পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন নির্বাচন এবং ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে এক বিরাট ধোঁয়াশা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশের পর রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ২১শে ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করার কথা ছিল, কিন্তু শীর্ষ আদালতের রায়ে সেই সম্ভাবনা আপাতত বিশ বাঁও জলে। সাধারণ মানুষ থেকে রাজনৈতিক নেতা—সবার মনেই এখন একটাই প্রশ্ন, কবে প্রকাশিত হবে নির্ভুল ভোটার তালিকা? এই আইনি জট এবং সময়সীমা বৃদ্ধির ফলে রাজ্যের নির্বাচনী প্রস্তুতিতে বড়সড় ধাক্কা লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
SIR Voter List Publication Delayed: পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই বিতর্ক দানা বাঁধছিল। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল যে, কমিশন পর্যাপ্ত সময় না দিয়েই তড়িঘড়ি তালিকা চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি গড়ায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, ইআরও (Electoral Registration Officer)-দের হাতে আরও সময় দিতে হবে যাতে তারা প্রতিটি আবেদন নিখুঁতভাবে যাচাই করতে পারেন। এর ফলে ২১শে ফেব্রুয়ারি যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের কথা ছিল, তা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে গেল। কমিশনের অন্দরমহল সূত্রে খবর, নতুন সময়সীমা অনুযায়ী এই প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও বেশ কিছুটা সময় লাগতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বড়সড় ধাক্কা কমিশনের পরিকল্পনায়
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় রাজ্য নির্বাচন কমিশনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। আগে ঠিক ছিল যে ১৪ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে সমস্ত শুনানি বা হিয়ারিং শেষ করে ২১শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। কিন্তু শীর্ষ আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ইআরও এবং এইআরও-দের স্ক্রুটিনির জন্য আরও অন্তত ৭ দিন বাড়তি সময় দিতে হবে। এর অর্থ হলো, ১৪ই ফেব্রুয়ারির পর আরও এক সপ্তাহ ধরে চলবে যাচাই পর্ব। স্বাভাবিকভাবেই, ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে SIR ভোটার তালিকা প্রকাশ স্থগিত থাকছে। কমিশনের আধিকারিকরা এখন নতুন করে ক্যালেন্ডার সাজাতে ব্যস্ত, কারণ এই দেরি পরবর্তী নির্বাচনী নির্ঘণ্টেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইআরও-দের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মাইক্রো অবজার্ভারদের ভূমিকা
এই গোটা প্রক্রিয়ায় সুপ্রিম কোর্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে। এতদিন অভিযোগ উঠছিল যে, অনেক ক্ষেত্রে মাইক্রো অবজার্ভাররা বা ওপরতলার নির্দেশ ভোটার তালিকা সংশোধনে প্রভাব ফেলছে। কিন্তু আদালত জানিয়ে দিয়েছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র ইআরও-দের হাতেই থাকবে। মাইক্রো অবজার্ভারদের এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো অধিকার নেই। এই রায়ের ফলে স্থানীয় স্তরের নির্বাচনী আধিকারিকরা বা ইআরও-রা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন। তারা প্রতিটি সন্দেহজনক নাম এবং নতুন আবেদনকারীর নথি সময় নিয়ে যাচাই করতে পারবেন। এর ফলে তালিকায় ভুল থাকার সম্ভাবনা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেন পিছিয়ে গেল চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিনক্ষণ?
সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, কেন হঠাৎ করে তালিকা প্রকাশ পিছিয়ে গেল? আসলে, ভোটার তালিকা সংশোধনের বা SIR প্রক্রিয়ার সময়সীমা নিয়ে বিরোধীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল। তারা অভিযোগ করেছিল যে, এত কম সময়ে লক্ষ লক্ষ নাম যাচাই করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে ভিন রাজ্যে থাকা ভোটার বা যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের সঠিক শুনানির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্ট এই যুক্তিকে মান্যতা দিয়েই স্ক্রুটিনির সময়সীমা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। ফলে ১৪ই ফেব্রুয়ারির পর আরও ৭ দিন যোগ হলে ২১শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তো শুধুমাত্র স্ক্রুটিনিই চলবে। তারপর সেই তথ্য ডিইও (District Election Officer) এবং সিইও (Chief Electoral Officer) দপ্তরে যাবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য। সব মিলিয়ে ২১ তারিখে তালিকা প্রকাশ করা এখন গাণিতিকভাবেই অসম্ভব।
রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া এবং দোষারোপের পালা
সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের পর রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিরোধী দলগুলো এই রায়কে তাদের নৈতিক জয় হিসেবে দেখছে। তাদের দাবি, কমিশন শাসক দলের হয়ে কাজ করছিল এবং তড়িঘড়ি তালিকা প্রকাশ করে বিরোধীদের অসুবিধায় ফেলতে চেয়েছিল। আদালতের হস্তক্ষেপে সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, শাসক দলের নেতারা বলছেন, তারা চান স্বচ্ছ ভোটার তালিকা হোক, কিন্তু বিরোধীরা অহেতুক আইনি জটিলতা সৃষ্টি করে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করছে। তবে সাধারণ মানুষ এসব রাজনৈতিক তর্কের ঊর্ধ্বে উঠে শুধু একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা চায়, যাতে নির্বাচনের দিন তাদের ভোট দেওয়া নিয়ে কোনো সংশয় না থাকে।
সাধারণ ভোটারদের করণীয় এবং উৎকণ্ঠা
এই আইনি জট এবং সময়সীমা পরিবর্তনের ফলে সাধারণ ভোটাররা কিছুটা বিভ্রান্ত। যারা নতুন ভোটার হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন বা যাদের নাম সংশোধনের দরকার ছিল, তারা ভাবছেন তাদের আবেদনের কী হবে? কমিশনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, এই সময়সীমা বৃদ্ধি আসলে ভোটারদের সুবিধার্থেই করা হয়েছে। ইআরও-রা এখন প্রতিটি আবেদন আরও যত্ন সহকারে দেখার সুযোগ পাবেন। তাই যাদের নথিপত্র সঠিক আছে, তাদের চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে চূড়ান্ত তালিকা কবে আসবে, তা নিয়ে এখনই নির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়নি। সবাইকে কমিশনের পরবর্তী বিজ্ঞপ্তির দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে।
রাজ্যের নির্বাচনী প্রস্তুতিতে কি বড় প্রভাব পড়বে?
ভোটার তালিকা হলো যেকোনো নির্বাচনের মেরুদণ্ড। সেই তালিকায় দেরি হওয়া মানেই পরবর্তী ধাপগুলোতেও দেরি হওয়া। SIR ভোটার তালিকা প্রকাশ স্থগিত হওয়ার ফলে বুথ বিন্যাস, পোলিং স্টেশন ঠিক করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রচারেও এর প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে আসন্ন পঞ্চায়েত বা পুরসভা নির্বাচনের আগে যদি এই তালিকা চূড়ান্ত না হয়, তবে নির্বাচন প্রক্রিয়াও পিছিয়ে যেতে পারে। কমিশনের আধিকারিকরা দিনরাত এক করে কাজ করছেন যাতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে যত দ্রুত সম্ভব নির্ভুল তালিকা প্রকাশ করা যায়। তবে ২১শে ফেব্রুয়ারির ডেডলাইন মিস হওয়া নিশ্চিতভাবেই কমিশনের কাছে একটা বড় ধাক্কা।
SIR ভোটার তালিকা প্রকাশ নিয়ে কিছু জরুরি প্রশ্ন ও উত্তর
এখন কবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হতে পারে?
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ১৪ই ফেব্রুয়ারির পর আরও ৭ দিন স্ক্রুটিনি চলবে। এরপর জেলা ও রাজ্য স্তরে সেই তথ্য যাচাই করতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। তাই মনে করা হচ্ছে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে বা মার্চ মাসের শুরুতে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হতে পারে।
আমার নাম বাদ গেছে কি না বুঝব কী করে?
যেহেতু চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ পিছিয়ে গেছে, তাই এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে আপনি স্থানীয় বিডিও অফিস বা নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে গিয়ে আপনার আবেদনের স্থিতি বা স্ট্যাটাস চেক করতে পারেন। শুনানির জন্য ডাকা হলে অবশ্যই উপস্থিত থাকবেন।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে কি নতুন করে নাম তোলার সুযোগ মিলবে?
না, নতুন করে আবেদন করার সময়সীমা বাড়ানো হয়নি। শুধুমাত্র যারা ইতিমধ্যে আবেদন করেছেন, তাদের আবেদনগুলো যাচাই করার সময়সীমা বা স্ক্রুটিনির সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ ইআরও-রা এখন পুরনো আবেদনগুলো খতিয়ে দেখার জন্য বাড়তি সময় পাবেন।
ইআরও এবং ডিইও-র মধ্যে পার্থক্য কী?
ইআরও বা ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার হলেন সেই ব্যক্তি যিনি সরাসরি ভোটার তালিকা তৈরি ও সংশোধনের দায়িত্বে থাকেন। আর ডিইও বা ডিস্ট্রিক্ট ইলেকশন অফিসার হলেন জেলা স্তরের প্রধান নির্বাচনী আধিকারিক, যিনি ইআরও-দের কাজের তদারকি করেন। সুপ্রিম কোর্ট ইআরও-দের ক্ষমতা নিশ্চিত করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা নিয়ে এই জটিলতা প্রমাণ করে যে গণতন্ত্রে প্রতিটি ভোটের গুরুত্ব কতখানি। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ হয়তো প্রক্রিয়াটিকে কিছুটা বিলম্বিত করেছে, কিন্তু এর ফলে একটি স্বচ্ছ এবং নির্ভুল তালিকা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে গিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, কমিশন কবে তাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে এবং তাতে রাজনৈতিক দলগুলোর কী প্রতিক্রিয়া হয়।


