West Bengal Voter List Deletion: পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে ৬৪ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার দাবি, শাহের দরবারে শুভেন্দু দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে এখন একটাই চর্চা—পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করে যে বিস্ফোরক দাবি পেশ করেছেন, তা রাজ্য রাজনীতিতে বড়সড় ভূমিকম্পের সমান। অভিযোগ, রাজ্যের ভোটার তালিকায় লক্ষ লক্ষ ভুয়ো নাম রয়েছে, যা অবিলম্বে বাদ দেওয়া প্রয়োজন। সংখ্যাটা নেহাত কম নয়, প্রায় ৬৪ লক্ষ! এই বিপুল সংখ্যক নাম বাতিলের দাবিতেই এবার সরব হলেন বিরোধী দলনেতা।
এক নজরে
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ: শাহের কাছে শুভেন্দুর নালিশ
দিল্লিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে সংসদ ভবনে একান্ত বৈঠক করেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। প্রায় ১৫ মিনিটের এই বৈঠকে মূল আলোচ্য বিষয় ছিল পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং ভোটার তালিকার বর্তমান পরিস্থিতি। শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করানোর পথে প্রধান অন্তরায় হল ভোটার তালিকায় থাকা লক্ষ লক্ষ ভুয়ো ভোটার। তাঁর দাবি, এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে যদি স্বচ্ছ নির্বাচন করাতে হয়, তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তিনি অমিত শাহের হাতে তথ্য-প্রমাণ সম্বলিত একটি নথিপত্রও তুলে দেন বলে জানা গিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই দাবি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিরোধী দলনেতার মতে, বিহারে যদি বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচুর ভুয়ো ভোটার চিহ্নিত করা যায়, তবে পশ্চিমবঙ্গে সেই সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি হবে।
কেন ৬৪ লক্ষ নাম বাদের প্রসঙ্গ?
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ করে ৬৪ লক্ষ সংখ্যাটি কোথা থেকে এল? শুভেন্দু অধিকারীর যুক্তি বেশ পরিষ্কার। তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, রাজ্যের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের সঙ্গে ভোটার বাড়ার হারের কোনো সামঞ্জস্য নেই। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ভোটার সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, তা নজিরবিহীন এবং সন্দেহজনক। তাঁর দাবি, এই বাড়তি নামগুলোর অধিকাংশই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী অথবা মৃত মানুষের নাম, যা বছরের পর বছর ধরে তালিকায় রয়ে গিয়েছে। তাই অবিলম্বে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু না করলে গণতন্ত্র ভুলুণ্ঠিত হবে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, বিহারে প্রায় ১৬ লক্ষের বেশি ডুপ্লিকেট ভোটার পাওয়া গিয়েছে। সেই অনুপাতে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি বিচার করলে দেখা যাবে, এখানে প্রায় ৬৪ লক্ষ নাম ভুয়ো বা ডুপ্লিকেট।
জনবিন্যাস বদল ও ভোটার তালিকার গরমিল
শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগের তীর মূলত রাজ্যের জনবিন্যাসের পরিবর্তনের দিকে। তিনি অভিযোগ করেন, গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু জেলায় জনবিন্যাসে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি পড়েছে ভোটার তালিকায়। তিনি অমিত শাহকে জানান, একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এবং ভোটার তালিকায় তাদের অন্তর্ভুক্তির হার অস্বাভাবিক।
এই বিষয়টিকে তিনি জাতীয় নিরাপত্তার পক্ষেও বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, ভুয়ো পরিচয়পত্র ব্যবহার করে অনেকেই ভোটার তালিকায় নাম তুলেছে, যারা আদতে এদেশের নাগরিকই নয়। এই বিপুল সংখ্যক অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ না দিলে, আগামী দিনে রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে।
| অভিযোগের বিষয় | বিবরণ |
| মূল দাবি | ভোটার তালিকা থেকে ৬৪ লক্ষ নাম বাদ দিতে হবে |
| বৈঠকের স্থান | সংসদ ভবন, দিল্লি |
| কার সঙ্গে বৈঠক | স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ |
| তুলনামূলক রাজ্য | বিহার (সেখানেও নাম বাদ গিয়েছে) |
| মূল অভিযোগ | ডুপ্লিকেট ভোটার ও অনুপ্রবেশকারী |
ভোটার তালিকা নিয়ে শুভেন্দুর দাবি ও যুক্তি
বিরোধী দলনেতা কেবল মৌখিক অভিযোগ করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি বেশ কিছু যুক্তিও খাড়া করেছেন। তাঁর মতে, তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই এই ভুয়ো ভোটারদের চিহ্নিত করা সম্ভব। তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য প্রশাসন বা নির্বাচনী আধিকারিকরা অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় চাপের মুখে বা রাজনৈতিক প্রভাবে এই কাজ সঠিকভাবে করছেন না।
নিচে শুভেন্দু অধিকারীর তোলা কয়েকটি প্রধান আপত্তির তালিকা দেওয়া হলো:
- সীমান্তবর্তী জেলায় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি: বাংলাদেশ লাগোয়া জেলাগুলিতে ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩০ শতাংশেরও বেশি, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি।
- মৃত ভোটার: প্রচুর মৃত ব্যক্তির নাম এখনও ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি।
- ডুপ্লিকেট এন্ট্রি: একই ব্যক্তির নাম একাধিক বুথে বা একাধিক বিধানসভা কেন্দ্রে রয়েছে।
- রোহিঙ্গা ও অনুপ্রবেশকারী: ভিন দেশ থেকে আসা নাগরিকদের নাম বেআইনিভাবে তালিকায় ঢোকানো হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বিরোধী দলনেতার এই দাবির পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি একান্তই নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ারভুক্ত। তবে রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়শই কমিশনের কাছে এই নিয়ে স্মারকলিপি জমা দেয়। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, কমিশনকে আরও কঠোর হতে হবে। তিনি বিহারের ধাঁচে পশ্চিমবঙ্গেও ‘স্পেশাল ইনটেন্সিভ রিভিশন’ বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার দাবি জানিয়েছেন।
প্রশ্ন উত্তর: ভোটার তালিকা বিতর্ক
ভোটার তালিকা সংশোধন কেন জরুরি হয়ে পড়েছে?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো নির্ভুল ভোটার তালিকা। যদি তালিকায় ভুয়ো নাম থাকে, তবে ছাপ্পা ভোটের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি অনুযায়ী, ৬৪ লক্ষ ভুয়ো ভোটার থাকলে তা যেকোনো নির্বাচনের ফলাফল সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। তাই গণতন্ত্রের স্বার্থেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা সংশোধন করা অত্যন্ত জরুরি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে নালিশে কি কাজ হবে?
অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠকের পর রাজনৈতিক মহলে জল্পনা বেড়েছে। যেহেতু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি দেখে, তাই অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার হওয়ার বিষয়টি তারা গুরুত্ব দিয়ে দেখতে পারে। যদিও ভোটার তালিকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের অধীনে, তবুও প্রশাসনিক স্তরে কড়াকড়ি হলে কমিশনের কাজ সহজ হতে পারে।
আগামী দিনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই অভিযোগ এবং পাল্টা যুক্তির মাঝেই রাজ্য রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য বরাবরই এই ধরনের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের মতে, ভোটার তালিকা তৈরির কাজ নির্বাচন কমিশন করে, এখানে রাজ্য সরকারের কোনো হাত নেই। বিরোধীরা হারের অজুহাত খুঁজতেই আগেভাগে ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
তবে শুভেন্দু অনড়। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে তিনি এই ৬৪ লক্ষ নাম বাতিলের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, “আমরা চাই প্রকৃত ভারতীয়রাই ভোট দিক। কোনো অনুপ্রবেশকারী বা মৃত মানুষের ভোট আমরা মেনে নেব না।”
বিরোধী দলনেতা যে দাবিগুলো সামনে এনেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- প্রতিটি বুথ ধরে ধরে স্ক্রুটিনি বা যাচাই প্রক্রিয়া চালাতে হবে।
- আধার কার্ডের সঙ্গে ভোটার কার্ডের লি্ংক করার প্রক্রিয়া আরও জোরদার করতে হবে।
- সীমান্তবর্তী এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমীক্ষা করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, দিল্লির দরবার থেকে ফিরে শুভেন্দু অধিকারী যে বার্তা দিলেন, তা আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে বড় ইস্যু হতে চলেছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার এই প্রক্রিয়া যদি সত্যিই শুরু হয় এবং ৬৪ লক্ষ নাম যদি স্ক্যানারের নিচে আসে, তবে তা হবে রাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেয় এবং রাজ্য রাজনীতিতে এর জল কতদূর গড়ায়।







