চন্দ্রনাথ রথ খুনের মামলায় উত্তরপ্রদেশ থেকে গোলু সিং গ্রেফতার

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথ খুনের মামলায় সিবিআই-এর বড় সাফল্য। উত্তরপ্রদেশের বলিয়া থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে অন্যতম মূল অভিযুক্ত গোলু সিং-কে। এর আগে এই মামলায় বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র সহ আরও বেশ কয়েকজন শার্পশুটারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃত গোলু সিং-কে ট্রানজিট রিমান্ডে কলকাতায় এনে এই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল ষড়যন্ত্রকারীদের পর্দাফাঁস করতে চাইছে সিবিআই।

Chandranath Rath murder case updates
পশ্চিমবঙ্গের হাই-প্রোফাইল চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা বা সিবিআই-এর হাত ধরে এক বড়সড় সাফল্য এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সচিব তথা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই বিজেপি কর্মীর নৃশংস খুনের ঘটনার তদন্তে নেমে উত্তরপ্রদেশের বলিয়া থেকে আরও এক মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতের নাম গোলু সিং ওরফে রাজ সিং বলে জানা গিয়েছে, যাকে ঘটনার পর থেকেই পুলিশ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন। বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক পরেই উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে ঘটে যাওয়া এই রোমহর্ষক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে সিবিআই এবং উত্তরপ্রদেশ পুলিশের বিশেষ দল যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে এই সাফল্য পেয়েছে। এই হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারির পর ধৃতকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে মূল ষড়যন্ত্রের শিকড়ে পৌঁছাতে মরিয়া তদন্তকারীরা।

বলিয়া থেকে গোলু সিং গ্রেফতার এবং সিবিআই-এর নিখুঁত জাল

তৃণমূল জমানার অবসানের পর রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছায়াসঙ্গী চন্দ্রনাথ রথ খুনের ঘটনায় প্রথম থেকেই কড়া অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার পর থেকেই ভিন রাজ্যে আত্মগোপন করে থাকা অপরাধীদের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালানো হচ্ছিল। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে উত্তরপ্রদেশের বলিয়া জেলার বিশুনেপুর এবং সংলগ্ন এলাকায় হানা দেয় সিবিআই-এর একটি বিশেষ দল।
সেখানেই ট্র্যাপ বা ফাঁদ পেতে এই খুনের অন্যতম প্রধান কারিগর গোলু সিং-কে বাগে আনেন আধিকারিকেরা। জানা গিয়েছে, ঘটনার দিন হামলাকারীদের গাড়ি ও অস্ত্রের বন্দোবস্ত করার ক্ষেত্রে এই যুবকের একটি বড় ভূমিকা ছিল। স্থানীয় আদালতের মাধ্যমে ট্রানজিট রিমান্ডে নিয়ে গোলু সিং-কে ইতিমধ্যেই কলকাতায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যাতে তাকে জেরা করে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল মাথাদের চিহ্নিত করা যায়।

মধ্যমগ্রামের সেই রক্তক্ষয়ী রাত ও হামলার বিবরণ

গত মে মাসের ৬ তারিখ রাতে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের দোহরিয়া এলাকায় যেভাবে চন্দ্রনাথ রথের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল, তা কার্যত কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম ছিল না। নিজের স্করপিও গাড়ি চড়ে বাড়ি ফেরার সময় পিছন থেকে একটি জাল নম্বর প্লেটের গাড়ি এসে তাঁর পথ আটকে দাঁড়ায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুষ্কৃতীরা পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গ্লক পিস্তল দিয়ে এলোপাথারি গুলি চালাতে শুরু করে।
বুলেটের আঘাতে ঘটনাস্থলেই রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন চন্দ্রনাথ রথ এবং তাঁর গাড়িচালক। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই ঘটনার পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তোলেন এবং দাবি করেন যে, তাঁকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতেই তাঁর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগীকে টার্গেট করা হয়েছিল।

অস্ত্রের গোপন আস্তানা ও উদ্ধার হওয়া বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র

তদন্ত যত এগোচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা পেশাদার সুপারি কিলার বা শার্পশুটারদের নেটওয়ার্কের কথা তত বেশি করে সামনে আসছে। গোলু সিং-এর আগে এই মামলায় নবীন সিং, বিনয় রাই এবং রাজকুমার সিং-এর মতো কুখ্যাত অপরাধীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে উত্তরপ্রদেশ ও বিহার সীমানার এক হাইওয়ের পাশের গুদাম থেকে সিবিআই বিপুল পরিমাণ মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে।
উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে ৯ এমএম পিস্তল, দুটি পয়েন্ট ৩২ বোরের পিস্তল, দুটি রিভলভার এবং প্রায় ৪৫ রাউন্ড তাজা কার্তুজ। তদন্তকারীদের অনুমান, এই বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র চন্দ্রনাথকে খতম করার জন্যই বিশেষভাবে জোগাড় করা হয়েছিল। ধৃত গোলু সিং এই অস্ত্র ও গাড়ি সরবরাহকারীদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখছিল বলে সিবিআই নিশ্চিত হয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার সিবিআই কীভাবে পেল?

ঘটনার গুরুত্ব এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বিচার করে রাজ্য পুলিশ ও এসটিএফ প্রাথমিক তদন্ত শুরু করলেও, ঘটনার গভীরতা দেখে অতি দ্রুত এই মামলার তদন্তভার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা তথা সিবিআই-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়। সিবিআই একটি ৭ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করে এই মামলার কিনারা করতে নেমেছে।

অপরাধীরা কীভাবে পুলিশের নজরে এল?

ঘটনার দিন হামলাকারীরা যে গাড়িটি ব্যবহার করেছিল, সেটি নিয়ে পালানোর সময় হাওড়ার বালির একটি টোল প্লাজায় ইউপিআই (UPI) মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট বা কর মেটানো হয়েছিল। সেই ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট এবং টোল প্লাজার সিসিটিভি ফুটেজ ট্র্যাক করেই তদন্তকারীরা অপরাধীদের সূত্র খুঁজে পান এবং উত্তরপ্রদেশ পর্যন্ত ধাওয়া করেন।

ধৃত গোলু সিং-এর ভূমিকা এই খুনে ঠিক কী ছিল?

সিবিআই-এর দাবি অনুযায়ী, গোলু সিং সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডের নীল নকশা বা প্ল্যানিংয়ের সাথে যুক্ত ছিল। ঘটনার পর শুটারদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, পালানোর পথ তৈরি করে দেওয়া এবং টাকার লেনদেন বা মানি ট্রেইলের পেছনে এই যুবকের প্রত্যক্ষ হাত থাকার প্রমাণ মিলেছে।

Leave a Comment

Created with ❤