লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাজেট ২০২৬: মাসে ১৫০০ ও ১৭০০ টাকা! জেনে নিন কবে ঢুকবে বর্ধিত অনুদান

২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের রাজ্য বাজেটে মহিলাদের জন্য বাম্পার উপহার! লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের ভাতা ৫০০ টাকা বাড়িয়ে জেনারেলদের জন্য ১৫০০ এবং তফশিলিদের জন্য ১৭০০ টাকা করা হলো। ফেব্রুয়ারি থেকেই মিলবে এই সুবিধা। বিস্তারিত জানতে পড়ুন আজকের প্রতিবেদন।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাজেট ২০২৬ : Lakshmir Bhandar Budget 2026: রাজ্যের নারীশক্তির জন্য এক বিশাল সুখবর নিয়ে এল রাজ্য সরকার, যা চায়ের কাপে তুফান তুলেছে আজ সকাল থেকেই। বিধানসভায় পেশ হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের অন্তর্বর্তী বাজেটে অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য মা-বোনেদের মুখে হাসি ফুটিয়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের ভাতা আবারও বৃদ্ধির ঘোষণা করলেন। সামনেই বিধানসভা নির্বাচন, আর তার আগেই এই মাস্টারস্ট্রোক যে বিরোধীদের বেশ চাপে ফেলবে তা বলাই বাহুল্য। এবারের বাজেটে ৫০০ টাকা করে সরাসরি বাড়ানো হলো মহিলাদের মাসিক হাতখরচ, যা ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।

বাজেটে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়ে ধামাকা ঘোষণা

দীর্ঘদিন ধরেই জল্পনা চলছিল যে ভোটের আগে দিদি হয়তো কিছু একটা চমক দেবেন। সেই জল্পনাকে সত্যি করে বিধানসভায় বাজেট পেশের সময় অর্থমন্ত্রী জানালেন, বাংলার মা-বোনেদের স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে চালু হওয়া লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের টাকা আবারও বাড়ানো হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যখন আকাশছোঁয়া, তখন এই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাজেট ২০২৬ -এর ঘোষণা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মহিলাদের কাছে যেন আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো। সরকার পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, উন্নয়নের যজ্ঞে নারীরাই তাদের প্রধান শক্তি, তাই তাদের হাতে আরও বেশি করে অর্থের জোগান দেওয়াটা সরকারের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।

এখন থেকে কারা কত টাকা পাবেন?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে—টাকা তো বাড়ল, কিন্তু কার একাউন্টে ঠিক কত ঢুকবে? সহজ করে বললে, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই প্রকল্পের আওতায় থাকা সব মহিলাই এবার থেকে ৫০০ টাকা বেশি পাবেন। আগে যেখানে সাধারণ জাতিভুক্ত বা জেনারেল ক্যাটাগরির মহিলারা মাসে ১০০০ টাকা করে পেতেন, নতুন ঘোষণা অনুযায়ী তাঁরা এবার থেকে পাবেন ১৫০০ টাকা।

অন্যদিকে, আমাদের তপশিলি জাতি (SC) এবং তপশিলি উপজাতি (ST) ভুক্ত মা-বোনেরা, যারা এতদিন মাসে ১২০০ টাকা করে পাচ্ছিলেন, তাঁদের ভাতাও ৫০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ, এখন থেকে তাঁরা প্রতি মাসে ১৭০০ টাকা করে পাবেন। একধাক্কায় এতটা বৃদ্ধি সত্যিই নজিরবিহীন। এই বাড়তি টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকে যাবে, এর জন্য নতুন করে ব্যাঙ্কে লাইন দেওয়ার কোনো দরকার নেই।

এক নজরে নতুন ও পুরনো ভাতার তালিকা

উপভোক্তার শ্রেণিআগের মাসিক ভাতা (২০২৪-২৫)নতুন মাসিক ভাতা (ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে)মোট বৃদ্ধি
সাধারণ শ্রেণি (General)১,০০০ টাকা১,৫০০ টাকা৫০০ টাকা
তপশিলি জাতি (SC)১,২০০ টাকা১,৭০০ টাকা৫০০ টাকা
তপশিলি উপজাতি (ST)১,২০০ টাকা১,৭০০ টাকা৫০০ টাকা

কবে থেকে মিলবে এই বর্ধিত টাকা?

খুশির খবর এখানেই শেষ নয়। সাধারণত বাজেটের ঘোষণা কার্যকর হতে হতে এপ্রিল মাস গড়িয়ে যায়। কিন্তু এবার সরকার আর দেরি করতে চায় না। অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাজেট ২০২৬ -এর বর্ধিত হার চলতি ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই কার্যকর হবে। অর্থাৎ, মার্চ মাসের শুরুতেই যখন ফোনের মেসেজ টোন বাজবে, তখন দেখবেন অ্যাকাউন্টে আগের চেয়ে ৫০০ টাকা বেশি ঢুকেছে। ভোটের আগে হাতে গরম এই উপহার যে মহিলাদের মন জয় করতে বড় ভূমিকা নেবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কোনো দ্বিমত নেই।

কেন এই প্রকল্প এত গেমচেঞ্জার?

২০২১ সালে যখন প্রথম এই প্রকল্প চালু হয়, তখন অনেকেই এর ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে, বাংলার প্রায় ২ কোটি ৪২ লক্ষ মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব মারাত্মক। গ্রামের একজন সাধারণ গৃহবধূ, যার নিজের বলে কোনো আয় ছিল না, তিনি এখন মাসের শেষে ১৫০০ বা ১৭০০ টাকা হাতে পাবেন। এই টাকা দিয়ে কেউ ছেলেমেয়ের টিউশন ফি দিচ্ছেন, কেউ বা ছোটখাটো মুদির দোকান চালাচ্ছেন।

মহিলাদের হাতে নগদ টাকা থাকলে তা সংসারের কাজেই খরচ হয়, আর তাতে বাজারের কেনাকাটা বাড়ে। পরোক্ষভাবে রাজ্যের অর্থনীতির চাকাও ঘোরে। এই কারণেই বিরোধীরা একে ‘টাকা ছড়ানো’ বললেও, সাধারণ মানুষ কিন্তু দু-হাত তুলে আশীর্বাদ করছেন। এবারের বাজেটে এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ আরও ১৫ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা সরকারের সদিচ্ছারই প্রমাণ।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়ে সাধারণের কিছু জিজ্ঞাসা (Q&A)

প্রশ্ন: আমার কার্ড জেনারেল কাস্টের, আমি কি ১৫০০ টাকা পাব?

উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই। নতুন নিয়ম অনুযায়ী জেনারেল ক্যাটাগরির সব মহিলাই এখন থেকে ১০০০ টাকার বদলে ১৫০০ টাকা করে পাবেন।

প্রশ্ন: নতুন টাকার জন্য কি আবার দুয়ারে সরকারে ফর্ম জমা দিতে হবে?

উত্তর: না, একদমই না। যারা ইতিমধ্যেই টাকা পাচ্ছেন, তাঁদের নতুন করে কিচ্ছু করতে হবে না। সরকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিস্টেম আপডেট করে দেবে এবং আপনার পুরনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বাড়তি টাকা ঢুকে যাবে।

প্রশ্ন: যারা এখনো আবেদন করেননি, তাঁরা কি এই সুবিধা পাবেন?

উত্তর: অবশ্যই। আপনি যদি যোগ্য হন এবং এখনো আবেদন না করে থাকেন, তবে পরবর্তী দুয়ারে সরকার ক্যাম্পে বা বিডিও অফিসে গিয়ে আবেদন করতে পারেন। আবেদন মঞ্জুর হলে আপনিও নতুন হারেই অর্থাৎ ১৫০০ বা ১৭০০ টাকা পাবেন।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন: লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাজেট ২০২৬ -এ কি বয়সের কোনো পরিবর্তন হয়েছে?

উত্তর: না, বয়সের সময়সীমা ২৫ থেকে ৬০ বছরই রাখা হয়েছে। তবে ৬০ বছর পেরিয়ে গেলে আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বার্ধক্য ভাতার আওতায় চলে যাবেন এবং তখন মাসে ১০০০ টাকার বদলে বার্ধক্য ভাতার নিয়ম অনুযায়ী টাকা পাবেন।

শুধু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নয়, আরও উপহার

মহিলাদের পাশাপাশি যুব সমাজের জন্যও এবারের বাজেটে বড় ঘোষণা রয়েছে। ‘বাংলার যুব সাথী’ নামে এক নতুন প্রকল্প চালু হচ্ছে, যেখানে ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী বেকার যুবক-যুবতীরা মাসে ১৫০০ টাকা করে উৎসাহ ভাতা পাবেন। এছাড়াও সরকারি কর্মচারীদের জন্য ৪ শতাংশ ডিএ (DA) বাড়ানোর কথা ঘোষণা করা হয়েছে। আশা কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী এবং সিভিক ভলান্টিয়ারদের বেতনও ১০০০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর এই বাজেটকে জনমোহিনী বা ‘ভোট অন অ্যাকাউন্ট’ যাই বলা হোক না কেন, সাধারণ মানুষের পকেটের ভার যে কিছুটা লাঘব হবে, তা নিশ্চিত।

কাদের জন্য এই প্রকল্প? (Eligibility Checklist)

এই বর্ধিত সুবিধা পেতে হলে কিছু প্রাথমিক শর্ত পূরণ করতে হয়, যা নিচে দেওয়া হলো:

  • আবেদনকারীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
  • পরিবারের কোনো সদস্য আয়করদাতা বা সরকারি চাকরিজীবী হলে এই সুবিধা পাওয়া যাবে না।
  • আবেদনকারীর নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে যা আধারের সঙ্গে লিঙ্ক করা।
  • স্বাস্থ্যসাথী কার্ড থাকা বাঞ্ছনীয়, যদিও এখন আধার কার্ড দিয়েও কাজ হচ্ছে।
  • বয়সসীমা ২৫ বছরের ঊর্ধ্বে এবং ৬০ বছরের নিচে হতে হবে।

নারীর ক্ষমতায়নে এক নতুন অধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গ সরকার বরাবরই নারীকল্যাণে জোর দিয়ে এসেছে। কন্যাশ্রী থেকে রূপশ্রী, আর এখন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার—প্রতিটি প্রকল্পই মহিলাদের জীবনের মানোন্নয়নে সাহায্য করেছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাজেট ২০২৬ -এ ভাতার পরিমাণ ১৫০০ ও ১৭০০ টাকায় নিয়ে যাওয়াটা শুধু অর্থের অঙ্ক নয়, এটি সম্মানের প্রতীক। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে একজন মহিলার হাতে মাসে ১৫০০ টাকা থাকা মানে তিনি তাঁর ছোটখাটো প্রয়োজনের জন্য আর স্বামীর বা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না। এই আত্মবিশ্বাসটাই আসল।

বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য কটাক্ষ করে বলেছেন, “৫০০ টাকায় আজকাল কী হয়?” কিন্তু গ্রামের সেই দিদিমা বা কাকিমাকে জিজ্ঞাসা করুন, যিনি ওষুধের টাকাটা নিজের আঁচল থেকেই বের করে দিতে পারবেন—তাঁর কাছে এই ৫০০ টাকার মূল্য অনেক। রাজনীতির আঙিনায় তর্ক-বিতর্ক চলবেই, কিন্তু দিনের শেষে সাধারণ মানুষের লাভটাই আসল কথা।

ভবিষ্যতের পথে বাংলা

অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, এত টাকা সরকার কোথা থেকে পাবে? রাজ্যের ঋণের বোঝা কি বাড়বে না? অর্থমন্ত্রী অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন যে রাজ্যের নিজস্ব রাজস্ব আদায় বেড়েছে এবং সেই টাকা থেকেই এই প্রকল্প চালানো হবে। তাছাড়া, মানুষের হাতে টাকা থাকলে তা খরচ হয়, যা জিএসটি (GST) সংগ্রহের মাধ্যমে আবার সরকারের কোষাগারেই ফিরে আসে। এটি অর্থনীতির এক চক্রাকার গতি।

সামনেই বিধানসভা ভোট। তার আগে এই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাজেট ২০২৬ নিঃসন্দেহে শাসকদলের তুরুপের তাস। তবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেখলে, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গ যে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের কাছে এক মডেল হয়ে উঠছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। মাসে ১৫০০ টাকা বা ১৭০০ টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা একজন নারীকে যে মানসিক শান্তি দেয়, তা কোনো অঙ্কে মাপা সম্ভব নয়।

Leave a Comment

🌍
Created with ❤