২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ভাঙড়ের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব মোড় এসেছে। দীর্ঘদিনের তৃণমূল নেতা ও ভাঙড়ের প্রাক্তন বিধায়ক আরাবুল ইসলাম সম্প্রতি শাসকদল ত্যাগ করে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফ-এ (ISF) যোগ দিয়েছেন। তবে এই দলবদলের মাঝেই একটি বিশেষ ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে আইএসএফ-এর মঞ্চে দাঁড়িয়েও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে গিয়ে থমকে গিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিনের অভ্যাস আর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের এই দ্বন্দ্ব ঘিরেই শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
এক নজরে
আরাবুল ইসলামের রাজনৈতিক দলবদল এবং মঞ্চের সেই অস্বস্তিকর মুহূর্ত
ভাঙড়ের ‘তাজা নেতা’ হিসেবে পরিচিত আরাবুল ইসলাম তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতা ছিলেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে দলের অন্দরে কোন্দল এবং শওকত মোল্লার সঙ্গে দূরত্বের কারণে তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। সম্প্রতি তৃণমূল থেকে পদত্যাগ করার পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নওশাদ সিদ্দিকির দলে যোগ দেন। তবে আরাবুল ইসলামের রাজনৈতিক দলবদল কেবল কাগজের কলমে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তার প্রতিফলন দেখা গেছে জনসভাতেও।
একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বক্তৃতা শেষ করার পর অভ্যাসবশত তিনি ‘জয় বাংলা’ বলতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নেন। আসলে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের সৈনিক হওয়ায় এই স্লোগানটি তাঁর মজ্জায় মিশে ছিল। কিন্তু আইএসএফ-এর মঞ্চে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের স্লোগান দেওয়া যে রাজনৈতিকভাবে ভুল বার্তা দিতে পারে, তা বোধহয় তিনি মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারেন। তাঁর এই থমকে যাওয়ার দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি হয় এবং বিরোধী শিবিরের কাছে তা হাসির খোরাক হয়ে ওঠে।
তৃণমূল ত্যাগ ও আইএসএফ-এ যোগদানের নেপথ্য কাহিনী
আরাবুল ইসলামের দল ছাড়ার পেছনে অনেক দিনের পুঞ্জীভূত অভিমান কাজ করছিল বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তিনি বারবার অভিযোগ করেছেন যে, তৃণমূল কংগ্রেস তাঁকে এবং তাঁর অনুগামীদের গুরুত্ব দিচ্ছে না। বিশেষ করে ক্যানিং পূর্বের বিধায়ক শওকত মোল্লার সঙ্গে তাঁর ক্ষমতার লড়াই ভাঙড়ের রাজনীতিতে বারবার অস্থিরতা তৈরি করেছে। আরাবুল ইসলামের রাজনৈতিক দলবদল তাই কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভাঙড়ে আধিপত্য বজায় রাখার এক মরিয়া চেষ্টা।
আইএসএফ-এ যোগ দেওয়ার পর আরাবুল দাবি করেছেন, তিনি এখন থেকে নওশাদ সিদ্দিকির হাত শক্ত করবেন। তৃণমূলের ‘দুর্নীতি’ এবং ‘স্বৈরাচারী’ মনোভাবের বিরুদ্ধেই তাঁর এই লড়াই বলে তিনি ঘোষণা করেছেন। তবে ভাঙড়ের মাটিতে যারা একসময় আরাবুলের ভয়ে তটস্থ থাকত, তাঁদের কাছে এই দলবদল কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে আইএসএফ কর্মীদের একটি বড় অংশ আগে আরাবুলের বিরোধী হিসেবেই পরিচিত ছিল।
ভাঙড়ের নির্বাচনী সমীকরণ এবং আরাবুলের নতুন ভূমিকা
২০২৬-এর নির্বাচনে আরাবুল ইসলাম আইএসএফ-এর টিকিটে প্রার্থী হতে চলেছেন— এমন গুঞ্জন এখন তুঙ্গে। যদি তা হয়, তবে ভাঙড়ে লড়াই হবে ত্রিমুখী। একদিকে তৃণমূলের শওকত মোল্লা বা তাঁর মনোনীত প্রার্থী, অন্যদিকে আইএসএফ-এর নওশাদ বা আরাবুল এবং তৃতীয় পক্ষ হিসেবে বিজেপি। আরাবুল ইসলামের রাজনৈতিক দলবদল এই সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে মাইনরিটি ভোটের একটি বড় অংশ এখন আরাবুলের দিকে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে গিয়ে থমকে যাওয়া বা ‘জয় বাংলা’ বলতে গিয়ে থেমে যাওয়া প্রমাণ করে যে, মানসিক বিচ্ছেদ এখনও পুরোপুরি ঘটেনি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আদর্শ হঠাৎ করে বদলে ফেলা কতটা কঠিন, আরাবুলের সেই অস্বস্তিই যেন তা প্রমাণ করল। রাজনৈতিক মহলের মতে, আরাবুলের মতো হেভিওয়েট নেতার চলে যাওয়া দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তৃণমূলের সংগঠনে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
আরাবুল ইসলামের দলবদল নিয়ে কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন
আরাবুল ইসলাম কেন তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়লেন?
দীর্ঘদিন ধরে দলের মধ্যে কোণঠাসা হওয়া, শওকত মোল্লার সাথে বিবাদ এবং দলের প্রতি অভিমান থেকেই তিনি তৃণমূল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি কোন দলে যোগ দিয়েছেন?
তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পীরজাদা নওশাদ সিদ্দিকির দল ‘ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট’ (ISF)-এ যোগ দিয়েছেন।
স্লোগান বিতর্কটি আসলে কী?
একটি জনসভায় বক্তৃতা শেষে আরাবুল অভ্যাস বশত তৃণমূলের স্লোগান ‘জয় বাংলা’ বলতে গিয়েও আইএসএফ-এর মঞ্চের কথা ভেবে শেষ মুহূর্তে থেমে যান, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়।
২০২৬-এর নির্বাচনে এর প্রভাব কী হতে পারে?
আরাবুলের দলবদলের ফলে ভাঙড় ও সংলগ্ন এলাকায় তৃণমূলের ভোট ব্যাঙ্কে ফাটল ধরতে পারে এবং আইএসএফ সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া এবং আগামীর চ্যালেঞ্জ
আরাবুল ইসলামের এই পদক্ষেপকে তৃণমূল নেতৃত্ব বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যারা নীতিহীন রাজনীতি করে তারা এভাবেই দলবদল করে। তবে তলে তলে ভাঙড়ের সংগঠন ধরে রাখতে শওকত মোল্লাকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আরাবুল ইসলামের রাজনৈতিক দলবদল কি ভাঙড়ে আইএসএফ-কে জয় এনে দেবে? নাকি আরাবুল নিজেই নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকটে ফেললেন— তার উত্তর মিলবে ব্যালট বাক্সে।
আপাতত মঞ্চের সেই ‘স্লোগান আতঙ্ক’ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন আরাবুল। ভাঙড়ের অলিতে গলিতে এখন আলোচনার বিষয় একটাই— কালকের ‘তাজা নেতা’ আজকের আইএসএফ সৈনিক হিসেবে কতটা সফল হবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আরাবুলের এই যাত্রা সহজ হবে না কারণ ভাঙড়ের ভোটাররা খুব কাছ থেকে তাঁর ক্ষমতার লড়াই দেখেছেন।


