​১লা এপ্রিল থেকে চালু হচ্ছে রাজ্যের নতুন ‘যুবসাথী’ স্কিম, মিলবে মাসিক ১৫০০ টাকা

সুখবর! রাজ্য সরকারের নতুন যুবসাথী প্রকল্পে আবেদনের দিনক্ষণ এগিয়ে এল। ১৫ই আগস্ট নয়, ১লা এপ্রিল থেকেই মিলবে মাসিক ১৫০০ টাকা। কারা আবেদন করতে পারবেন? লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থাকলেও কি টাকা মিলবে? জেনে নিন বিস্তারিত।

Yuvasathi Scheme West Bengal : পশ্চিমবঙ্গের যুব সমাজের জন্য এক বিশাল সুখবর নিয়ে হাজির হয়েছে রাজ্য সরকার। এতদিন যে জল্পনা চলছিল, তার অবসান ঘটিয়ে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিলেন, রাজ্যের বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য ঘোষিত নতুন আর্থিক সহায়তা পাওয়ার জন্য আর ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। খুশির হাওয়া বইছে রাজ্যজুড়ে কারণ সময়সীমা এগিয়ে আনা হয়েছে অনেকটাই। এই প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কীভাবে এই সুবিধা পাওয়া যাবে এবং কাদের জন্য এই বিশেষ সুযোগ অপেক্ষা করছে।

​১লা এপ্রিল থেকেই শুরু হচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত যুবসাথী প্রকল্প

​বাজেটে অর্থমন্ত্রী যখন ঘোষণা করেছিলেন, তখন বলা হয়েছিল যে স্বাধীনতা দিবস অর্থাৎ ১৫ই আগস্ট থেকে রাজ্যের বেকার যুবক-যুবতীরা এই নতুন প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। কিন্তু নবান্ন থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি বড় ঘোষণা করে জানিয়ে দিলেন, ছাত্র-যুবদের কথা মাথায় রেখে এই দিনক্ষণ এগিয়ে আনা হলো।

​নতুন অর্থবর্ষের শুরু থেকেই, অর্থাৎ ১লা এপ্রিল থেকেই যুবসাথী প্রকল্প কার্যকর হতে চলেছে। এর ফলে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ কর্মপ্রার্থী তরুণ-তরুণী উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারের এই ত্বরিত সিদ্ধান্ত বুঝিয়ে দিচ্ছে যে কর্মসংস্থান এবং বেকারদের আর্থিক সুরক্ষার বিষয়ে তারা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।

​কারা এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য? বয়সের সময়সীমা কী?

​স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে যে, এই প্রকল্পের আওতায় কারা পড়বেন? রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে যে রূপরেখা পাওয়া গেছে, তাতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে মূলত ২১ বছর থেকে ৪০ বছর বয়সী যুবক-যুবতীরা এই প্রকল্পের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এটি একটি অত্যন্ত ভাইটাল বয়সসীমা, কারণ এই সময়েই ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা শেষ করে চাকরির চেষ্টা করেন।

​শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও রাখা হয়েছে বিশেষ নিয়ম। বাজেট ঘোষণা অনুযায়ী, ন্যূনতম মাধ্যমিক পাশ করলেই এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, আপনি যদি মাধ্যমিক পাশ করে থাকেন এবং আপনার বয়স যদি ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে হয়, তবে আপনি এই প্রকল্পের একজন যোগ্য দাবিদার হতে পারেন।

​লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা কন্যাশ্রী থাকলে কি এই টাকা মিলবে?

​সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো, যারা ইতিমধ্যেই সরকারি কোনো প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন, তারা কি এই নতুন স্কিমের টাকা পাবেন? বিশেষ করে বাড়ির মহিলারা যারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পান বা ছাত্রীরা যারা কন্যাশ্রী বা ঐক্যশ্রী পাচ্ছেন, তাদের মনে এই ধোঁয়াশা ছিল।

​এই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই ধোঁয়াশা কাটিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, রাজ্য সরকারের অন্য কোনো স্কলারশিপ বা ভাতা চালু থাকলেও যুবসাথী প্রকল্প-এর টাকা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, আপনার যদি অন্য কোনো সরকারি স্কলারশিপ থাকে, তবুও আপনি এই নতুন প্রকল্পের জন্য আবেদন করতে পারবেন এবং মাসিক ১৫০০ টাকা করে সহায়তা পাবেন। এটি নিশ্চিতভাবেই রাজ্যের ছাত্রছাত্রী এবং মহিলাদের জন্য দ্বিগুণ খুশির খবর।

​মাসে কত টাকা এবং কতদিন পর্যন্ত পাওয়া যাবে?

​এই নতুন স্কিমের অধীনে প্রত্যেক যোগ্য প্রার্থীকে মাসে ১৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। বর্তমান বাজারে এই টাকা বেকার যুবক-যুবতীদের হাতখরচ বা চাকরির পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপের জন্য অনেকটাই সহায়ক হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতদিন এই টাকা পাওয়া যাবে?

​সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ৫ বছর পর্যন্ত এই টাকা দেওয়া হবে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। তবে এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। যদি এই ৫ বছরের মধ্যে কেউ চাকরি পেয়ে যান, তবে স্বাভাবিকভাবেই এই ভাতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

​কিন্তু যদি ৫ বছর পরেও কারোর চাকরি না হয়? সেক্ষেত্রেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। নিয়ম অনুযায়ী, ৫ বছর পর নাম রিনিউ বা নবীকরণ করা হবে। নবীকরণের পর আবারও এই আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে বলে জানা গেছে। অর্থাৎ, সরকার পাশে থাকার বার্তা দিচ্ছে দীর্ঘ সময়ের জন্য।

বিজ্ঞাপন

​একনজরে প্রকল্পের খুঁটিনাটি

বিষয়বিবরণ
প্রকল্পের নামযুবসাথী (Yuvasathi)
মাসিক ভাতা১৫০০ টাকা
শুরুর সময়১লা এপ্রিল (নতুন অর্থবর্ষ)
বয়সসীমা২১ থেকে ৪০ বছর
শিক্ষাগত যোগ্যতামাধ্যমিক পাশ
মেয়াদ৫ বছর (নবায়নযোগ্য)

আবেদন প্রক্রিয়া: অনলাইনে না অফলাইনে?

​আজকাল বেশিরভাগ সরকারি কাজ অনলাইনে হলেও, এই বিশেষ স্কিমটির ক্ষেত্রে নিয়ম কিছুটা আলাদা। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, এখনই অনলাইনে নাম রেজিস্ট্রেশন করা হবে না। অর্থাৎ আপনাকে বাড়িতে বসে কম্পিউটারে আবেদন করার সুযোগ এক্ষুনি দেওয়া হচ্ছে না। তাহলে উপায়?

​আবেদনের জন্য রাজ্যজুড়ে ২৯৪টি কেন্দ্রে বিশেষ ক্যাম্প বা শিবিরের আয়োজন করা হবে। অনেকটা ‘দুয়ারে সরকার’ শিবিরের ধাঁচে এই ক্যাম্পগুলো পরিচালিত হবে। সেখানে গিয়েই আপনাকে নাম লেখাতে হবে। এই ক্যাম্পগুলোতে তিনটি আলাদা বিভাগ থাকবে যাতে ভিড় সামলানো যায় এবং সুষ্ঠুভাবে কাজ হয়।

​কী কী নথিপত্র প্রয়োজন হতে পারে?

​যদিও অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত তালিকা বা গাইডলাইন খবরের কাগজে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে, তবুও সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় যে ক্যাম্পে যাওয়ার সময় আপনাকে কিছু প্রয়োজনীয় নথিপত্র অবশ্যই সাথে রাখতে হবে। প্রস্তুতি নিয়ে রাখা ভালো:

  • ​মাধ্যমিক বা উচ্চশিক্ষার মার্কশিট ও সার্টিফিকেট।
  • ​বয়সের প্রমাণপত্র (যেমন বার্থ সার্টিফিকেট বা মাধ্যমিকের এডমিট কার্ড)।
  • ​আধার কার্ড বা ভোটার কার্ড (পরিচয়পত্র হিসেবে)।
  • ​ব্যাঙ্কের পাসবুক (কারণ টাকা সরাসরি অ্যাকাউন্টে আসতে পারে)।
  • ​কাস্ট সার্টিফিকেট (যদি থাকে)।

​বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য নতুন দিগন্ত

​রাজ্যের অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য যখন বাজেট পেশ করেছিলেন, তখনই বোঝা গিয়েছিল যে ভোটের আগে এই বাজেট যথেষ্ট জনমুখী হতে চলেছে। নারী সমাজের জন্য লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ইতিমধ্যেই সুপারহিট। কন্যাশ্রী প্রকল্প বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে। এবার রাজ্যের বেকার যুবকদের দিকে বিশেষ নজর দিল সরকার।

​অনেক সময় দেখা যায়, পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরির প্রস্তুতির সময়ে অর্থের অভাবে অনেকে পিছিয়ে পড়েন। বই কেনা, ফর্ম ফিলাপ করা বা যাতায়াতের খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয়। মাসিক ১৫০০ টাকার এই সহায়তা সেই লড়াইয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। একে অনেকেই ‘পকেট মানি’ বা ‘বেকার ভাতা’-র নতুন সংস্করণ হিসেবে দেখছেন।

​সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও তার উত্তর (FAQs)

​কারা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না?

​সাধারণত যারা ইতিমধ্যেই সরকারি বা বেসরকারি কোনো স্থায়ী চাকরিতে নিযুক্ত আছেন, তাদের এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার কথা নয়। এই প্রকল্পটি মূলত কর্মহীন বা বেকার যুবক-যুবতীদের সাহায্য করার জন্য তৈরি। তবে নির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রকাশ হলে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।

​আমি কি পোস্ট অফিসের মাধ্যমে টাকা পাব?

​সাধারণত সরকারি প্রকল্পের টাকা এখন সরাসরি বেনিফিশিয়ারির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ডিবিটি (Direct Benefit Transfer) পদ্ধতির মাধ্যমে পাঠানো হয়। তাই একটি সচল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকা আবশ্যিক। পোস্ট অফিসের অ্যাকাউন্টেও টাকা আসতে পারে যদি তা সরকারি নিয়মের মধ্যে পড়ে।

​১৫ই আগস্টের বদলে ১লা এপ্রিল কেন?

​মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চেয়েছেন যাতে নতুন অর্থবর্ষ অর্থাৎ এপ্রিল মাস থেকেই ছাত্র-যুবরা এই সুবিধা পেতে শুরু করেন। ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা যাতে না করতে হয়, সেই কারণেই এই জনহিতকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

​ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আমাদের করণীয়

​আপাতত আমাদের নজর রাখতে হবে কবে থেকে ক্যাম্প শুরু হচ্ছে সেই দিকে। খবরের কাগজে খুব শীঘ্রই এই নিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। সেই বিজ্ঞাপনে বিস্তারিত নিয়মাবলী, ক্যাম্পের তারিখ এবং জায়গার নাম উল্লেখ থাকবে।

​আপনাদের উচিত হবে সমস্ত নথিপত্র গুছিয়ে তৈরি থাকা। যেহেতু অফলাইন প্রক্রিয়া এবং নির্দিষ্ট কেন্দ্রে গিয়ে আবেদন করতে হবে, তাই ভিড় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে দুয়ারে সরকারের মতো সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা থাকলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কম হবে বলে আশা করা যায়। রাজ্য সরকারের এই যুবসাথী প্রকল্প নিঃসন্দেহে বেকারত্বের জ্বালায় জ্বলতে থাকা যুবসমাজে এক পশলা বৃষ্টির মতো স্বস্তি নিয়ে আসবে।

​সবশেষে বলা যায়, এই উদ্যোগ যদি সঠিক ভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা রাজ্যের আর্থ-সামাজিক কাঠামোয় এক ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। পড়াশোনা জানা ছেলেমেয়েরা অন্তত হাতখরচের চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ার দিকে মন দিতে পারবে।

Leave a Comment

🌍
Created with ❤