জন্ম শংসাপত্র নিয়ে হুলস্থুল! ৫০ বছর বয়সে আবেদনের ভিড়ে নাজেহাল কলকাতা পুরসভা, জানুন কড়া নিয়ম

পঞ্চাশ বছর আগে বাড়িতে জন্ম নেওয়া মানুষদের হঠাৎ জন্ম শংসাপত্রের জন্য আবেদনের ধুম পড়েছে কলকাতা পুরসভায়। কিন্তু উপযুক্ত নথি ছাড়া মিলছে না সার্টিফিকেট। জানুন পুরসভার কড়া নিয়ম ও আবেদনের সঠিক পদ্ধতি।

Birth Certificate : জন্ম শংসাপত্র সম্প্রতি কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগে এক অদ্ভুত ঘটনার ঘনঘটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই বা তারও বেশি, অথচ হাতে নেই কোনো জন্মের প্রমাণ। এমন অসংখ্য মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন পুরসভার দপ্তরে। তাঁদের সকলের মুখে একটাই কথা— “স্যার, আমি তো বাড়িতে জন্মেছিলাম, তাই কোনো কাগজ নেই। এখন আমাকে একটা জন্ম শংসাপত্র দিন।” গত কয়েক মাসে এই ধরণের আবেদনের সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে পুর-আধিকারিকদের। এই হঠাৎ হুলস্থুল কেন এবং এর পরিণতি কী হচ্ছে, তা নিয়েই আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।

​৫০ বছর বয়সে হঠাৎ জন্ম শংসাপত্রের খোঁজ

​কলকাতার বুকে এমন ঘটনা আগে খুব একটা দেখা যায়নি। সাধারণত শিশুর জন্মের পরপরই তার বার্থ সার্টিফিকেটের জন্য তোড়জোড় শুরু হয়। কিন্তু এখন চিত্রটা সম্পূর্ণ উল্টো। মাঝবয়েসি বা বৃদ্ধরা লাইনে দাঁড়িয়ে দাবি করছেন তাঁদের জন্ম শংসাপত্র দরকার। গত দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে পুরসভার স্বাস্থ্য দপ্তরে এমন অন্তত ৫০টি আবেদন জমা পড়েছে যেখানে আবেদনকারীরা দাবি করছেন তাঁদের জন্ম হয়েছিল বাড়িতে।

​এইসব আবেদনকারীদের বয়স কারও ৪০, কারও ৪৬ আবার কারও বা ৫৫ বছর। এতদিন তাঁদের এই নথির প্রয়োজন পড়েনি, কিন্তু এখন কোনো বিশেষ কারণে তাঁরা মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সমস্যা হল, যখনই আধিকারিকরা তাঁদের কাছে কোনো সাপোর্টিং ডকুমেন্ট বা প্রমাণ চাইছেন, তাঁরা হাত উল্টে দিচ্ছেন। তাঁদের সোজা সাপটা যুক্তি, “তখন তো দিনকাল অন্যরকম ছিল, বাড়িতেই সব হতো, তাই কোনো কাগজ নেই।” এই পরিস্থিতিতে পুরসভার কর্মীরাও পড়ে গিয়েছেন মহা ফাপড়ে। একদিকে মানবিক আবেদন, অন্যদিকে কড়া আইনি নিয়ম—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে নাজেহাল দশা স্বাস্থ্য দপ্তরের।

​আবেদনকারীদের অদ্ভুত দাবি ও পুরসভার যুক্তি

​সম্প্রতি একটি ঘটনা পুরসভার অন্দরে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বড়বাজার এলাকা থেকে এক হিন্দিভাষী মহিলা ই-মেইলের মাধ্যমে পুরসভায় আবেদন জানান। তাঁর দাবি, তিনি ১৯৮২ সালের এপ্রিল মাসে বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কাছে সেই সময়ের কোনো কাগজ বা প্রমাণ নেই। তিনি পুরসভার কাছে অনুরোধ করেন তাঁকে যেন একটি বার্থ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।

​স্বাভাবিকভাবেই, পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগ এই আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। আধিকারিকরা খুব যৌক্তিক কিছু প্রশ্ন তুলেছেন যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাঁদের বক্তব্য, ১৯৮২ সালেও যদি কারো বাড়িতে জন্ম হয়, তবুও স্থানীয় কোনো ডাক্তার বা ধাত্রীর দেওয়া একটি লিখিত কাগজ থাকার কথা। আর যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় যে জন্মের কোনো কাগজ নেই, তাহলে সেই ব্যক্তি পরবর্তীকালে স্কুলে ভর্তি হলেন কীভাবে? তাঁর ভোটার কার্ড বা আধার কার্ডই বা কীসের ভিত্তিতে তৈরি হল?

​পুরসভার একজন পদস্থ কর্তা স্পষ্ট জানিয়েছেন, “মানুষের মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে তো আর সরকারি নথি দেওয়া যায় না। যদি সত্যি তাঁদের কোনো প্রমাণপত্র না থাকে, তবে আমাদের পক্ষে জন্ম শংসাপত্র ইস্যু করা অসম্ভব।”

​কেন নথি ছাড়া শংসাপত্র দেওয়া বিপজ্জনক?

​পুরসভার এই কঠোর হওয়ার পেছনে যথেষ্ট সংগত কারণ রয়েছে। পুর-কর্তাদের মতে, আবেগ দিয়ে প্রশাসনিক কাজ হয় না। আজ যদি যাচাই না করে কাউকে সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়া হয়, আর ভবিষ্যতে যদি সেই সার্টিফিকেট নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হয়, তবে তার সমস্ত দায়ভার পুরসভার ঘাড়ে এসে পড়বে।

  • আইনি জটিলতা: ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সার্টিফিকেট দিলে ভবিষ্যতে সম্পত্তি বা নাগরিকত্ব নিয়ে আইনি সমস্যা হতে পারে।
  • দায়বদ্ধতা: পুরসভা একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, তারা প্রামাণ্য নথি ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না।

​বার্থ সার্টিফিকেট পাওয়ার আইনি পদ্ধতি ও শর্তাবলী

​পুরসভা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, বাড়িতে জন্ম হলেও সার্টিফিকেট পাওয়া সম্ভব, তবে তার জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়মাবলী এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। চাইলেই যে কেউ এসে কাগজ ছাড়া সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে পারবেন না। এই প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ এবং প্রমাণসাপেক্ষ।

​কলকাতা পুরসভার নিয়ম অনুযায়ী, যাঁদের জন্মের কোনো হাসপাতাল রেকর্ড নেই, তাঁদের জন্ম শংসাপত্র পেতে হলে নিচের টেবিলে দেওয়া শর্তগুলো পূরণ করতে হবে:

নথির ধরণআবশ্যিকতাকেন প্রয়োজন?
স্থানীয় ডাক্তারের শংসাপত্রবাধ্যতামূলকজন্মের সত্যতা যাচাই করার জন্য।
ম্যাজিস্ট্রেটের অর্ডারবাধ্যতামূলকআইনি বৈধতার জন্য ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ।
হলফনামা (Affidavit)বাধ্যতামূলকনিজের দাবিকে আইনি রূপ দেওয়ার জন্য।
ভোটার ও আধার কার্ডসহায়ক নথিপরিচয় ও বয়সের প্রমাণ হিসেবে।

এই নথিগুলো ছাড়া পুরসভা কোনোভাবেই আবেদন গ্রাহ্য করবে না। বিশেষ করে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটের অর্ডার ছাড়া এই ধরণের পুরোনো কেসে বার্থ সার্টিফিকেট তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।

​বাড়িতে জন্মের প্রমাণ ও বর্তমান বাস্তবতা

​একটা সময় ছিল যখন গ্রামাঞ্চলে, এমনকি শহরাঞ্চলেও বাড়িতে প্রসবের ঘটনা ঘটত। গ্রামীণ চিকিৎসক বা ধাইমা’রা এই কাজ করতেন। কিন্তু পুরসভার বক্তব্য হল, সেই সময়ও তো কোনো না কোনো প্রমাণ থাকত। স্থানীয় চিকিৎসকের প্যাডে লেখা একটা প্রেসক্রিপশন বা ধাইমায়ের দেওয়া কোনো স্লিপ—কিছুই কি নেই?

​পুর-আধিকারিকরা বলছেন, “আমরা মানছি যে আগে বাড়িতে প্রসব বেশি হতো। কিন্তু তার মানে এই নয় যে হাওয়ায় ভেসে জন্ম হয়েছে। অন্তত স্থানীয় ডাক্তারবাবুর সার্টিফিকেট তো থাকবেই। সেটা ছাড়া আমরা এগোতে পারব না।”

বিজ্ঞাপন

​যারা এখন এসে দাবি করছেন যে তাঁদের কাছে “কিছুই নেই”, তাঁদের দাবি নিয়ে সন্দেহ থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ, একজন মানুষ ৪০-৫০ বছর ধরে কোনো না কোনো নথির ভিত্তিতেই সমাজে বসবাস করছেন। পড়াশোনা করেছেন, ভোট দিয়েছেন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। সেখানে জন্মের কোনো না কোনো সূত্র তো উল্লেখ করতেই হয়েছে। তাই এখন “কিছু নেই” বললে তা প্রশাসনিকভাবে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না।

​পুরসভার নির্দেশিকা মেনে চলার ধাপসমূহ

​যাঁরা সত্যিই সমস্যায় পড়েছেন এবং বৈধভাবে সার্টিফিকেট পেতে চান, তাঁদের জন্য পুরসভা কিছু নির্দিষ্ট পথ বাতলে দিয়েছে। এলোমেলো আবেদন না করে নিচের ধাপগুলো বা তালিকা অনুসরণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে:

  1. ডাক্তারের সার্টিফিকেট জোগাড়: সবার আগে যে চিকিৎসক বা ধাইয়ের উপস্থিতিতে জন্ম হয়েছিল, তাঁর বা সমতুল্য কোনো স্থানীয় চিকিৎসকের শংসাপত্র সংগ্রহ করুন।
  2. আদালতের দ্বারস্থ হওয়া: সেই সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করে অর্ডার বের করতে হবে।
  3. হলফনামা তৈরি: যথাযথ আইনি ভাষায় হলফনামা বা এফিডেভিট জমা দিতে হবে।
  4. পরিচয়পত্র জমা: বর্তমানের ভোটার কার্ড এবং আধার কার্ডের কপি ফাইলের সাথে যুক্ত করতে হবে।
  5. পুরসভায় আবেদন: ওপরের সব কাগজ প্রস্তুত হলে তবেই পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগে জন্ম শংসাপত্র-এর জন্য আবেদন করুন।

​সাধারণ মানুষের প্রশ্ন ও উত্তর (FAQs)

​অনেক মানুষের মনেই এই জটিল প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন জাগছে। নিচে এমন কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো যা আপনার বিভ্রান্তি দূর করতে পারে।

​আমার বয়স ৫৫, আমার কি এখন বার্থ সার্টিফিকেট পাওয়া সম্ভব?

​হ্যাঁ, সম্ভব। বয়স ৫৫ হোক বা ৬০, আপনি সার্টিফিকেট পেতে পারেন। কিন্তু শর্ত একটাই, আপনার জন্মের সপক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ বা আদালতের নির্দেশ থাকতে হবে। কেবল মৌখিক দাবিতে কোনো কাজ হবে না।

​আমার কাছে ছোটবেলার কোনো কাগজ নেই, এখন কী করব?

​যদি আপনার কাছে জন্মের কোনো কাগজ না থাকে, তবে বিষয়টি জটিল। সেক্ষেত্রে আপনাকে আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটের অর্ডার বের করতে হবে। আদালত যদি আপনার অন্যান্য কাগজ (যেমন স্কুলের সার্টিফিকেট, ভোটার কার্ড) দেখে সন্তুষ্ট হয়ে অর্ডার দেয়, তবেই পুরসভা আপনাকে জন্ম শংসাপত্র দিতে পারবে।

​পুরসভা কি চাইলে মানবিক কারণে সার্টিফিকেট দিতে পারে না?

​না, পারে না। বার্থ সার্টিফিকেট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথি (Legal Document)। এখানে আবেগের কোনো স্থান নেই। নিয়ম না মেনে সার্টিফিকেট দিলে পুরসভার আধিকারিকরাই আইনি বিপাকে পড়বেন। তাই তাঁরা আদালতের নির্দেশ ছাড়া এক পা-ও নড়তে রাজি নন।

​উপসংহার: সচেতনতাই একমাত্র পথ

​পরিশেষে বলা যায়, কলকাতা পুরসভার এই কড়াকড়ি আসলে নিয়মশৃঙ্খলারই অংশ। গত কয়েক মাসে যেভাবে “বাড়িতে জন্ম” বলে ভুয়ো বা প্রমাণহীন আবেদনের পাহাড় জমেছে, তাতে রাশ টানা দরকার ছিল। বড়বাজারের সেই মহিলার ঘটনা বা অন্যান্য আবেদনগুলো থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার—আইনি কাগজ ছাড়া জন্ম শংসাপত্র পাওয়ার আশা করা বৃথা।

​যাঁদের সত্যিই নথির প্রয়োজন, তাঁদের উচিত সঠিক আইনি পথ অবলম্বন করা। অযথা পুরসভায় ভিড় না করে, আগে নিজের কাগজপত্র বা আদালতের অর্ডার জোগাড় করুন। মনে রাখবেন, সঠিক প্রমাণ থাকলে পুরসভা আপনাকে ফেরাবে না, কিন্তু প্রমাণের অভাবে তারা নিরুপায়। বয়স ৫০ হোক বা ৫, সরকারি খাতায় নাম তুলতে গেলে নিয়মের রাস্তায় হাঁটতেই হবে।

Leave a Comment