West Bengal Budget 2026: রাজ্য বাজেটে ‘কল্পতরু’ মমতা, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে ডিএ—খুশির জোয়ারে ভাসল বাংলা
২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগেই রাজ্যবাসীর জন্য বিরাট উপহার নিয়ে এল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। বুধবার বিধানসভায় পেশ হওয়া ২০২৬ সালের অন্তর্বর্তী বাজেটে কার্যত ‘কল্পতরু’ ভূমিকায় দেখা গেল রাজ্য সরকারকে। ৪ লক্ষ কোটি টাকার এই বাজেটে সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহবধূ, খেতমজুর থেকে বেকার যুবক—প্রত্যেকেই কিছু না কিছু পেলেন। অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বাজেট পেশ করতেই খুশির হাওয়া ছড়িয়ে পড়ল জেলা থেকে কলকাতায়। চলুন দেখে নেওয়া যাক, এবারের বাজেটের খুঁটিনাটি এবং সাধারণ মানুষের পকেটে কতটা স্বস্তি মিলল।
এক নজরে
পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬ : (West Bengal Budget 2026)
রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবারের বাজেট ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামনেই বিধানসভা ভোট, আর তার আগেই জনমোহিনী ঘোষণা করে মাস্টারস্ট্রোক দিল তৃণমূল সরকার। ১৩১ পাতার বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিলেন যে, এই সরকার সাধারণ মানুষের পাশে আছে। বিরোধীদের সমস্ত জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে একের পর এক জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের ভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা করা হলো। বিশেষ করে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এবং সরকারি কর্মীদের ডিএ বা মহার্ঘভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা ছিল দিনের সেরা চমক।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য সুখবর: বাড়ছে ডিএ এবং পে-কমিশনের ইঙ্গিত
দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মনে একটা ক্ষোভ জমেছিল মহার্ঘভাতা বা ডিএ নিয়ে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের দিনই সেই ক্ষোভ প্রশমনে বড় পদক্ষেপ নিলেন অর্থমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬-এ ঘোষণা করা হলো যে, রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ আরও ৪ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে। এত দিন পর্যন্ত রাজ্য সরকারি কর্মীরা ১৮ শতাংশ হারে ডিএ পেতেন। নতুন ঘোষণার ফলে আগামী ১লা এপ্রিল থেকে অর্থাৎ নতুন অর্থবর্ষে তাঁরা ২২ শতাংশ হারে মহার্ঘভাতা পাবেন।
শুধুমাত্র ডিএ বৃদ্ধিই নয়, সরকারি কর্মীদের আরও একটি বড় দাবি ছিল সপ্তম বেতন কমিশন গঠন। ভোটের আগে সেই দাবিতেও সিলমোহর দিল রাজ্য সরকার। বাজেটে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, খুব শীঘ্রই সপ্তম পে-কমিশন গঠন করা হবে। এর ফলে সরকারি কর্মীদের মূল বেতন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে সরকারি মহলে স্বস্তির বাতাস বয়ে এনেছে।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে বড় ধামাকা: মহিলাদের মুখে চওড়া হাসি
বাংলার মা-বোনেদের স্বাবলম্বী করতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প চালু করেছিলেন, তা আজ ঘরে ঘরে জনপ্রিয়। আর এবারের বাজেটে সেই জনপ্রিয়তাকে আরও উসকে দেওয়া হলো। অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করলেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মাসিক ভাতা এক লাফে ৫০০ টাকা বাড়ানো হচ্ছে।
এতদিন সাধারণ বিভাগের মহিলারা মাসে ১০০০ টাকা করে পেতেন। এখন থেকে তাঁরা পাবেন ১৫০০ টাকা। অন্যদিকে, তফসিলি জাতি ও উপজাতি ভুক্ত মহিলারা, যাঁরা আগে ১২০০ টাকা পেতেন, তাঁদের ভাতা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৭০০ টাকা। সংসারের ছোটখাটো খরচ মেটাতে আর কারোর কাছে হাত পাততে হবে না—এই লক্ষ্যেই ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হলো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচনের আগে এই ঘোষণা মহিলা ভোটব্যাঙ্ককে মজবুত করতে বড় ভূমিকা নেবে।
যুবক-যুবতীদের জন্য নতুন দিশা: ‘বাংলার যুবসাথী’
বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে রাজ্য সরকার যে সচেষ্ট, তা এবারের বাজেটে ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পের ঘোষণায় স্পষ্ট। রাজ্যের লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক-যুবতীর কথা মাথায় রেখে এই নতুন প্রকল্পটি আনা হয়েছে।
বাজেট ঘোষণা অনুযায়ী, ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী মাধ্যমিক পাশ বেকার যুবক-যুবতীরা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। এই প্রকল্পের আওতায় যোগ্য প্রার্থীদের প্রতি মাসে ১৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে। সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত এই সুবিধা পাওয়া যাবে। এই টাকা দিয়ে তারা চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া বা ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করার মতো কাজ করতে পারবেন। রাজ্যের যুবসমাজের কাছে এটি একটি বড় প্রাপ্তি।
খেতমজুর ও কৃষকদের জন্য বিশেষ নজর
বাংলার অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। তাই কৃষকদের অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। যে সমস্ত খেতমজুরের নিজস্ব জমি নেই এবং যাঁরা ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্পের সুবিধা পান না বা ভাগচাষি নন, তাঁদের জন্যও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার।
পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬-এ ঘোষণা করা হয়েছে:
- ভূমিহীন খেতমজুররা বছরে দুবার আর্থিক সাহায্য পাবেন।
- রবি মরসুম এবং খরিফ মরসুম—এই দুই সময়ে ২০০০ টাকা করে মোট ৪০০০ টাকা দেওয়া হবে।
- এর ফলে প্রান্তিক চাষিরা চাষের মরসুমে সার বা বীজ কেনার খরচ কিছুটা হলেও মেটাতে পারবেন।
আশা, অঙ্গনওয়াড়ি ও সিভিক ভলান্টিয়ারদের বেতন বৃদ্ধি
সমাজের একদম তৃণমূল স্তরে কাজ করেন আশা কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, সিভিক ভলান্টিয়ার এবং ভিলেজ পুলিশরা। এঁদের পরিশ্রমের তুলনায় পারিশ্রমিক কম—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সেই অভিযোগে মলম লাগাল এবারের বাজেট।
অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, আগামী অর্থবর্ষ থেকে এঁদের প্রত্যেকের মাসিক ভাতা ১০০০ টাকা করে বাড়ানো হবে। শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, সামাজিক সুরক্ষার দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। কর্তব্যরত অবস্থায় যদি কোনো সিভিক ভলান্টিয়ার, গ্রিন পুলিশ বা ভিলেজ পুলিশ মারা যান, তবে তাঁদের পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। আগে এই সাহায্যের পরিমাণ ছিল ৩ লক্ষ টাকা। এছাড়া, আশা কর্মীরাও এবার থেকে মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা পাবেন, যা নারীশক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন।
বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এক নজরে (তালিকা)
পাঠকদের সুবিধার্থে বাজেটের প্রধান ঘোষণাগুলো নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| প্রকল্পের নাম | পুরনো সুবিধা/ভাতা | নতুন সুবিধা/ভাতা (২০২৬ বাজেট) |
|---|---|---|
| ডিএ (DA) | ১৮% | ২২% (৪% বৃদ্ধি) |
| লক্ষ্মীর ভাণ্ডার (সাধারণ) | ১০০০ টাকা | ১৫০০ টাকা |
| লক্ষ্মীর ভাণ্ডার (SC/ST) | ১২০০ টাকা | ১৭০০ টাকা |
| বাংলার যুবসাথী | – (নতুন প্রকল্প) | ১৫০০ টাকা/মাস (২১-৪০ বছর বয়সীদের জন্য) |
| আশা/অঙ্গনওয়াড়ি | – | মাসিক ১০০০ টাকা বৃদ্ধি + মাতৃত্বকালীন ছুটি |
| সিভিক ভলান্টিয়ার | – | মাসিক ১০০০ টাকা বৃদ্ধি + ৫ লক্ষ টাকা মৃত্যুভাতা |
| প্যারা টিচার | – | মাসিক ১০০০ টাকা বৃদ্ধি + ৫ লক্ষ টাকা মৃত্যুভাতা |
গিগ ওয়ার্কার এবং পেনশনভোগীদের জন্য স্বস্তি
বর্তমান যুগে অনলাইনে খাবার বা পণ্য ডেলিভারি দেওয়া গিগ ওয়ার্কারদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু তাঁদের কোনো সামাজিক সুরক্ষা ছিল না। এবারের বাজেটে তাঁদের কথা আলাদা করে ভাবা হয়েছে। গিগ ওয়ার্কারদের জন্য একটি নির্দিষ্ট পোর্টাল চালু করা হবে এবং তাঁদের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় আনা হবে।
অন্যদিকে, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য বিমার সুবিধাও বাড়ানো হয়েছে। এতদিন ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ স্কিম’-এ ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা পাওয়া যেত। এখন থেকে ২ লক্ষ টাকার বেশি বিল হলে, সেই অতিরিক্ত খরচের ৭৫ শতাংশই ক্যাশলেস হিসেবে পাওয়া যাবে। বয়স্ক মানুষদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় স্বস্তির খবর।
বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের কিছু প্রশ্ন ও উত্তর
বাজেট ঘোষণার পর সাধারণ মানুষের মনে বেশ কিছু প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। এখানে পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬ সম্পর্কিত কিছু জরুরি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
১. এই বর্ধিত ভাতা কবে থেকে পাওয়া যাবে?
বাজেটে ঘোষিত সমস্ত বর্ধিত ভাতা এবং বেতন আগামী অর্থবর্ষ অর্থাৎ ১লা এপ্রিল, ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। অর্থাৎ এপ্রিল মাসের বেতন বা ভাতার সঙ্গেই বাড়তি টাকা হাতে আসবে।
২. ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পে কারা আবেদন করতে পারবেন?
এই প্রকল্পে আবেদন করার জন্য প্রার্থীকে অবশ্যই মাধ্যমিক পাশ হতে হবে। বয়স হতে হবে ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে এবং তাঁকে বর্তমানে বেকার হতে হবে। কোনো সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে নিযুক্ত থাকলে এই সুবিধা পাওয়া যাবে না।
৩. লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে কি নতুন করে আবেদন করতে হবে?
যাঁরা ইতিমধ্যেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা পাচ্ছেন, তাঁদের নতুন করে আবেদন করার প্রয়োজন নেই। তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্ধিত টাকা (১৫০০ বা ১৭০০) ঢুকে যাবে। তবে যাঁরা এখনও এই প্রকল্পের আওতায় আসেননি, তাঁরা দুয়ারে সরকার ক্যাম্পে গিয়ে নতুন করে আবেদন করতে পারেন।
উপসংহার
সামগ্রিকভাবে দেখতে গেলে, ২০২৬ সালের এই বাজেট আক্ষরিক অর্থেই জনমুখী। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ, বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া শ্রেণি, মহিলা এবং যুবকদের কথা মাথায় রেখে এই বাজেট তৈরি করা হয়েছে। বিরোধীরা একে ‘নির্বাচনী চমক’ বললেও, সাধারণ মানুষের কাছে মাস শেষে পকেটে আসা বাড়তি টাকাটাই আসল। ‘কল্পতরু’ মমতার এই বাজেটের সুফল মানুষ কতটা পাবেন, তা সময় বলবে, তবে আপাতত রাজ্যজুড়ে খুশির আমেজ যে স্পষ্ট, তা বলাই বাহুল্য। পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬ সত্যিই রাজ্যের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে একটি বড় পদক্ষেপ।
এক নজরে কাদের লাভ হলো (লিস্ট)
- মহিলা: লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বৃদ্ধি, আশা কর্মীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি।
- ছাত্র-যুব: নতুন ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পে বেকার ভাতা।
- সরকারি কর্মী: ৪% ডিএ বৃদ্ধি ও সপ্তম পে-কমিশনের ঘোষণা।
- অসংগঠিত শ্রমিক: গিগ ওয়ার্কারদের সামাজিক সুরক্ষা ও খেতমজুরদের অনুদান।
- অবসরপ্রাপ্ত: স্বাস্থ্য বিমায় ক্যাশলেস চিকিৎসার সীমা বৃদ্ধি।







