পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬: ৮ লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝা ও আয়ের অস্পষ্ট দিশা

পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬ পেশ হতেই প্রকাশ্যে এল রাজ্যের ৮ লক্ষ কোটি টাকার বিশাল ঋণের বোঝা। আয়ের উৎস নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও সরকার আশাবাদী। পড়ুন বিস্তারিত বাজেট বিশ্লেষণ।

West Bengal Budget 2026: রাজ্য বাজেটে ঋণের বোঝা ৮ লক্ষ কোটি! আয়ের দিশা নিয়ে প্রশ্ন

​পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬ পেশ হওয়ার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতি ও অর্থনীতি মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বিধানসভায় বাজেট পেশ করার পরেই উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। একদিকে যেমন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের ডালি সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে রাজ্যের মাথায় ঋণের বোঝা দেখে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে অর্থনীতিবিদদের। পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যের বর্তমান ঋণের পরিমাণ ৮ লক্ষ কোটির গণ্ডি পার করে ফেলেছে, যা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে সব মহলে।

​পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬: ঋণের পাহাড় ও বাস্তব ছবি

​২০২৬ সালের রাজ্য বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং রাজ্যের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র একে ‘সুন্দর বাজেট’ বলে আখ্যা দিলেও, আড়ালে থাকা পরিসংখ্যান কিন্তু অন্য কথা বলছে। অনেকেই মনে করছেন, উন্নয়নের চাকচিক্য থাকলেও রাজ্যের কোষাগারের অবস্থা বেশ নড়বড়ে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লক্ষ ১৫ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের ঋণই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

​বামফ্রন্ট সরকার যখন ২০১১ সালে বিদায় নেয়, তখন রাজ্যের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। গত ১৫ বছরে সেই ঋণের বোঝা ফুলে-ফেঁপে প্রায় পাহাড়সম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬-এর তথ্যে স্পষ্ট যে, বিগত বছরগুলোর তুলনায় ঋণের পরিমাণ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, যেভাবে ঋণের বহর বাড়ছে, তাতে আগামী দিনে রাজ্যের আর্থিক পরিকাঠামো বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

​আগামী দিনের খরচ ও নতুন ঋণের লক্ষ্যমাত্রা

​পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬ পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, রাজ্য সরকার আগামী দিনের খরচ চালানোর জন্য আরও ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। জানা গিয়েছে, সরকার বাজার থেকে আরও ৮০,৪৪৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে। রাজ্যের ঘাড়ে যখন ইতিমধ্যেই ৮ লক্ষ কোটির বেশি ঋণের বোঝা, তখন নতুন করে এই বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

​বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণের টাকা দিয়ে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালানো হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা রাজ্যের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বাজেটে ব্যয়ের লম্বা তালিকা থাকলেও, সেই টাকা কোথা থেকে আসবে বা আয়ের সুনির্দিষ্ট দিশা কী, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, আয়ের স্থায়ী উৎস তৈরি না করে শুধুমাত্র ঋণের ওপর নির্ভর করে রাজ্য চালানো ভবিষ্যতে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

​আয়ের উৎস বনাম ঋণের বোঝা: এক নজরে

​রাজ্য সরকারের আয়ের উৎস এবং ঋণের বর্তমান পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:

বিভাগটাকার পরিমাণ / বিবরণ
বর্তমান মোট ঋণ৮,১৫,৮৯১ কোটি টাকা
২০১১ সালে ঋণের পরিমাণ১,৮৭,০০০ কোটি টাকা
নতুন ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা৮০,৪৪৪ কোটি টাকা
এসডিএসটি (SDST) থেকে সম্ভাব্য আয়৫৬,০০০ কোটি টাকার বেশি
কেন্দ্রীয় গ্রান্ট থেকে সম্ভাব্য আয়৪৭,০০০ কোটি টাকার বেশি
আবগারি শুল্ক থেকে সম্ভাব্য আয়২৪,০০০ কোটি টাকার বেশি

সরকারের যুক্তি ও পরিসংখ্যানের লড়াই

​এত বিশাল ঋণের বোঝা থাকার পরেও রাজ্য সরকার কিন্তু যথেষ্ট আশাবাদী। বাজেট পেশের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অমিত মিত্র সাংবাদিক বৈঠকে সরকারের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেন। তাঁদের দাবি, ঋণের পরিমাণ বাড়লেও জিএসডিপি (GSDP)-র সঙ্গে ঋণের অনুপাত আগের চেয়ে কমেছে।

​সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:

  • ​বাম জমানায় জিএসডিপির সঙ্গে ঋণের অনুপাত ছিল ৪৬ শতাংশ।
  • ​তৃণমূল সরকারের আমলে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭ শতাংশে।
  • ​২০১০-১১ সালে বাম জমানায় মোট ব্যয় (Total Expenditure) ছিল ৭২,৯৬২ কোটি টাকা।
  • ​২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লক্ষ ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

​অমিত মিত্রের যুক্তি, সরকার প্রচুর সম্পদ সৃষ্টি করেছে। রাজস্ব আদায় ২০১১ সালের পর থেকে প্রায় ছয় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মূলধনী খরচ বেড়েছে ১৮ গুণ। এছাড়া বাজেট ঘাটতি বর্তমানে ১.০১ শতাংশে নেমে এসেছে বলেও দাবি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬-এ সরকারের এই দাবিগুলো বেশ জোরের সঙ্গেই প্রচার করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

​বাজেটে বিরোধী পক্ষের অভিযোগ ও পাল্টা যুক্তি

​সরকার যখন উন্নয়নের পরিসংখ্যান তুলে ধরছে, তখন বিরোধীরা কিন্তু বাজেটের সমালোচনা করতে ছাড়ছে না। তাদের প্রধান অভিযোগগুলো হলো:

​১.  আয়ের দিশা নেই: বিরোধীদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬-এ খরচের কথা বলা হলেও আয়ের কোনো সুস্পষ্ট দিশা নেই। কোথা থেকে টাকা আসবে, তা পরিষ্কার নয়।

২.  ** অনুৎপাদক খরচ:** বিরোধীরা দাবি করছে, সরকার মূলত জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে টাকা খরচ করছে, যেখান থেকে সরাসরি কোনো আয় বা রিটার্ন আসে না।

৩.  পরিকাঠামোর অভাব: পরিকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার খাতে, যা ভবিষ্যতে আয় বাড়াতে পারে, সেখানে যথেষ্ট জোর দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।

৪.  ঋণ নির্ভরতা: রাজ্যের উন্নয়ন এখন পুরোপুরি ঋণ নির্ভর হয়ে পড়েছে, যা অর্থনীতির জন্য শুভ নয়।

​অন্যদিকে সরকার পক্ষ বলছে, মানুষের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়া এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।

​বাজেট ও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন (FAQs)

প্রশ্ন: পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬ অনুযায়ী রাজ্যের আয়ের প্রধান উৎস কী কী?

​উত্তর: রাজ্য সরকারের আয়ের প্রধান দুটি উৎস হলো রাজস্ব এবং আবগারি। সরকারের আশা, নতুন অর্থবর্ষে এসডিএসটি (SDST) থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় হতে পারে। এছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রান্ট হিসেবে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা এবং আবগারি শুল্ক থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজ্যের কোষাগারে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রশ্ন: রাজ্যের ঋণের বোঝা কি সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলবে?

​উত্তর: প্রত্যক্ষভাবে সাধারণ মানুষ হয়তো ঋণের বোঝা বুঝতে পারেন না, কিন্তু পরোক্ষভাবে এর প্রভাব পড়ে। ঋণের সুদ মেটাতে সরকারের অনেকটা টাকা চলে যায়, যা হয়তো অন্য উন্নয়নমূলক কাজে লাগানো যেত। তবে সরকার দাবি করছে, রাজস্ব আদায় বাড়ার ফলে এই চাপ সামলানো সম্ভব এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো চালু থাকবে।

প্রশ্ন: বাম জমানার তুলনায় বর্তমানে ঋণের পরিস্থিতি কেমন?

​উত্তর: অঙ্কের হিসেবে ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। বাম জমানার শেষে ঋণ ছিল ১.৮৭ লক্ষ কোটি, যা এখন বেড়ে ৮.১৫ লক্ষ কোটির বেশি হয়েছে। তবে সরকারের যুক্তি হলো, অর্থনীতির আকার (GSDP) বাড়ার কারণে ঋণের অনুপাত কমেছে, অর্থাৎ ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা রাজ্যের বেড়েছে।

​উপসংহার

​পরিশেষে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬ একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। একদিকে সরকারের দাবি, তারা অর্থনীতির আকার বাড়াতে সক্ষম হয়েছে এবং রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড গড়েছে। অন্যদিকে, ৮ লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝা এবং নতুন করে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা অর্থনীতির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালিয়ে যাওয়া এবং একই সঙ্গে ঋণের বোঝা সামলানো—সরকারের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছে, বাজেটের এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা ফলপ্রসূ হয় এবং রাজ্যের ঋণের বোঝা ভবিষ্যতে কমে কি না, সেদিকে।

Leave a Comment

Created with ❤