লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ও শুভেন্দু অধিকারীর বার্তা

​নবান্নের সাংবাদিক বৈঠকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে প্রায় ৩০ লক্ষ ভুয়ো উপভোক্তা থাকার বিস্ফোরক দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া এবং অযোগ্য ব্যক্তিরা এই সুবিধা পাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ তাঁর। ১ জুন থেকে ৯০ দিনের জন্য নতুন অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার যোজনার যাচাইকরণ প্রক্রিয়া শুরু হলেও, আসল যোগ্য আবেদনকারীরা নিয়মিত আর্থিক অনুদান পেতে থাকবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন তিনি।

Lakshmir Bhandar scam updates: পশ্চিমবঙ্গের বহু চর্চিত আর্থিক অনুদান প্রকল্প লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়ে বর্তমানে রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশাল শোরগোল পড়ে গিয়েছে। নবান্নে আয়োজিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যের নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তাদের তালিকা নিয়ে এক বিস্ফোরক দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগের সরকারের আমলে চালু হওয়া এই জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির সুবিধাপ্রাপকদের তালিকায় এক বিশাল বড় দুর্নীতি বা গরমিল ধরা পড়েছে। যেখানে যাচাইকরণের অভাব এবং বেনিয়মের কারণে লক্ষ লক্ষ অযোগ্য ব্যক্তি সরকারি কোষাগার থেকে প্রতি মাসে টাকা তুলছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি কড়া তদন্ত এবং সার্বিক তালিকা শোধনের প্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

​লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প ও শুভেন্দু অধিকারীর বিস্ফোরক অভিযোগ

​নবান্নের প্রেস কর্নার থেকে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের তালিকায় প্রায় ৩০ লক্ষ ভুয়ো উপভোক্তা রয়েছেন। তিনি দাবি করেন, এই বিপুল সংখ্যক আবেদনকারী আসলে এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য আইনত যোগ্যই নন। দীর্ঘ প্রশাসনিক পর্যালোচনার পর এই ধরনের বেনিয়ম সামনে আসায় রাজনৈতিক মহলে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

​মুখ্যমন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়েছেন যে, ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম স্থায়ীভাবে বাদ চলে গিয়েছে, তারাও নিয়মিতভাবে এই প্রকল্পের টাকা পেয়ে যাচ্ছিলেন। এমনকি, দেশের নাগরিক নন এমন অনেক ব্যক্তিও এই তালিকার অংশ হয়ে উঠেছিলেন। প্রশাসনের নজরদারির অভাবেই যে এই ধরনের আর্থিক গরমিল দিনের পর দিন ধরে চলেছে, তা তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছেন।

​কারা এই সুবিধা পাওয়ার অযোগ্য এবং ভুয়ো নামের তালিকা

​সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী আরও কিছু নির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে এই বিশাল দুর্নীতির দিকটি সবার সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান যে, নারীদের জন্য নির্দিষ্ট এই বিশেষ কল্যাণমূলক অনুদান প্রকল্পের টাকা অনেক পুরুষ উপভোক্তার অ্যাকাউন্টেও চলে যাচ্ছিল। সঠিক নথিপত্র এবং ই-কেওয়াইসি (e-KYC) যাচাই না করার ফলেই যে ডেটাবেসে এই ধরনের বিভ্রান্তি ও বেনোজল ঢুকেছে, তা এখন প্রমাণিত।

​বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজ্য জুড়ে যে বিশাল সংখ্যক নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তার সাথে এই প্রকল্পের ডেটাবেস মেলানোর পরেই এই জালিয়াতি ধরা পড়েছে। প্রায় ৩০ লক্ষ অযোগ্য ব্যক্তির নাম চিহ্নিত হওয়ার পর এখন রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে পুরো ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য নতুন গাইডলাইন বা নির্দেশিকা তৈরি করা হচ্ছে।

​লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার এবং নতুন ভেরিফিকেশন

​রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মতো লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পটিকে আরও বড় আকারে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ যোজনায় রূপান্তরিত করার কাজ শুরু হয়েছে। যেখানে প্রতি মাসে অনুদানের পরিমাণ বাড়িয়ে ৩০০০ টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই নতুন ও বর্ধিত সুবিধা দেওয়ার আগে পুরো উপভোক্তা তালিকাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও পরিষ্কার করতে চায় প্রশাসন।

​মুখ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, যারা প্রকৃত অর্থেই যোগ্য এবং পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা, তাদের এই নতুন রূপান্তরের কারণে চিন্তিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। ১ জুন থেকে আগামী ৯০ দিন ধরে পুরো রাজ্য জুড়ে একটি ব্যাপক ভেরিফিকেশন বা যাচাইকরণ অভিযান চালানো হবে। অনলাইন এবং অফলাইন—দুই মাধ্যমেই আবেদনকারীদের নতুন ফর্ম পূরণ করে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে।

​যোগ্য উপভোক্তাদের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর মানবিক আশ্বাস

​তালিকায় বিপুল পরিমাণ ভুয়ো নাম পাওয়া গেলেও, বর্তমান মানবিক সরকার সাধারণ নারীদের আর্থিক নিরাপত্তায় কোনও কোপ বসাতে চায় না। শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, নতুন অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম পূরণ এবং যাচাইকরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত যোগ্য মায়েরা পুরনো নিয়মেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা পেতে থাকবেন।

​তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, প্রশাসনিক শুদ্ধিকরণের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে যেন কোনও দরিদ্র বা প্রান্তিক পরিবারের নারী তাদের মাসিক অনুদান থেকে বঞ্চিত না হন, সেদিকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। পঞ্চায়েত এবং পুরসভা স্তরে সরকারি কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই ফর্ম পূরণের কাজে সাধারণ মানুষকে সহায়তা করবেন, যাতে দ্রুত একটি স্বচ্ছ এবং নির্ভুল ডেটাবেস তৈরি করা সম্ভব হয়।

​কেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার তালিকায় এত বড় গরমিল ধরা পড়ল?

​মুখ্যমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, পূর্ববর্তী সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য কোনও রকম কড়া যাচাইকরণ বা ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন ছাড়াই যত্রতত্র এই প্রকল্পের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া বা ভিন দেশের নাগরিকেরাও এই শিথিলতার সুযোগ নিয়ে তালিকায় ঢুকে পড়েছিল।

বিজ্ঞাপন

​নতুন অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার যোজনায় আবেদন করতে কতদিন সময় পাওয়া যাবে?

​সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, ১ জুন থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ যাচাইকরণ এবং নাম নথিভুক্তকরণের প্রক্রিয়াটি টানা ৯০ দিন ধরে চলবে। উপভোক্তাদের তাড়াহুড়ো না করে সমস্ত সঠিক তথ্য দিয়ে ফর্ম পূরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

​ভুয়ো উপভোক্তা চিহ্নিত হলে সরকারি কোষাগারের কী সুবিধা হবে?

​এই ৩০ লক্ষ অযোগ্য এবং ভুয়ো আবেদনকারীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ফলে সরকারের বার্ষিক কয়েক হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় হবে। এই বেঁচে যাওয়া অর্থ প্রকৃত সুবিধাভোগী এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজে সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

Leave a Comment

Created with ❤