অনুগামীরা জানিয়েছেন, তারা নেতার সঙ্গেই ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন।
কেন হঠাৎ এই দলবদলের সিদ্ধান্ত নিলেন দেবব্রত বিশ্বাস?
দেবব্রত বিশ্বাসের মতে, বিজেপিতে যাওয়ার পর থেকেই তিনি নিজেকে সেখানে খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না। তাঁর অভিযোগ, গেরুয়া শিবিরের জেলা নেতৃত্বের একাংশ নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে তাকে কোণঠাসা করে রেখেছিল। দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বা কর্মসূচিতে তাকে ডাকা হতো না। এই বঞ্চনার বোধ থেকেই তিনি পুরনো দলে ফেরার কথা ভাবতে শুরু করেন।
পরবর্তীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নের জোয়ারে শামিল হতেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর মতে, বাংলার মানুষের কল্যাণে যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী কাজ করছেন, তার বিকল্প নেই। বিশেষ করে গরিব মানুষের জন্য সরকারি প্রকল্পগুলো পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই তিনি ফের ঘাসফুল পতাকা হাতে তুলে নিয়েছেন। সপ্তগ্রামের বিজেপি নেতার তৃণমূলে যোগদান তাই এলাকার মানুষের কাছে এক নতুন আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তৃণমূলে ফেরার পর দেবব্রত বিশ্বাসের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের এক নজরে বিবর্তন
নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে দেবব্রত বিশ্বাসের রাজনৈতিক যাত্রাপথ তুলে ধরা হলো:
| পর্যায় | রাজনৈতিক দল | প্রধান ভূমিকা/পদ |
|---|---|---|
| শুরুর সময় | তৃণমূল কংগ্রেস | সভাপতি, সপ্তগ্রাম পঞ্চায়েত সমিতি |
| ২০১৯ সাল | বিজেপি (যোগদান) | জেলা স্তরের প্রভাবশালী নেতা |
| ২০২১ সাল | বিজেপি | বিধানসভা নির্বাচনে সপ্তগ্রামের প্রার্থী |
| ২০২৬ (ভোটের আগে) | তৃণমূল কংগ্রেস (প্রত্যাবর্তন) | সাধারণ সক্রিয় কর্মী ও সমর্থক |
শ্রীরামপুরের সভায় শাসকদলের শক্তিবৃদ্ধি ও নেতাদের উপস্থিতি
শুক্রবার শ্রীরামপুরের সেই যোগদান সভায় চাঁদের হাট বসেছিল। হুগলি-শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের সভাপতি অরিন্দম গুঁইন, বিধায়ক অসীমা পাত্র এবং সপ্তগ্রামের বিধায়ক তপন দাশগুপ্তের উপস্থিতিতে দেবব্রত বিশ্বাস এবং তাঁর অনুগামীরা ঘাসফুলের পতাকা গ্রহণ করেন। মজার বিষয় হলো, ২০২১ সালের ভোটে তপন দাশগুপ্তের বিরুদ্ধেই লড়াই করেছিলেন দেবব্রতবাবু, আর আজ তাঁরা একই মঞ্চে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার শপথ নিলেন।
এই সপ্তগ্রামের বিজেপি নেতার তৃণমূলে যোগদান অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। সাদা জামা পরে কয়েকশ গাড়ির কনভয় নিয়ে যখন তিনি শ্রীরামপুরে পৌঁছান, তখন এলাকার মহিলারা তাঁকে ঘিরে ধরেন। সমর্থকদের দাবি, “আমরা কোনো দল চিনি না, আমরা দেবব্রত বিশ্বাসকে চিনি।” এই জনসমর্থনই প্রমাণ করে যে এলাকার রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব কতটা গভীর।
আগামী ২০২৬ সালের নির্বাচনে এই পরিবর্তনের প্রভাব কী হতে পারে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাব্বিশের ভোটের আগে দেবব্রত মণ্ডলের মতো একজন দক্ষ সংগঠকের প্রত্যাবর্তন শাসকদলকে অনেকটা সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছে দেবে। বিশেষ করে হুগলি জেলায় যুব সংগঠন তৈরি এবং জনসংযোগের ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। গেরুয়া শিবির ছেড়ে আসার সময় তিনি একা আসেননি, সাথে নিয়ে এসেছেন বিজেপির কয়েক হাজার সক্রিয় কর্মীকে।
সপ্তগ্রামের বিজেপি নেতার তৃণমূলে যোগদান নিয়ে এলাকায় কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, এর ফলে বিজেপি তাদের একজন লড়াকু প্রার্থীকে হারাল। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস তাদের হারানো জমি ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে আরও একধাপ এগিয়ে গেল। বিশেষ করে গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে দেবব্রত বিশ্বাসের যে জনপ্রিয়তা রয়েছে, তা ভোটবাক্সে শাসকদলের জন্য আশীর্বাদ হয়ে নামতে পারে।
বিজেপি ত্যাগের প্রধান কারণগুলো কী কী ছিল?
দেবব্রত বিশ্বাসের বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকটি বিশেষ কারণে তিনি গেরুয়া শিবির ত্যাগ করেছেন:
- দলের অভ্যন্তরে সঠিক সম্মানের অভাব এবং কোণঠাসা করে রাখা।
- জেলা নেতৃত্বের একগুঁয়েমি এবং তৃণমূল স্তরের কর্মীদের অবহেলা।
- রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া।
- নিজের অনুগামীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হওয়া।
তৃণমূল কংগ্রেসে ফেরার পর তাঁর আগামী লক্ষ্য কী?
তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এখন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য হলো:
১. বাংলার উন্নয়নকে পাড়ায় পাড়ায় পৌঁছে দেওয়া।
২. মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত শক্ত করা।
৩. ২০২৬ সালের নির্বাচনে সপ্তগ্রাম কেন্দ্র থেকে তৃণমূলকে বিপুল লিড এনে দেওয়া।
৪. বিজেপি থেকে আসা কর্মীদের সঠিক মর্যাদা নিশ্চিত করা।
এলাকার সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া এবং রাজনৈতিক পরিবেশ
দেবব্রতবাবুর এই প্রত্যাবর্তনে এলাকার রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শাসকদলের কর্মীরা উল্লাসে ফেটে পড়লেও, গেরুয়া শিবিরের স্থানীয় নেতাদের মধ্যে অস্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ তুঙ্গে। এলাকার মহিলারা বিশেষ করে তাঁকে সমর্থন জানিয়েছেন, কারণ তিনি সবসময় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন।
সপ্তগ্রামের বিজেপি নেতার তৃণমূলে যোগদান নিয়ে সাধারণ ভোটারদের বক্তব্য, নির্বাচনে যেই জিতুক না কেন, এলাকার উন্নয়নের কাজ যেন থমকে না যায়। দেবব্রত বিশ্বাসের ফিরে আসা মানেই এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নতুন গতি পাওয়া, এমনটাই বিশ্বাস করছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্নাবলী (FAQ)
দেবব্রত বিশ্বাস কবে তৃণমূলে ফিরেছেন?
তিনি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে, অর্থাৎ শুক্রবার (৩১ জানুয়ারি ২০২৬) শ্রীরামপুরে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তৃণমূলে যোগ দেন।
তিনি কি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করেছিলেন?
হ্যাঁ, তিনি ২০২১ সালে সপ্তগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, কিন্তু তৃণমূলের তপন দাশগুপ্তের কাছে পরাজিত হন।
তাঁর সাথে আর কতজন বিজেপি ছেড়েছেন?
দেবব্রত বিশ্বাসের সাথে প্রায় কয়েক হাজার বিজেপি কর্মী এবং সমর্থক আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করেছেন।



