পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬: আগামী বিধানসভা ভোটকে পাখির চোখ করে বাংলায় এবার জোরদার প্রচারে নামতে চলেছে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে এবার রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ‘পরিবর্তন যাত্রা’ বা রথযাত্রা শুরু করার মেগা পরিকল্পনা নিয়েছে গেরুয়া শিবির। আগামী ১লা ও ২রা মার্চ থেকে শুরু হতে চলা এই বিরাট রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দিল্লি থেকে উড়ে আসছেন দলের প্রথম সারির নয়জন হেভিওয়েট নেতা ও মন্ত্রী। অমিত শাহ থেকে শুরু করে শিবরাজ সিং চৌহান—সবাই মিলে রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্র চষে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এক নজরে
বাংলায় ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে বিজেপির মেগা প্রচার এবং পরিবর্তন যাত্রার সূচনা
আগামী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এ নিজেদের জমি শক্ত করতে এবার কোমর বেঁধে ময়দানে নামছে বিজেপি। গতবারের নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না মেলার পর এবার আর কোনো ফাঁকফোকর রাখতে চাইছে না দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সেই লক্ষ্যেই তারা এবার গোটা রাজ্য জুড়ে ‘পরিবর্তন যাত্রা’-র ডাক দিয়েছে, যাকে রাজনৈতিক মহলে অনেকেই বকলমে রথযাত্রা হিসেবেও অভিহিত করছেন। আগামী মার্চ মাসের একেবারে শুরু থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই মেগা প্রচার অভিযান শুরু হতে চলেছে।
বিজেপি সূত্রে খবর, শুধুমাত্র রাজ্য স্তরের নেতাদের ওপর ভরসা না করে এবার সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হাত ধরেই এই বিশাল পরিবর্তন যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা হতে চলেছে। রাজ্যের মোট ৯টি আলাদা আলাদা জায়গা থেকে এই যাত্রার সূচনা করা হবে এবং এর জন্য দিল্লি থেকে আসছেন দলের ৯ জন কেন্দ্রীয় নেতা ও মন্ত্রী। বঙ্গ বিজেপির এই মেগা ইভেন্টকে সফল করতে ইতিমধ্যেই নিচুতলার কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং রাজ্যবাসীকে একটি বিশেষ চিঠি পাঠিয়ে বিজেপিকে জয়যুক্ত করার আবেদনও জানানো হয়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের তরফ থেকে।
মার্চ মাসের শুরু থেকেই রাজ্যের কোন কোন প্রান্ত থেকে শুরু হচ্ছে গেরুয়া শিবিরের এই রথযাত্রা?
বঙ্গ বিজেপির তরফ থেকে ইতিমধ্যেই এই আসন্ন প্রচার কর্মসূচির একটি বিস্তারিত সূচি প্রকাশ করা হয়েছে। সেই সূচি অনুযায়ী, আগামী ১লা মার্চ থেকে এই পরিবর্তন যাত্রার চাকা গড়াতে শুরু করবে। ওইদিন দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘিতে উপস্থিত থাকবেন খোদ অমিত শাহ। শুধু রায়দিঘি নয়, ওই একই দিনে রাজ্যের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা যেমন কোচবিহার দক্ষিণ, কৃষ্ণনগর দক্ষিণ, কুলটি এবং গড়বেতা থেকেও এই পরিবর্তন যাত্রার সূচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এর ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ ২রা মার্চ রাজ্যের অন্যতম চর্চিত এলাকা সন্দেশখালি থেকে এই যাত্রার সূচনা করবেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান। এছাড়া ওইদিনই ইসলামপুর, আমতা এবং হাসন থেকেও রথযাত্রার সূচনা হবে বলে জানা গেছে। এই রথযাত্রাগুলি ধীরে ধীরে রাজ্যের প্রতিটি কোণায় পৌঁছে যাবে এবং মোট ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্র দিয়েই এই যাত্রার রুট ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে, যাতে রাজ্যের প্রতিটি ভোটারের কাছে দলের বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।
দিল্লি থেকে কোন কোন প্রথম সারির নেতা ও মন্ত্রীরা আসছেন বাংলার এই রাজনৈতিক ময়দানে?
আগামী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এ জয়লাভ করার জন্য বিজেপি যে তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে চলেছে, তা তাদের তারকা প্রচারকদের তালিকা দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। দলের নয়জন হেভিওয়েট নেতাকে এই প্রচারের মুখ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যাদের ‘নবরত্ন’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। অমিত শাহ এবং শিবরাজ সিং চৌহানের পাশাপাশি আরও একাধিক শীর্ষ নেতা এই যাত্রায় সরাসরি অংশগ্রহণ করতে চলেছেন।
দলের সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংও এই প্রচার কর্মসূচিতে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। এছাড়া এই মেগা প্রচারে শামিল হচ্ছেন কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রী নীতিন গড়করি, ধর্মেন্দ্র প্রধান এবং স্মৃতি ইরানির মতো পরিচিত মুখেরা। শুধু কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরাই নন, এই বিশেষ পরিবর্তন যাত্রায় অংশ নিতে বাংলায় আসছেন মহারাষ্ট্রের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশও।
এই প্রচার কর্মসূচিতে যে সমস্ত হেভিওয়েট নেতারা অংশ নিচ্ছেন, তাদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- অমিত শাহ (কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)
- জে পি নাড্ডা (বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি)
- রাজনাথ সিং (কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী)
- শিবরাজ সিং চৌহান (কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী)
- নীতিন গড়করি, ধর্মেন্দ্র প্রধান, স্মৃতি ইরানি এবং দেবেন্দ্র ফড়নবীশ।
গতবারের অভিজ্ঞতার পর এবারের রথযাত্রা কি সত্যিই ভোট বাক্সে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে?
রাজনৈতিক মহলের একাংশ অবশ্য বিজেপির এই মেগা পরিবর্তন যাত্রার সফলতা নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগেও বিজেপি রাজ্য জুড়ে রথযাত্রার এক বিশাল পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু তাতে খুব একটা আশানুরূপ ফল মেলেনি। সেই সময় এ রাজ্যে বিজেপির সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং নিচুতলার বহু কর্মীর নিষ্ক্রিয়তা দলের জয়ের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে মনে করেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। আগামী ভোটকে সামনে রেখে রাজ্য বিজেপির পর্যবেক্ষক হিসেবে ইতিমধ্যেই দুই কেন্দ্রীয় নেতাকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা ঘনঘন রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করে সংগঠনকে তৃণমূল স্তর থেকে শক্তিশালী করার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন। মন্ডল স্তরের সংগঠনকে আরও সক্রিয় ও চাঙ্গা করে তুলতেই মূলত এই পরিবর্তন যাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। তবে এর কতটা ফায়দা বিজেপি তাদের ভোট বাক্সে তুলতে পারবে, তা চূড়ান্ত ফলাফল না আসা পর্যন্ত বলা কঠিন।
| তারিখ | কোথা থেকে শুরু হচ্ছে রথযাত্রা | উপস্থিত থাকছেন কোন হেভিওয়েট নেতা |
|---|---|---|
| ১লা মার্চ | রায়দিঘি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা | অমিত শাহ |
| ১লা মার্চ | কোচবিহার, কৃষ্ণনগর, কুলটি, গড়বেতা | অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব |
| ২রা মার্চ | সন্দেশখালি | শিবরাজ সিং চৌহান |
| ২রা মার্চ | ইসলামপুর, আমতা, হাসন | অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব |
তৃণমূল স্তরে সংগঠনকে মজবুত করতে এবং ভোটারদের মন জয় করতে বিজেপির নতুন রণকৌশল
আগামী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-কে কেন্দ্র করে বিজেপি শুধু রথযাত্রাতেই থেমে থাকছে না, দলের ভিত মজবুত করতে আরও বেশ কিছু কৌশল গ্রহণ করেছে। নিচুতলার কর্মীদের মনোবল বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের কাছে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন খামতিগুলো তুলে ধরাই এই প্রচারের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। পরিবর্তন যাত্রার মাধ্যমে নেতারা সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাইছেন এবং তাদের অভাব অভিযোগের কথা শুনতে চাইছেন।
বিজেপির এই নয়া কৌশলের পেছনে মূল লক্ষ্য হলো বুথ স্তরের সংগঠনকে একেবারে চাঙ্গা করা। কেন্দ্রীয় নেতারা যখন পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে প্রচার করবেন, তখন স্বভাবতই নিচুতলার কর্মীরা অনেকটা উৎসাহিত হবেন। এই উৎসাহকেই আগামী দিনের ভোটের বাক্সে কাজে লাগাতে চাইছে পদ্ম শিবির। এখন দেখার বিষয়, তাদের এই নতুন রণকৌশল রাজ্যের শাসক দলকে কতটা চাপে ফেলতে পারে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর
বিজেপির এই পরিবর্তন যাত্রা কবে থেকে শুরু হচ্ছে এবং এর মূল লক্ষ্য কী?
বিজেপির এই মেগা পরিবর্তন যাত্রা বা রথযাত্রা শুরু হতে চলেছে আগামী ১লা এবং ২রা মার্চ থেকে। এর মূল লক্ষ্য হলো আগামী রাজ্য বিধানসভা ভোটে দলের পালে হাওয়া টানা এবং তৃণমূল স্তরে দলের সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও সক্রিয় করে তোলা, যাতে তারা রাজ্যে সরকার গঠন করতে পারে।
এই প্রচার অভিযানে দিল্লি থেকে কে কে বাংলায় আসছেন?
এই বিরাট প্রচার কর্মসূচির সূচনা করতে দিল্লি থেকে অমিত শাহ, জে পি নাড্ডা, রাজনাথ সিং, শিবরাজ সিং চৌহানের মতো প্রথম সারির ন’জন শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রী বাংলায় উড়ে আসছেন। এছাড়া মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশও এই প্রচার যাত্রায় অংশ নিতে চলেছেন বলে জানা গেছে।
মার্চ মাসের ১ তারিখে কোথা থেকে এই যাত্রার সূচনা হবে?
১লা মার্চ দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘি থেকে এই যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা করবেন অমিত শাহ। এর পাশাপাশি ওই একই দিনে কোচবিহার দক্ষিণ, কৃষ্ণনগর দক্ষিণ, কুলটি এবং গড়বেতা থেকেও এই পরিবর্তন যাত্রার রথ গড়ানো শুরু হবে।
আগের বারের রথযাত্রার সাথে এবারের যাত্রার পার্থক্য কোথায়?
আগের বার সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে রথযাত্রা খুব একটা সফল হয়নি বলে মনে করা হয়। কিন্তু এবার আগামী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর কথা মাথায় রেখে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকরা অনেক আগে থেকেই মন্ডল এবং বুথ স্তরের সংগঠনকে চাঙ্গা করার কাজ শুরু করেছেন, যার ওপর ভর করেই এবারের রথযাত্রার সাফল্য নির্ভর করছে।
উপসংহার: ভোটমুখী বাংলায় রাজনৈতিক উত্তাপের নতুন পারদ চড়ছে
পরিশেষে বলাই যায় যে, আসন্ন ভোটকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে ইতিমধ্যেই দামামা বেজে গেছে। বিজেপির এই পরিবর্তন যাত্রার মাধ্যমে তারা যে তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ভোটের ময়দানে নামতে চলেছে, তা একেবারে জলের মতো পরিষ্কার। অমিত শাহ থেকে শুরু করে রাজনাথ সিং—দিল্লির শীর্ষ নেতাদের এই লাগাতার প্রচার রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপকে যে আগামী কয়েক মাসের জন্য কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, যে এই ‘নবরত্ন’-এর মেগা প্রচার সাধারণ ভোটারদের কতটা প্রভাবিত করতে পারে এবং আগামী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এ তা ইভিএম মেশিনে কতটা প্রতিফলিত হয়। শাসক দলও নিশ্চয়ই হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না, তারাও নিজেদের মতো করে পাল্টা ঘুঁটি সাজাবে, আর এর ফলেই আগামী নির্বাচন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অন্যতম চর্চিত এবং হাইভোল্টেজ নির্বাচনে পরিণত হতে চলেছে।










