ভারতের বিচারব্যবস্থা এবং সংবিধানের মর্যাদা রক্ষায় ফের একবার সরব হলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জলপাইগুড়িতে কলকাতা হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চের নতুন ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি সাফ জানালেন, দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো টিকিয়ে রাখতে বিচারালয়ের ভূমিকা আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ তোলার পাশাপাশি তিনি সংবিধান রক্ষার এই লড়াইয়ে বিচারপতিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন, সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল হলো আদালত, আর সেই আস্থাকে সম্মান জানানোই এখনকার সময়ের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষায় মমতার বিশেষ বার্তা
শনিবার জলপাইগুড়িতে আয়োজিত এই মেগা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন মেঘওয়াল। তাঁদের সামনেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশ আজ এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, সরাসরি নাম না নিলেও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের কাজের ধরণ এবং গণতান্ত্রিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টার বিরুদ্ধেই তিনি বিচারালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
কেন্দ্রীয় বঞ্চনা ও ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের ভবিষ্যৎ
অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই রাজ্যের প্রাপ্য টাকা আটকে রাখা নিয়ে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার সাধারণ মানুষকে দ্রুত ন্যায়বিচার দিতে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট তৈরির ওপর জোর দিচ্ছে, কিন্তু কেন্দ্র সেই খাতে বরাদ্দ অর্থ বন্ধ করে দিয়েছে। এই বঞ্চনা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার পিছিয়ে নেই। মুখ্যমন্ত্রী তথ্য দিয়ে জানান, তাঁর সরকার রাজ্যের বিচার বিভাগীয় পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য ইতিমধ্যেই ১,২০০ কোটি টাকা খরচ করেছে।
বিচার ব্যবস্থার উন্নয়নে রাজ্য সরকারের খরচ (এক নজরে)
| খাতের নাম | ব্যয়ের পরিমাণ / তথ্য |
| মোট খরচ (আদালত ও বিচার ব্যবস্থা) | ১,২০০ কোটি টাকা |
| জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের নতুন ভবন | ৫০০ কোটি টাকা |
| নতুন ভবনের আয়তন | ৪০.৮ একর জমি |
| বিচারকদের আবাসন ব্যবস্থা | ৮০টি ঘর ও প্রধান বিচারপতির বাংলো |
| আদালতের সংখ্যা | নতুন চত্বরে ৬টি আদালত |
সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার এবং বিচারালয়ের দায়িত্ব
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তৃতায় বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষ যখন সব দিক থেকে আশাহত হয়, তখন তারা আদালতের দরজায় কড়া নাড়ে। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে যেভাবে মানুষের অধিকার খর্ব করার চেষ্টা হচ্ছে, সেখানে বিচারকদের উচিত আরও বেশি সংবেদনশীল হওয়া। তিনি সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা করার স্বার্থে বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। মমতা বলেন, বিচারব্যবস্থাই পারে মানুষের মনে ভয়হীন পরিবেশ তৈরি করতে।
উত্তরবঙ্গের জন্য এক ঐতিহাসিক মাইলফলক
জলপাইগুড়িতে তৈরি হওয়া এই সার্কিট বেঞ্চের নতুন ভবনটিকে তিনি উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কলকাতার মূল হাইকোর্ট ভবনের থেকেও এই সার্কিট বেঞ্চের ভবনটি বড় এবং আধুনিক বলে তিনি দাবি করেন। এর ফলে উত্তরবঙ্গের সাধারণ মানুষকে আর আইনি কাজের জন্য বারবার কলকাতায় ছুটতে হবে না, যা স্থানীয় মানুষের জন্য অত্যন্ত স্বস্তির খবর।
সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা কেন জরুরি?
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, নিচের বিষয়গুলো আজ বিপন্ন:
- দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো বা ফেডারেল স্ট্রাকচার।
- সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার।
- নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার।
- কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ মুক্ত প্রশাসনিক স্বাধীনতা।
সবশেষে, মুখ্যমন্ত্রী মমতার এই আবেদন সারা দেশের রাজনৈতিক ও আইনি মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা করতে হলে শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বিচারালয়ের সক্রিয় এবং নিরপেক্ষ ভূমিকা সময়ের দাবি।




