২০২৬ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হতেই রাজ্যজুড়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে পরীক্ষার্থীদের অভিনব সব নকল করার কায়দা দেখে। পর্ষদের কড়া নজরদারি সত্ত্বেও কোথাও জুতোর ভেতরে, আবার কোথাও অন্তর্বাসের মধ্যে লুকিয়ে মোবাইল ফোন নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢুকে পড়ছে ছাত্রছাত্রীরা। এমনকি এই অসাধু উপায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের মতো চাঞ্চল্যকর তথ্যও সামনে এসেছে। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে কিছু জায়গায় শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, যা শিক্ষা মহলে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
WBBSE Secondary Exam Cheating Incidents:
চলতি বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষায় নকল করার যে সমস্ত ঘটনা সামনে আসছে, তা গতানুগতিক টুকলির ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। মধ্যশিক্ষা পর্ষদ সূত্রে খবর, ভূগোলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার দিনও রাজ্যজুড়ে অন্তত ১২ জন পরীক্ষার্থী মোবাইল ফোনসহ হাতেনাতে ধরা পড়েছে। এবারের পরীক্ষায় সবথেকে বড় আশঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার। গত কয়েকদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, পরীক্ষার্থীরা দলবদ্ধভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করছে। জুতোর সোলের নিচে বা অন্তর্বাসের মতো গোপন জায়গায় ফোন লুকিয়ে তারা প্রশাসনের চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা করছে।
জুতোর ভেতর মোবাইল থেকে শৌচাগারে লুকানো ফোন: মাধ্যমিকের হাড়হিম করা কান্ড
এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় জালিয়াতির ধরন দেখে স্তম্ভিত খোদ পর্ষদ কর্তারা। কলকাতা ছাড়াও উত্তর ২৪ পরগনা, হুগলি, পূর্ব মেদিনীপুর, বীরভূম এবং পশ্চিম বর্ধমানের মতো জেলাগুলো থেকে একের পর এক মোবাইল ব্যবহারের অভিযোগ আসছে। অনেক পরীক্ষার্থী আবার পরীক্ষার আগেই কৌশলে শৌচাগারের কোনো কোণায় মোবাইল ফোন লুকিয়ে রেখে আসছিল। পরে পরীক্ষার মাঝে জল খাওয়ার নাম করে গিয়ে সেখান থেকে উত্তর দেখে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। তবে পর্ষদের ফ্লাইং স্কোয়াড এবং সিসিটিভি ক্যামেরার কড়া নজরদারিতে শেষরক্ষা হচ্ছে না অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। যারা এই ধরণের অসাধু কাজে লিপ্ত ছিল, তাদের প্রত্যেকেরই পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে।
শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন এবং পর্ষদের কড়া পদক্ষেপ
পরীক্ষার্থীদের পাশাপাশি এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়েও কালিমা লিপ্ত হয়েছে। মালদার মথুরাপুর বিএসএস হাইস্কুলের একজন গণিতের শিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জানা গিয়েছে, তিনি পরীক্ষার উত্তর লিখে সরাসরি পরীক্ষার্থীদের পাচার করছিলেন এবং তাদের উত্তর বলে দিচ্ছিলেন। সিসিটিভি ক্যামেরায় সেই দৃশ্য ধরা পড়ার পর অভিযুক্ত শিক্ষক সেখান থেকে চম্পট দেন। একজন শিক্ষকের এমন আচরণে অবাক হয়েছেন পর্ষদ সভাপতি রামানুজ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, যেখানে শিক্ষকই নকল করতে সাহায্য করছেন, সেখানে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নকলের সাথে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি ও এআই-এর কারসাজি
পর্ষদ সভাপতি জানিয়েছেন, এ বছর টোকাটুকির ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। পরীক্ষার্থীরা ব্যক্তিগতভাবে টুকলি করার চেয়ে এখন দলগতভাবে প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে উত্তর জেনে নিচ্ছে। কোথাও পুরনো বছরের প্রশ্নপত্র সামনে রেখে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টাও চলছে। এমনকি অনেক জায়গায় শৌচাগারে প্রশ্নপত্র নিয়ে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাপ ব্যবহার করে দ্রুত উত্তর সমাধান করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে পর্ষদের ডিজিটাল সার্ভেল্যান্স টিম অত্যন্ত সক্রিয় থাকায় এই সব চক্রগুলো ভেঙে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
পরীক্ষাকেন্দ্রে ভাঙচুর এবং প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ
পরীক্ষার মাঝেই কলকাতার একটি নামী স্কুলের পরীক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অন্য একটি স্কুলের সম্পত্তি নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে। মোমিন হাইস্কুলে পরীক্ষা দিতে এসে খন্না হাইস্কুলের কিছু ছাত্র পরীক্ষাকক্ষ ভাঙচুর করে এবং সিলিং ফ্যানের ব্লেড বাঁকিয়ে দেয়। যদিও শিক্ষা পর্ষদের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না জানিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আপোসে মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, হুগলির একটি স্কুলে একজন কম্পার্টমেন্টাল পরীক্ষার্থী সমস্ত পরীক্ষা দিয়ে দিচ্ছিল, অথচ তার মাত্র দুটি বিষয় দেওয়ার কথা ছিল। এই ঘটনায় ভেন্যু সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের প্রতি প্রশাসনের বার্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
শিক্ষাব্যবস্থাকে কলঙ্কমুক্ত করতে পর্ষদ এবার জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে। যারা নকল করছে তাদের বিরুদ্ধে যেমন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তেমনই যে সমস্ত শিক্ষক বা আধিকারিকরা এতে মদত দিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। পর্ষদ সভাপতি পড়ুয়াদের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়েছেন যে, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সাময়িক সুবিধা মিললেও ভবিষ্যতে এর ফল হবে মারাত্মক। প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে এখন আরও বেশি সক্রিয়ভাবে মেটাল ডিটেক্টর এবং সিসিটিভি মনিটরিং করা হচ্ছে যাতে কোনোভাবেই কেউ জুতো বা অন্য কোনো মাধ্যমে বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম নিয়ে ঢুকতে না পারে।
মাধ্যমিক পরীক্ষার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কিছু প্রশ্ন
পরীক্ষাকেন্দ্রে মোবাইল ধরা পড়লে শাস্তির বিধান কী?
যদি কোনো পরীক্ষার্থী মোবাইল ফোনসহ ধরা পড়ে, তবে তৎক্ষণাৎ তার ওই দিনের পরীক্ষা এবং ক্ষেত্রবিশেষে পুরো মাধ্যমিক পরীক্ষা বাতিল করে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীকে ভবিষ্যতে আর পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হবে কি না, তা পর্ষদের উচ্চপর্যায়ের কমিটি ঠিক করে।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে নকল করতে ব্যবহৃত হচ্ছে?
পরীক্ষার্থীরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন এআই অ্যাপে প্রশ্নের ছবি তুলে পাঠিয়ে দিচ্ছে, যা মুহূর্তে নির্ভুল উত্তর তৈরি করে দিচ্ছে। এই প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে গতানুগতিক উপায়ে টোকাটুকি ধরা কঠিন হয়ে পড়ছে, তাই পর্ষদ এখন টেকনিক্যাল নজরদারি বাড়িয়েছে।
শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি?
হ্যাঁ, যেসব শিক্ষক সরাসরি নকল করতে সাহায্য করেছেন বা কর্তব্যে গাফিলতি দেখিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। দোষী প্রমাণিত হলে তাদের বেতন বন্ধ থেকে শুরু করে চাকরি চলে যাওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
আগামী দিনের পরীক্ষাগুলোতে কি নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হবে?
নিশ্চয়ই। প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখে পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে নজরদারি আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্রীদের তল্লাশির জন্য মহিলা কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
রাজ্যজুড়ে মাধ্যমিক পরীক্ষার এই টালমাটাল পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের কাছে এক বড় পরীক্ষা। একদিকে যেমন মেধাবী ছাত্রদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে অসাধু উপায় অবলম্বনকারী পরীক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দমন করতে হবে। পর্ষদের দৃঢ় বিশ্বাস, কড়া পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই আধুনিক উপায়ে নকল করার প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হবে।

