আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬: আর্জেন্টিনা থিম নিয়ে সল্টলেকে শুরু হলো প্রাণের উৎসব

আজ শুরু হলো ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬। সল্টলেকে মেলার উদ্বোধন করলেন মুখ্যমন্ত্রী। এবারের থিম আর্জেন্টিনা। জানুন মেলার সময়সূচী ও বিস্তারিত তথ্য।

আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬ (49th International Kolkata Book Fair Inauguration Update) : বইপ্রেমীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ থেকে শুরু হলো বাঙালির শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক উৎসব। সল্টলেকের বইমেলা প্রাঙ্গণে উদ্বোধন হলো ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে এই মেলা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। এবারের মেলায় লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা ফোকাল থিম কান্ট্রি হিসেবে উপস্থিত থাকায় এক অনন্য আন্তর্জাতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শীতের আমেজে বইয়ের গন্ধে মেতে উঠতে তৈরি শহর তিলোত্তমা।

আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬ এবং আর্জেন্টিনার বিশেষ চমক

বইমেলার প্রতিটি সংস্করণই নতুন কিছু নিয়ে আসে, তবে এবারের আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬ অনেক দিক থেকেই বিশেষ। পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড জানিয়েছে, আর্জেন্টিনা এবারই প্রথম এই মেলার থিম কান্ট্রি হিসেবে অংশ নিচ্ছে। আর্জেন্টিনার স্থাপত্যের আদলে তৈরি তোরণ থেকে শুরু করে তাদের দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রদর্শনী—সব মিলিয়ে সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্ক যেন এখন মিনি বুয়েনস আইরেস। ফুটবল পাগল বাঙালির কাছে মেসির দেশের সাহিত্য এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে।

মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশের জন্য মোট ৯টি তোরণ তৈরি করা হয়েছে। যার মধ্যে দুটি তোরণ সম্পূর্ণভাবে আর্জেন্টিনার শিল্পকলার ধাঁচে নির্মিত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মারিয়ানো আগুস্তিন কাওচিনো এবং গবেষক গুস্তাভো কানজোব্রে উপস্থিত থেকে এই আন্তর্জাতিক সেতুবন্ধনকে আরও মজবুত করেছেন। আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬ শুধুমাত্র বই বিক্রির জায়গা নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সংস্কৃতির মিলনস্থল হয়ে উঠেছে।

বইমেলার সময়সূচী ও যাতায়াতের সুবিধা

মেলাটি চলবে ২২ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পাঠকদের জন্য মেলার দরজা খোলা থাকবে। এবারের বইমেলায় যাতায়াতের জন্য বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পের সুবাদে শিয়ালদহ ও হাওড়া থেকে দর্শনার্থীরা খুব সহজেই সরাসরি করুণাময়ী বা সেন্ট্রাল পার্ক মেট্রো স্টেশনে পৌঁছে যেতে পারছেন। এর ফলে মেলায় যাতায়াত আগের তুলনায় অনেক বেশি সহজ এবং আরামদায়ক হয়েছে।

এছাড়া, বয়স্ক নাগরিকদের সুবিধার্থে ৩০ জানুয়ারি ‘সিনিয়র সিটিজেনস ডে’ পালিত হবে। মেলার নিরাপত্তার জন্য কলকাতা পুলিশের কড়া নজরদারি রয়েছে। আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬-এ বই কেনার পাশাপাশি দর্শনার্থীরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াতে পারেন, তার জন্য গিল্ডের পক্ষ থেকে একটি মোবাইল অ্যাপও লঞ্চ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সহজেই পছন্দের স্টল খুঁজে পাওয়া যাবে।

বইমেলা সংক্রান্ত একনজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

বিবরণতথ্য
মেলার সময়সীমা২২ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
উদ্বোধকমুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
ফোকাল থিম দেশআর্জেন্টিনা
মেলার স্থানবইমেলা প্রাঙ্গণ, সেন্ট্রাল পার্ক, সল্টলেক
অংশগ্রহণকারী দেশভারত সহ ২০টির বেশি দেশ

১৫ বছর পর বইমেলায় চিনের প্রত্যাবর্তন এবং মার্কিন অনুপস্থিতি

এবারের আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬-এ অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো দীর্ঘ ১৫ বছর পর চিনের অংশগ্রহণ। ২০১১ সালের পর তারা আর মেলায় স্টল দেয়নি, কিন্তু এবার তারা বিপুল সম্ভার নিয়ে ফিরে এসেছে। তবে অন্যদিকে, চলতি বছরে আমেরিকার কোনো প্যাভিলিয়ন না থাকায় অনেক পাঠক কিছুটা হতাশ। ইউক্রেনের মতো দেশ এবারই প্রথম তাদের নিজস্ব স্টল নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, যা বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সাহিত্যের এক শান্তিময় মেলবন্ধনের ইঙ্গিত দেয়।

বইমেলায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় এসবিআই অডিটোরিয়ামে থাকছে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ২৪ এবং ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে কলকাতা লিটারেচার ফেস্টিভ্যাল (KLF), যেখানে প্রখ্যাত সাহিত্যিক অমিতাভ ঘোষ এবং পরিচালক গৌতম ঘোষের মতো ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত থাকবেন। বিশ্ব সাহিত্যের এই আসর আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬-কে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

নিচে বইমেলার বিশেষ কিছু উল্লেখযোগ্য তোরণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি:

  • প্রয়াত সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায়ের নামে নামাঙ্কিত তোরণ।
  • শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা তোরণ।
  • শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী স্মরণে তোরণ।

আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬ নিয়ে কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

কলকাতা বইমেলা ২০২৬-এর থিম কান্ট্রি কোনটি?

এবারের বইমেলার ফোকাল থিম কান্ট্রি হলো লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা।

মেলা কতদিন চলবে এবং সময় কী?

মেলাটি ২২ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে।

বইমেলায় যাওয়ার জন্য নিকটস্থ মেট্রো স্টেশন কোনটি?

বইমেলা প্রাঙ্গণের ঠিক পাশেই রয়েছে করুণাময়ী এবং সেন্ট্রাল পার্ক মেট্রো স্টেশন।

সাহিত্যের আঙিনায় বাঙালির প্রাণের স্পন্দন

বইমেলা মানেই নতুন বইয়ের গন্ধ, লিটল ম্যাগাজিনের স্টল আর ঝালমুড়ি-চায়ে বাঙালির আড্ডা। আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬ এই ঐতিহ্যের ধারা অব্যাহত রেখেছে। মেলায় ১০০০-এরও বেশি স্টল রয়েছে, যেখানে বাংলা ও ইংরেজি ছাড়াও বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভাষার বই পাওয়া যাচ্ছে। গিল্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবার বই বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের রেকর্ডকেও ছাপিয়ে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এবারের মেলায় বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে ডিজিটাল উদ্ভাবনের ওপর। মেট্রো স্টেশনের টিকিট কাউন্টার এখন মেলার প্রবেশপথের পাশেই পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া যারা সরাসরি মেলায় আসতে পারছেন না, তাদের জন্য ভার্চুয়াল বইমেলারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে সশরীরে এসে বইয়ের পাতা ওল্টানোর যে আনন্দ, তা আর কিছুতে নেই। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬ বাঙালির জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

বইমেলায় এবারের মূল আকর্ষণগুলি একনজরে:

  1. আর্জেন্টিনার স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত বিশাল তোরণ।
  2. ১৫ বছর পর ফিরে আসা চিনের বড় স্টল।
  3. বন্দে মাতরম-এর ১৫০ বছর উদযাপন উপলক্ষে বিশেষ প্রদর্শনী।

উপসংহার ও মেলার ভবিষ্যৎ ভাবনা

আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালে কলকাতা বইমেলা তার সুবর্ণ জয়ন্তীতে পা রাখবে। সেই ৫০তম বর্ষের উদযাপনকে কেন্দ্র করে এখনই নানা পরিকল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে এই মুহূর্তে বইপ্রেমীদের পাখির চোখ কেবল সল্টলেকের এই বইমেলা প্রাঙ্গণ। সব বিভেদ ভুলে সাহিত্যের এই মিলনমেলা যেন আবারও প্রমাণ করে দিল, কলকাতাই বিশ্বের সাংস্কৃতিক রাজধানী। আপনিও তৈরি তো আপনার বইয়ের তালিকা নিয়ে?

Leave a Comment