রাজ্যের হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ শিক্ষক নিয়োগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার জন্য যারা প্রাণপণ লড়াই করছিলেন, তাদের জন্য এই খবরটি এক বিশাল খুশির বার্তা নিয়ে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ বা ডব্লিউবিবিপিই (WBBPE) আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেশাল এডুকেশন টিচার পদের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষা তথা টেট পরীক্ষার দিনক্ষণ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার লক্ষ্যেই পর্ষদের এই বিশেষ উদ্যোগ বলে মনে করা হচ্ছে।
Special Primary TET Exam Date 2026:
চাকরিপ্রার্থীদের মনে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন ছিল যে কবে অনুষ্ঠিত হবে এই বিশেষ স্তরের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা। পর্ষদের সচিব রঞ্জন কুমার ঝা স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিতে সেই ধোঁয়াশা পুরোপুরি কেটে গিয়েছে। সেখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আসন্ন ফেব্রুয়ারি মাসেই এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি সম্পন্ন হতে চলেছে। মূলত যারা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং বিশেষ শিশুদের শিক্ষাদানের স্বপ্ন দেখেন, তাদের শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে এটিই প্রথম এবং প্রধান ধাপ। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই যোগ্য প্রার্থীদের মেধা যাচাই করে নিয়োগের পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাওয়া হবে।
ফেব্রুয়ারি মাসেই অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বহু প্রতীক্ষিত স্পেশাল টেট পরীক্ষা
পর্ষদের ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই বিশেষ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষাটি আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি, রবিবার অনুষ্ঠিত হবে। ছুটির দিন হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের যাতায়াতে সুবিধা হবে বলে মনে করছে পর্ষদ কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষাটি শুরু হবে দুপুর ১২টায় এবং চলবে দুপুর ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। অর্থাৎ মোট আড়াই ঘণ্টা সময় পাবেন পরীক্ষার্থীরা তাদের মেধা প্রমাণের জন্য। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই প্রার্থীদের পেডাগজি এবং বিশেষ শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। পরীক্ষার এই তারিখ ঘোষণার সাথে সাথেই চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে নতুন করে পড়াশোনার উৎসাহ উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।
কাদের জন্য এই পরীক্ষা এবং নিয়োগের বিশেষ নিয়মাবলী
এই পরীক্ষাটি সবার জন্য নয়, এটি নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীর জন্যই আয়োজন করা হয়েছে। যারা গত ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী স্পেশাল এডুকেশন টিচার পদের জন্য সঠিকভাবে আবেদন করেছিলেন, শুধুমাত্র তারাই এই ২২ ফেব্রুয়ারির পরীক্ষায় বসতে পারবেন। প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ জানিয়েছে, এই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটি ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার এডুকেশন বা এনসিটিই (NCTE)-এর কড়া নির্দেশিকা মেনেই সম্পন্ন হবে। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য বিশেষ দক্ষতা সম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ করাই পর্ষদের আসল উদ্দেশ্য, তাই পরীক্ষার মানে কোনো রকম আপস করা হবে না।
অ্যাডমিট কার্ড ডাউনলোড এবং পর্ষদের দেওয়া বিশেষ নির্দেশিকা
পরীক্ষা শুরুর আগে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অ্যাডমিট কার্ড সংগ্রহ করা। পর্ষদ জানিয়েছে যে, খুব শীঘ্রই তাদের অফিসিয়াল পোর্টালে অ্যাডমিট কার্ড ডাউনলোডের লিঙ্ক সক্রিয় করা হবে। সেখানে নিজের রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং জন্ম তারিখ দিয়ে প্রার্থীরা তাদের কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন। অ্যাডমিট কার্ডে পরীক্ষার কেন্দ্রের নাম এবং সবিস্তার ঠিকানা দেওয়া থাকবে। পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে যে, পরীক্ষার দিন যেন তারা হাতে যথেষ্ট সময় নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন এবং অন্তত এক ঘণ্টা আগে নির্দিষ্ট কেন্দ্রে পৌঁছে যান। কোনো রকম বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম বা অবৈধ বস্তু নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
স্পেশাল এডুকেশন টিচার পদের গুরুত্ব ও সামাজিক প্রভাব
আমাদের সমাজে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। এই শিশুদের জন্য সাধারণ শিক্ষকের বদলে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের প্রয়োজন হয় যারা তাদের মনের ভাষা বুঝতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই নিয়োগের মাধ্যমে রাজ্যের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই বিশেষ শিশুদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাইছে। তাই এই স্পেশাল টেট পরীক্ষা শুধুমাত্র একটি নিয়োগ পরীক্ষা নয়, বরং এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব পালনের বড় সুযোগ। যারা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবেন, তারা আগামী দিনে রাজ্যের শিক্ষার মান উন্নয়নে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবেন।
প্রস্তুতির শেষ লগ্নে পরীক্ষার্থীদের জন্য কিছু বিশেষ টিপস
পরীক্ষার আর খুব বেশি দিন বাকি নেই, তাই এই শেষ সময়ে নতুন কিছু পড়ার চেয়ে পুরনো বিষয়গুলো বারবার ঝালিয়ে নেওয়া দরকার। বিশেষ করে চাইল্ড সাইকোলজি এবং বিশেষ শিক্ষা সংক্রান্ত আইন ও পদ্ধতিগুলো ভালো করে দেখে রাখা উচিত। পর্ষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং মেটাল ডিটেক্টরের ব্যবস্থা থাকতে পারে। তাই কোনো রকম অসাধু উপায়ের কথা চিন্তা না করে শুধুমাত্র নিজের পরিশ্রমের ওপর ভরসা রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। নিয়মিত পর্ষদের ওয়েবসাইট https://wbbpe.wb.gov.in অনুসরণ করলে সব খবরাখবর সবার আগে পাওয়া যাবে।
প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের এই বিশেষ ঘোষণা নিয়ে কিছু সাধারণ জিজ্ঞাসা
স্পেশাল টেট পরীক্ষাটি মোট কত নম্বরের হবে?
সাধারণত প্রাথমিক টেট পরীক্ষার মতোই এটিও ১৫০ নম্বরের হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে প্রশ্নের কাঠামোতে বিশেষ শিক্ষা বা স্পেশাল এডুকেশন সংক্রান্ত বিষয়গুলোর ওপর বেশি জোর দেওয়া হবে। সঠিক প্রশ্নের বিন্যাস জানতে পর্ষদের দেওয়া সিলেবাসটি ভালো করে অনুসরণ করা প্রয়োজন।
২২ ফেব্রুয়ারির পরীক্ষা কি পিছিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে?
এখনও পর্যন্ত পর্ষদ তাদের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে। কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা অনিবার্য কারণ না ঘটলে ২২ ফেব্রুয়ারিই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। তাই কোনো রকম গুজবে কান না দিয়ে নির্ধারিত তারিখ মাথায় রেখেই প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়া উচিত।
পরীক্ষার জন্য কি নতুন করে আবেদন করা সম্ভব?
না, এই পরীক্ষাটি শুধুমাত্র তাদের জন্য যারা ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে আবেদন করে রেখেছেন। নতুন করে আবেদন করার কোনো পোর্টাল বর্তমানে খোলা নেই। যারা আবেদন করেননি তাদের পরবর্তী বিজ্ঞপ্তির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
পরীক্ষা কেন্দ্রে কি কি নথিপত্র নিয়ে যেতে হবে?
পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার সময় অবশ্যই ডাউনলোড করা অ্যাডমিট কার্ডের প্রিন্ট আউট এবং একটি বৈধ অরিজিনাল পরিচয়পত্র (যেমন আধার কার্ড, ভোটার কার্ড বা প্যান কার্ড) সাথে রাখতে হবে। এই নথিপত্র ছাড়া কোনোভাবেই পরীক্ষা কক্ষে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের এই সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ রাজ্যের শিক্ষা ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। বহু বছর পর স্পেশাল এডুকেশন টিচার নিয়োগের এই প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে রাজ্যের বিশেষ শিশুরা তাদের প্রাপ্য অধিকার ফিরে পাবে। পরীক্ষার্থীদের জন্য রইল অনেক অনেক শুভকামনা।

