২০ লক্ষ জওয়ান পাঠিয়ে ছাপ্পা ভোটের পরিকল্পনা! কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে মোদী-শাহকে তোপ মমতার

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে বিস্ফোরক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০ লক্ষ জওয়ান পাঠিয়ে ভোট লুঠের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুললেন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। একইসঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে লক্ষ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া নিয়ে সরব হলেন তৃণমূল নেত্রী। বিস্তারিত পড়ুন আজকের প্রতিবেদনে।

Mamata Banerjee on Central Force কলকাতা: আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে বাংলার রাজনৈতিক পারদ এখন তুঙ্গে। এরই মাঝে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন নিয়ে সরাসরি মোদী-শাহের অফিসের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, ২০ লক্ষ জওয়ান পাঠিয়ে ভোট লুঠ বা ছাপ্পা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে কেন্দ্র। এই মন্তব্যের পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর। একদিকে তৃণমূল নেত্রীর এই আশঙ্কা, অন্যদিকে বিরোধীদের পাল্টা আক্রমণ— সব মিলিয়ে ভোটের আগেই রণক্ষেত্র পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বাংলায়।

কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক দাবি

​নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশ হওয়ার আগে থেকেই রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয়তা নিয়ে সরব হয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্পষ্ট অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দফতর থেকে ফোন করে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাঁর কথায়, “যাকে পারছে ফোন করে ভয় দেখানো হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে এখানে ২০ লক্ষ জওয়ান পাঠাও।” মুখ্যমন্ত্রী মনে করছেন, এই বিপুল সংখ্যক বাহিনী আসলে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করতে এবং ভোটকেন্দ্রে ‘ছাপ্পা’ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই পাঠানো হচ্ছে। Mamata Banerjee on Central Force নিয়ে এই মন্তব্য ঘিরে এখন তোলপাড় জাতীয় রাজনীতি।

​বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন, ইভিএম মেশিন থেকে শুরু করে ভোটারদের বুথে যাওয়া আটকানো— সবকিছুর পেছনেই এক গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, বাইরে থেকে গুন্ডা এনে বাংলা দখলের চেষ্টা চলছে, আর সেই কাজকে সহায়তা করতেই বিপুল পরিমাণ আধাসেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনকে পঙ্গু করে দিয়ে কেন্দ্রীয় এজেন্সি এবং বাহিনীকে ব্যবহার করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাইছে বিজেপি, এমনটাই দাবি ঘাসফুল শিবিরের প্রধানের।

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ নিয়ে বড় অভিযোগ

​শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় বাহিনী নয়, ভোটার তালিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি অনুযায়ী, কয়েক লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলোতে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলেছে বলে তিনি মনে করেন। প্রায় ২২ লক্ষ নামের মধ্যে ১০ লক্ষ নামই বাদ দেওয়া হয়েছে বলে তাঁর কাছে খবর আছে। এই ঘটনাকে তিনি গণতন্ত্রের ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখছেন।

​নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও পরোক্ষভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি। যেখানে সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট বেরোনো নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে, সেখানে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ যাওয়া নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তবে এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন।

তৃণমূল বনাম বিজেপি: রাজ‍্য রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি

বিষয়তৃণমূলের অবস্থানবিজেপির অবস্থান
কেন্দ্রীয় বাহিনী২০ লক্ষ জওয়ান পাঠিয়ে ছাপ্পা দেওয়ার পরিকল্পনা।অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের জন্য বাহিনী জরুরি।
ভোটার তালিকানির্দিষ্ট জেলা ও সম্প্রদায়কে টার্গেট করে নাম বাদ।নিয়ম মেনেই ভুয়ো ভোটার ছাঁটাই করা হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারদুয়ারে চিকিৎসার মতো নতুন প্রকল্পের ঘোষণা।সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে ভোটার প্রভাবিত করার অভিযোগ।
ইভিএম সুরক্ষাইভিএম কারচুপির আশঙ্কা প্রকাশ।প্রযুক্তির ওপর অনাস্থা প্রকাশ করার নিন্দা।

ভোটের আগে নতুন প্রকল্পের ঘোষণা ও ইশতেহার

​নির্বাচনী উত্তাপের মাঝেই নিজের ইশতেহার প্রকাশ করেছেন তৃণমূল নেত্রী। সেখানে তিনি ‘দুয়ারে সরকার’ প্রকল্পের সাফল্যের পর এবার ‘দুয়ারে চিকিৎসা’ বা ‘দুয়ারে স্বাস্থ্য’ প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন। প্রতি ব্লকে এবং প্রতি শহরে এই ক্যাম্প করা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে তাঁর আক্ষেপ, ভোটের দোহাই দিয়ে অনেক দক্ষ অফিসারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে জনকল্যাণমূলক কাজ ব্যাহত হয়।

​রাজ্যবাসীর জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও সহজলভ্য করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। বিরোধীরা যখন বাহিনীকে হাতিয়ার করছে, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উন্নয়নের কার্ড খেলে মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাইছেন। Mamata Banerjee on Central Force নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি নিজের উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরাই এখন তাঁর প্রধান কৌশল।

নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের কিছু প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

​১. মুখ্যমন্ত্রী কেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরোধিতা করছেন?

​মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নয়, বরং ভোটারদের ভয় দেখাতে এবং ভোট লুঠ করতে ব্যবহার করার নীল নকশা তৈরি করেছে কেন্দ্র। তিনি মনে করেন, বাংলার পুলিশকে কাজ করতে না দিয়ে আধাসেনা দিয়ে বুথ দখল করাই মূল লক্ষ্য।

​২. ২০ লক্ষ জওয়ানের বিষয়টি ঠিক কী?

​মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন যে, অমিত শাহ ও মোদীর অফিস থেকে বিপুল সংখ্যক অর্থাৎ ২০ লক্ষ জওয়ান পাঠানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদিও নির্বাচন কমিশন আড়াই হাজার কোম্পানি বাহিনী পাঠানোর কথা ভাবছে, যা এযাবৎকালের রেকর্ড।

​৩. ভোটার তালিকা নিয়ে কী সমস্যা হয়েছে?

​তৃণমূল নেত্রীর অভিযোগ, মুর্শিদাবাদ, মালদা ও উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলো থেকে বেছে বেছে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। বিশেষত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা চলছে বলে তিনি মনে করেন।

বিজ্ঞাপন

বিজেপির পাল্টা প্রতিক্রিয়া ও কমিশনের প্রস্তুতি

​মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সমস্ত অভিযোগের পাল্টা জবাব দিয়েছে বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব। তাদের দাবি, রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী এলে তৃণমূলের ‘সন্ত্রাস’ বন্ধ হবে, তাই শাসক দল ভয় পাচ্ছে। সাধারণ মানুষ যাতে নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, তার জন্যই রেকর্ড সংখ্যক কোম্পানি বাহিনী চাওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও জানিয়েছে, এবার সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বিপুল সংখ্যক জেনারেল অবজার্ভার এবং পুলিশ অবজার্ভার মোতায়েন করা হবে।

Mamata Banerjee on Central Force প্রসঙ্গে তৃণমূলের এই কড়া অবস্থান আগামী দিনে ভোটযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার। একদিকে প্রশাসনিক রদবদল আর অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদের বাক্যবাণ— সব মিলিয়ে বাংলার নির্বাচন যে এবার অন্য মাত্রা পেতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।

প্রতিবেদনের মূল পয়েন্টসমূহ:

  • ​কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন।
  • ​ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ।
  • ​মোদী-শাহের বিরুদ্ধে সরাসরি তোপ।
  • ​নতুন ‘দুয়ারে স্বাস্থ্য’ প্রকল্পের ঘোষণা।
  • ​বাংলার আইন-শৃঙ্খলা ও পুলিশের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক।

​পরিশেষে বলা যায়, বাংলায় এবার রেকর্ড সংখ্যক বাহিনী আসায় শাসক ও বিরোধী দুই পক্ষই নিজেদের মতো করে ঘর গোছাতে শুরু করেছে। তবে সাধারণ ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কার ওপর আস্থা রাখেন, তা ব্যালট বক্সেই (বা ইভিএম) পরিষ্কার হবে।

Leave a Comment

Created with ❤