কারিগরি শিক্ষকদের আন্দোলন: নবান্নের কাছে ১২ ঘণ্টা টানা বিক্ষোভ! সরকারি স্বীকৃতির দাবিতে উত্তাল হাওড়া, জানুন বিস্তারিত
বুধবার হাওড়ার মন্দিরতলায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী থাকল রাজ্যবাসী। সরকারি স্বীকৃতির দাবিতে নবান্নের অদূরে টানা ১২ ঘণ্টা ধরে চলল কারিগরি শিক্ষকদের আন্দোলন। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শত শত শিক্ষক-শিক্ষিকা নিজেদের হকের দাবিতে সোচ্চার হলেন। ‘এজেন্সি হটাও, সরকারি স্বীকৃতি দাও’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠল গোটা এলাকা। দিনের শেষে প্রশ্ন একটাই—দীর্ঘদিনের এই বঞ্চনার অবসান কবে হবে? প্রশাসন কি আদৌ তাঁদের কথা শুনবে? আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা তুলে ধরব সেই ১২ ঘণ্টার শ্বাসরূদ্ধকর পরিস্থিতির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
কেন হঠাৎ রাজপথে নামলেন কারিগরি শিক্ষকরা?
রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলিতে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বৃত্তিমূলক শিক্ষা বা ভোকেশনাল ট্রেনিং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ছাত্রছাত্রীদের হাতে-কলমে কাজ শেখানোর দায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই শিক্ষক-শিক্ষিকারাই আজ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা ন্যাশনাল স্কিলস কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (NSQF) প্রকল্পের আওতায় কাজ করছেন। কিন্তু অভিযোগ, এত বছর পরেও তাঁরা সরকারি কর্মচারীর তকমা পাননি। বরং বিভিন্ন বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে তাঁদের নিয়োগ করা হয়। এই এজেন্সি-প্রথা বাতিলের দাবিতেই মূলত দানা বেঁধেছে কারিগরি শিক্ষকদের আন্দোলন।
শিক্ষকদের অভিযোগ, তাঁরা সরকারি স্কুলের সিলেবাস মেনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পড়ান। অথচ তাঁদের নিয়োগকর্তা সরকার নয়, বরং বিভিন্ন এজেন্সি। এই মধ্যস্থতাকারী সংস্থাগুলি অনেক সময়ই নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না। এমনকি শিক্ষকদের ওপর অহেতুক চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগও উঠেছে বারবার। দিনের পর দিন এই বঞ্চনা সহ্য করতে করতেই পিঠ ঠেকেছে দেওয়ালে। তাই বাধ্য হয়েই তাঁরা নবান্ন অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন।
মন্দিরতলায় ১২ ঘণ্টার টানা অবস্থান
বুধবার সকাল থেকেই হাওড়ার মন্দিরতলা চত্বর সরগরম হয়ে ওঠে। ‘ইউনাইটেড ডব্লিউবি এনএসকিউএফ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর ডাকে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষকরা এসে জড়ো হন। উদ্দেশ্য ছিল নবান্নে গিয়ে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী বা কোনো শীর্ষ আধিকারিকের সঙ্গে কথা বলা। কিন্তু অনুমতি না মেলায় মন্দিরতলাতেই শুরু হয় অবস্থান বিক্ষোভ।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে ধর্নার জন্য মাত্র ১২ ঘণ্টার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যদিও সংগঠনের দাবি ছিল ১০ দিনের। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচিতে শয়ে শয়ে শিক্ষক অংশ নেন। রোদ-গরম উপেক্ষা করে তাঁরা নিজেদের দাবিতে অনড় ছিলেন। বিক্ষোভ চলাকালীন স্লোগানে স্লোগানে তাঁরা বুঝিয়ে দিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই থামবে না। এই দীর্ঘ সময়ে পুলিশের কড়া নিরাপত্তা বলয়ে মোড়া ছিল গোটা এলাকা।
বঞ্চনার করুণ চিত্র: বেতন নেই, নেই স্থায়ীকরণ
এই আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস। আন্দোলনকারী শিক্ষকদের দাবি অনুযায়ী, গত প্রায় ১২ বছর ধরে তাঁদের বেতনে কোনো বৃদ্ধি ঘটেনি। মুদ্রাস্ফীতির বাজারে যেখানে সব কিছুর দাম আকাশছোঁয়া, সেখানে একই বেতনে সংসার চালানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তার ওপর আরও মর্মান্তিক খবর হলো, গত প্রায় ছয় মাস ধরে নাকি বহু শিক্ষক-শিক্ষিকা তাঁদের প্রাপ্য বেতনটুকুও পাননি।
স্কুলগুলিতে নবম-দশম শ্রেণিতে ভোকেশনাল বিষয়গুলো অতিরিক্ত বা ঐচ্ছিক হলেও, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে (একাদশ-দ্বাদশ) এগুলি মূল কোর্সের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, ছাত্রছাত্রীদের রেজাল্টে এই বিষয়গুলির গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ, যাঁরা এই বিষয়গুলো পড়াচ্ছেন, তাঁদের চাকরির কোনো স্থায়ীকরণ নেই, নেই কোনো সরকারি সুরক্ষা। বকেয়া বেতন মেটানো এবং সরাসরি সরকারের অধীনে নিয়োগের দাবি তাই অত্যন্ত জোরালো হয়ে উঠেছে এই কারিগরি শিক্ষকদের আন্দোলন-এর মাধ্যমে।
বিক্ষোভ চলাকালীন অসুস্থ শিক্ষক
টানা ১২ ঘণ্টার এই অবস্থান কর্মসূচি চলাকালীন ঘটে যায় এক বিপত্তি। রোদে-গরমে এবং মানসিক চাপে এক শিক্ষক হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন। সহকর্মীরা দ্রুত তৎপর হয়ে ওঠেন এবং তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাওড়া জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনা আন্দোলনকারীদের মনে ক্ষোভের আগুন আরও বাড়িয়ে দেয়। তাঁদের সহযোদ্ধার এই অসুস্থতা যেন তাঁদের জেদকে আরও ইস্পাতকঠিন করে তোলে।
প্রশাসনের উদাসীনতা এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনাই যে তাঁদের এই পথে নামতে বাধ্য করেছে, তা অসুস্থ শিক্ষকের ঘটনা থেকেই স্পষ্ট। সহকর্মীদের চোখে-মুখে ছিল উদ্বেগ আর কণ্ঠে ছিল প্রতিবাদের ভাষা।
কী কী দাবি নিয়ে সরব হয়েছেন শিক্ষকরা?
শিক্ষকদের এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য কেবল বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং নিজেদের আত্মসম্মান এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নিচে তাঁদের প্রধান দাবিগুলো তুলে ধরা হলো:
- অবিলম্বে এজেন্সি প্রথা বিলোপ করতে হবে।
- শিক্ষকদের সরাসরি সরকারি কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
- বকেয়া বেতন দ্রুত মিটিয়ে দিতে হবে।
- ভবিষ্যৎ সুরক্ষা বা প্রভিডেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থা করতে হবে।
- নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো এবং নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি চালু করতে হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: প্রশাসন কী বলছে?
সংগঠনের সভাপতি নিরূপম কোলে সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, তাঁরা আশা করেছিলেন নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা কোনো সচিব স্তরের আধিকারিকের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এদিন তাঁদের সঙ্গে কেউ দেখা করেননি। তবে তাঁরা এখনই হাল ছাড়তে নারাজ। আগামী দিনে নবান্নের কোনো শীর্ষ কর্তার সঙ্গে বৈঠকের অনুমতি মিলবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
যদি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না হয়, তবে আন্দোলন আরও তীব্র করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষক নেতারা। তাঁরা সাফ জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হলে আগামী দিনে আরও বড় কর্মসূচি নেওয়া হবে। সরকারের সদিচ্ছার ওপরই এখন নির্ভর করছে হাজার হাজার কারিগরি শিক্ষকের ভবিষ্যৎ।
প্রশ্ন ও উত্তর: জেনে নিন খুঁটিনাটি
এই আন্দোলন এবং শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বেশ কিছু প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
কারিগরি শিক্ষকরা কাদের অধীনে কাজ করেন?
বর্তমানে এই শিক্ষকরা ন্যাশনাল স্কিলস কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (NSQF) প্রকল্পের আওতায় কাজ করেন। কিন্তু তাঁদের নিয়োগ সরাসরি সরকারের মাধ্যমে হয় না। বিভিন্ন প্রাইভেট এজেন্সির মাধ্যমে তাঁদের স্কুলে নিয়োগ করা হয়, যা নিয়েই মূল বিতর্ক।
আন্দোলনকারীদের প্রধান স্লোগান কী ছিল?
এদিনের বিক্ষোভে শিক্ষকদের মুখে একটাই প্রধান স্লোগান ছিল—’এজেন্সি হটাও, সরকারি স্বীকৃতি দাও’। অর্থাৎ তাঁরা এজেন্সির মাধ্যম থেকে বেরিয়ে সরাসরি সরকারের অধীনে কাজ করতে চান।
ধর্না কতক্ষণ চলেছিল?
পুলিশ এবং প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে এই অবস্থান বিক্ষোভ চলেছিল টানা ১২ ঘণ্টা। যদিও সংগঠনের পক্ষ থেকে ১০ দিনের জন্য ধর্নার অনুমতি চাওয়া হয়েছিল।
এক নজরে: দাবিপূরণ বনাম বাস্তব পরিস্থিতি
নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে শিক্ষকদের দাবি এবং বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করা হলো:
| বিষয় | শিক্ষকদের দাবি | বর্তমান পরিস্থিতি |
|---|---|---|
| নিয়োগ পদ্ধতি | সরাসরি সরকারি নিয়োগ | বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগ |
| বেতন কাঠামো | নির্দিষ্ট স্কেল ও বৃদ্ধি | গত ১২ বছরে বেতন বাড়েনি |
| চাকরির স্থায়ীকরণ | সরকারি স্বীকৃতি ও স্থায়ীকরণ | কোনো স্থায়ীকরণ নেই (অস্থায়ী) |
| বকেয়া বেতন | অবিলম্বে পেমেন্ট | অনেকের ৬ মাস বেতন বাকি |
| ভবিষ্যৎ সুরক্ষা | পিএফ ও অন্যান্য সুবিধা | কোনো সুরক্ষা নেই |
উপসংহার: সমাধানের আশায় হাজারো চোখ
দিনশেষে, মন্দিরতলার এই কারিগরি শিক্ষকদের আন্দোলন রাজ্য সরকারের কাছে এক বড় বার্তা পৌঁছে দিল। যে শিক্ষকরা কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, তাঁরা আজ নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্ধকার দেখছেন। ১২ ঘণ্টার এই অবস্থান বিক্ষোভ হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু দাবি আদায়ের লড়াই এখনো জারি। এখন দেখার বিষয়, রাজ্য সরকার কবে এই শিক্ষকদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় এবং তাঁদের ‘সরকারি স্বীকৃতি’-র দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করে। সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে শিক্ষকদের ভালো থাকাও যে অত্যন্ত জরুরি, তা বলাই বাহুল্য।




