সায়ক চক্রবর্তী বিফ বিতর্ক: পার্ক স্ট্রিট কাণ্ডে নয়া মোড়

পার্ক স্ট্রিটের পাবে মাটনের বদলে বিফ পরিবেশন ঘিরে তুলকালাম। অবশেষে জামিন পেলেন অভিযুক্ত ওয়েটার। অন্যদিকে ফেসবুকে প্রতিশ্রুতি দিয়েও কথা রাখলেন না অভিনেতা সায়ক চক্রবর্তী। মামলা প্রত্যাহার না করায় তোপের মুখে অভিনেতা। বিস্তারিত জানুন এই প্রতিবেদনে।

Sayak Chakraborty Beef Controversy (সায়ক চক্রবর্তী বিফ বিতর্ক) : গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে চায়ের দোকান, সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পার্ক স্ট্রিটের একটি নামী পাবে ঘটে যাওয়া এক অনভিপ্রেত ঘটনা। যেখানে এক টলিউড অভিনেতার খাবারে খাসির মাংসের বদলে ভুলবশত অন্য মাংস পরিবেশন করা হয়। এই ঘটনায় সেই পানশালার ওয়েটারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, যা নিয়ে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তবে স্বস্তির খবর হলো, অবশেষে সেই অভিযুক্ত ওয়েটার জামিন পেয়েছেন, কিন্তু অভিযোগকারী অভিনেতা কথা দিয়েও কথা রাখেননি বলে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে।

​পার্ক স্ট্রিট বিফ কাণ্ডে অবশেষে জামিন পেলেন অভিযুক্ত ওয়েটার

​শহরের বুকে ঘটে যাওয়া সায়ক চক্রবর্তী বিফ বিতর্ক যেন থামতেই চাইছে না। গত শনিবারের ঘটনার পর থেকে টানা কয়েকদিন ধরে এই বিষয় নিয়ে তুমুল জলঘোলা হয়েছে। পার্ক স্ট্রিটের নামী রেস্তোরাঁ অলি পাবে খেতে গিয়েছিলেন টলিউড অভিনেতা সায়ক চক্রবর্তী। সেখানে মাটন স্টেকের বদলে তাঁর পাতে চলে আসে বিফ বা গোমাংসের স্টেক। এই ভুল পরিবেশনের জেরে ক্ষিপ্ত অভিনেতা সরাসরি ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাতের অভিযোগ এনেছিলেন ওই রেস্তোরাঁর এক সাধারণ কর্মীর বিরুদ্ধে। পুলিশে অভিযোগ দায়ের করার পর সেই রাতেই গ্রেফতার করা হয় শেখ নাসিমুদ্দিন নামের ওই ওয়েটারকে।

​টানা তিন দিন বিচারবিভাগীয় হেফাজতে থাকার পর অবশেষে মঙ্গলবার ব্যাঙ্কশাল আদালত থেকে জামিন পেলেন শেখ নাসিমুদ্দিন। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন অনেকে। কারণ, সোশ্যাল মিডিয়ায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে টলিউডের একাংশ—সকলেই ওই সাধারণ শ্রমজীবী মানুষটির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ভুলবশত খাবারের প্লেট অদলবদল হওয়ার জেরে যেভাবে তাঁকে হাজতবাস করতে হলো, তা অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। জামিন পাওয়ার পর আইনি জটিলতা কিছুটা কমলেও, অভিনেতার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

​ফেসবুকে প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কি কথা রাখলেন সায়ক?

​এই গোটা সায়ক চক্রবর্তী বিফ বিতর্ক নতুন মোড় নেয় যখন জানা যায় যে, অভিনেতা সায়ক চক্রবর্তী ফেসবুকে মামলা তুলে নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে তিনি তা করেননি। রবিবার সায়ক তাঁর ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট করে জানিয়েছিলেন যে, অলি পাব কর্তৃপক্ষ ক্ষমা চাওয়ার পর তিনি বিষয়টিকে আর দীর্ঘায়িত করতে চান না। তিনি স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন যে ওই ওয়েটারের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ তিনি প্রত্যাহার করে নেবেন। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ বলছে ভিন্ন কথা।

​বিধায়ক নওসাদ সিদ্দিকি এবং সমাজকর্মী কোয়েলি গঙ্গোপাধ্যায় এই বিষয়ে মুখ খুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, সায়ক চক্রবর্তী সোশ্যাল মিডিয়ায় মহানুভবতা দেখালেও আইনি পথে হেঁটে মামলা প্রত্যাহার করার কোনো উদ্যোগ নেননি। কোয়েলি গঙ্গোপাধ্যায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “অভিযোগ যেমন থানায় গিয়ে জানাতে হয়, তেমনই মামলা প্রত্যাহার করতে হলেও থানায় বা আদালতে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মানতে হয়। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেই মামলা উঠে যায় না, এটা কি সায়ক জানেন না?” অভিনেতার এই দ্বিচারিতা নিয়ে এখন নতুন করে সমালোচনার ঝড় উঠেছে নেটপাড়ায়।

​সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এবং আইনি জটিলতা

​অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে, কেন একটি সাধারণ ভুলের জন্য এত বড় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলো? সায়ক চক্রবর্তী বিফ বিতর্ক নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল এবং ক্ষোভের শেষ নেই। নিচে কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তরের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা হলো:

​এই ঘটনায় ঠিক কি কি আইনি ধারা প্রয়োগ করা হয়েছিল?

​পুলিশ সূত্রে খবর, অভিযুক্ত ওয়েটার শেখ নাসিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ২৯৯ নম্বর ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছিল। এই ধারাটি মূলত কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষের ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান করে ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। যদি এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে অভিযুক্তের সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে। যদিও এটি একটি জামিনযোগ্য অপরাধ কিনা তা আদালতের বিচার্য, তবে প্রাথমিকভাবে পুলিশ কঠোর পদক্ষেপই নিয়েছিল। পালটা সায়কের বিরুদ্ধেও সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল, যা এখনো তদন্তসাপেক্ষ।

​সায়ক চক্রবর্তী কি সত্যিই জানতেন না যে তিনি কী খাচ্ছেন?

​ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, সায়ক এবং তাঁর বন্ধুরা মাটন স্টেক অর্ডার করেছিলেন। কিন্তু যখন খাবার আসে, তাঁরা সেটি খেতে শুরু করেন। কিছুটা খাওয়ার পরই তাঁরা বুঝতে পারেন যে স্বাদে ও গন্ধে সেটি মাটন নয়। এরপরই রেস্তোরাঁ কর্মীদের ডেকে জিজ্ঞাসা করা হলে জানা যায় ভুলবশত বিফ স্টেক দেওয়া হয়েছে। সায়কের দাবি, তিনি না জেনেই নিষিদ্ধ মাংস খেয়ে ফেলেছেন, যার ফলে তাঁর ধর্মে আঘাত লেগেছে। তিনি নিজেকে ‘ব্রাহ্মণ’ দাবি করে বলেন, তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মভ্রষ্ট করা হয়েছে। যদিও পাব কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি ছিল নিতান্তই একটি মানবিক ভুল বা ‘হিউম্যান এরর’, এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র ছিল না।

​সোশ্যাল মিডিয়ায় জনরোষ এবং টলিউডের অবস্থান

​এই সায়ক চক্রবর্তী বিফ বিতর্ক নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া কার্যত দুভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। তবে সিংহভাগ মানুষই দাঁড়িয়েছিলেন অভিযুক্ত ওয়েটার শেখ নাসিমুদ্দিনের পাশে। সাধারণ নেটিজেনদের বক্তব্য ছিল, মানুষ মাত্রই ভুল হয়। ব্যস্ত রেস্তোরাঁয় খাবারের অর্ডার গুলিয়ে যাওয়া খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সেই ভুলের জন্য একজন গরিব মানুষকে জেল খাটানো কি মানবিকতার পরিচয়? এই প্রশ্নই বারবার উঠে এসেছে।

​অন্যদিকে, টলিউড ইন্ডাস্ট্রির অনেক সহকর্মীও সায়কের এই আচরণের সমালোচনা করেছেন। তাঁরা মনে করছেন, সায়ক বিষয়টিকে অহেতুক সাম্প্রদায়িক মোড় দিয়েছেন। যেখানে পাব কর্তৃপক্ষ এবং ওই ওয়েটার বারবার ক্ষমা চেয়েছেন, সেখানে পুলিশি ঝামেলায় না জড়িয়ে বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়া যেত। নাসিমুদ্দিনের মতো একজন শ্রমজীবী মানুষের রুজিরুটিতে আঘাত হানা এবং তাঁকে জেলে পাঠানো কখনোই কাম্য নয় বলে মনে করছেন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা।

বিজ্ঞাপন

​নিচে ঘটনার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ টেবিল আকারে দেওয়া হলো:

তথ্যের বিষয়বিবরণ
অভিযোগকারীসায়ক চক্রবর্তী (অভিনেতা)
অভিযুক্তশেখ নাসিমুদ্দিন (ওয়েটার)
ঘটনাস্থলঅলি পাব, পার্ক স্ট্রিট
মূল অভিযোগমাটনের বদলে বিফ পরিবেশন ও ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত
আইনি ধারাভারতীয় ন্যায় সংহিতা ২৯৯
বর্তমান স্থিতিঅভিযুক্তের জামিন মঞ্জুর

ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত তালিকা

​এই পুরো ঘটনাটি কীভাবে ধাপে ধাপে এগিয়েছে, তা বোঝার সুবিধার্থে নিচে একটি তালিকা দেওয়া হলো:

  • শনিবার: সায়ক চক্রবর্তী বন্ধুদের নিয়ে পার্ক স্ট্রিটের অলি পাবে যান এবং মাটন স্টেক অর্ডার করেন। ভুলবশত বিফ স্টেক পরিবেশন করা হয়।
  • শনিবার রাত: সায়ক থানায় অভিযোগ দায়ের করেন এবং পুলিশ ওয়েটার শেখ নাসিমুদ্দিনকে গ্রেফতার করে।
  • রবিবার: অভিযুক্তকে আদালতে তোলা হলে জামিন নাকচ হয় এবং বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়। সায়ক ফেসবুকে পোস্ট করে জানান তিনি অভিযোগ তুলে নেবেন।
  • সোমবার: সোশ্যাল মিডিয়ায় সায়কের বিরুদ্ধে জনরোষ তীব্র হয়। অনেকে তাঁর দ্বিচারিতার অভিযোগ তোলেন।
  • মঙ্গলবার: তিন দিন জেল খাটার পর ব্যাঙ্কশাল কোর্ট থেকে জামিন পান শেখ নাসিমুদ্দিন। জানা যায়, সায়ক তখনো আইনিভাবে মামলা তোলেননি।

​সায়কের “কথা দিয়ে কথা না রাখা” এবং তার প্রভাব

​ফেসবুক লাইভ এবং পোস্টে সায়ক চক্রবর্তী বারবার দাবি করেছিলেন যে তাঁর রাগ কমে গিয়েছে এবং তিনি চান না কারোর ক্ষতি হোক। তিনি লিখেছিলেন, “অলি পাব ক্ষমা চেয়েছে… ওই ভদ্রলোক আর অলি পাবের বিরুদ্ধে আমি কমপ্লেন প্রত্যাহার করছি।” কিন্তু মঙ্গলবার যখন নাসিমুদ্দিন জামিন পেলেন, তখন জানা গেল যে আইনি প্রক্রিয়ায় সায়কের তরফ থেকে মামলা প্রত্যাহারের কোনো অফিশিয়াল পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

​সমাজকর্মী এবং আইনজীবীদের মতে, মামলা প্রত্যাহার করা একটি আইনি প্রক্রিয়া। এটি কোনো সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের মাধ্যমে হয় না। এর জন্য অভিযোগকারীকে থানায় বা আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত আবেদন করতে হয়। সায়ক চক্রবর্তী একজন শিক্ষিত ব্যক্তি হয়েও কেন এই সাধারণ নিয়মটি মানলেন না, তা নিয়েই এখন জোর চর্চা চলছে। সমালোচকরা বলছেন, তিনি হয়তো লোক দেখানো সহানুভূতি আদায়ের জন্য ফেসবুকে ওই পোস্ট করেছিলেন, কিন্তু মনে মনে তিনি অনড় ছিলেন। অথবা তিনি আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে এতটাই অজ্ঞ যে ভেবেছিলেন ফেসবুকে লিখলেই পুলিশ কেস বন্ধ করে দেবে। যাই হোক না কেন, এই সায়ক চক্রবর্তী বিফ বিতর্ক অভিনেতার ভাবমূর্তিতে যে বড়সড় দাগ ফেলেছে, তা বলাই বাহুল্য।

​ভবিষ্যতে সায়ক জানিয়েছেন তিনি ভ্লগ বানানোর ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকবেন এবং এই ধরনের বিতর্ক এড়িয়ে চলবেন। তিনি আরও বলেন, তাঁর হিন্দু-মুসলিম নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, তিনি শুধু নিজের কিছু আচার মেনে চলতে চান। কিন্তু এই সাফাই কি সাধারণ মানুষের মন গলাতে পারবে? নাকি পার্ক স্ট্রিটের এই ঘটনা তাঁর ক্যারিয়ারে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। আপাতত স্বস্তির খবর এটুকুই যে, দরিদ্র ওয়েটারটি জেলের ঘানি থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

Leave a Comment

🌍
Created with ❤