বর্ধমান স্টেশনে যাত্রীদের বিক্ষোভ: রেল পুলিশের ‘স্যারের’ দুর্ব্যবহারে রণক্ষেত্র স্টেশন, স্তব্ধ ট্রেন চলাচল

বর্ধমান স্টেশনে এক রেল পুলিশ কর্মীর বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে শুরু হয় যাত্রীদের বিশাল বিক্ষোভ। অবরোধের জেরে কয়েক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন হাজার হাজার যাত্রী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নামে বিশাল পুলিশ বাহিনী।

বর্ধমান স্টেশনের মতো একটি ব্যস্ততম জায়গায় যখন সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়, তখন পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা শনিবার হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়া গেল। রেল পুলিশের (GRP) এক সিভিক ভলান্টিয়ার বা ‘স্যারের’ বিরুদ্ধে সাধারণ যাত্রীদের ক্রমাগত হেনস্থা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলে এদিন রণক্ষেত্রের রূপ নেয় স্টেশন চত্বর। দীর্ঘক্ষণ ট্রেন চলাচল থমকে যায়, যার ফলে ভোগান্তির এক চরম পর্যায় দেখতে হয় হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে। স্থানীয় মানুষ এবং নিত্যযাত্রীদের এই প্রতিবাদ রাজ্যের রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে।

বর্ধমান স্টেশনে যাত্রীদের বিক্ষোভ Passengers Protest at Bardhaman Station শনিবার সকালে বর্ধমান স্টেশনে এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় যখন এক আরপিএফ বা রেল পুলিশ কর্মী (যাকে স্থানীয়রা ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করেন) এক যাত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত কুরুচিকর আচরণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং নিত্যযাত্রীদের দাবি অনুযায়ী, ওই নির্দিষ্ট পুলিশ কর্মী দীর্ঘদিন ধরেই যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং অযথা হেনস্থা করে আসছিলেন। এদিন সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং শুরু হয় বর্ধমান স্টেশনে যাত্রীদের বিক্ষোভ। উত্তেজিত জনতা রেল লাইন অবরোধ করে এবং পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকে।

বিপজ্জনক মোড়: বর্ধমান স্টেশনে যাত্রীদের বিক্ষোভ ও পুলিশি হেনস্থার অভিযোগ

ঘটনার সূত্রপাত হয় খুব সামান্য কারণে, কিন্তু পুলিশের এক আধিকারিকের উদ্ধত আচরণ পরিস্থিতিকে অগ্নিগর্ভ করে তোলে। অভিযোগ, টিকিট থাকা সত্ত্বেও এক যাত্রীকে কলার ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত অন্য যাত্রীরা রুখে দাঁড়ান। তারা দাবি করেন, বর্ধমান স্টেশনে যাত্রীদের বিক্ষোভ তখনই থামবে যখন ওই অভিযুক্ত পুলিশ কর্মীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক ধরে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চলে তুমুল উত্তেজনা। দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি বাধে বিক্ষোভকারীদের।

রেল পরিষেবা বিপর্যস্ত ও ভোগান্তির চিত্র

অবরোধের জেরে বর্ধমান-হাওড়া এবং বর্ধমান-আসানসোল শাখার ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। মাঝপথে দাঁড়িয়ে পড়ে লোকাল থেকে শুরু করে বহু দূরপাল্লার ট্রেন। স্টেশনের ভেতরে ভিড় উপচে পড়ে এবং ছোট ছোট শিশু ও বৃদ্ধ যাত্রীরা গরমে নাকাল হন। বর্ধমান স্টেশনে যাত্রীদের বিক্ষোভ সামাল দিতে বিশাল পুলিশ বাহিনী নামানো হলেও মানুষের মেজাজ ছিল তুঙ্গে। তারা সাফ জানিয়ে দেন, রেলের মতো গণপরিবহন ব্যবস্থায় পুলিশের এই ‘দাদাগিরি’ তারা আর সহ্য করবেন না।

ঘটনার বিবরণসময় ও প্রভাববর্তমান স্থিতি
বিক্ষোভের কারণপুলিশি হেনস্থা ও দুর্ব্যবহারতদন্তাধীন
ট্রেন পরিষেবা২ ঘণ্টা ব্যাহতধীরে ধীরে স্বাভাবিক
আন্দোলনের নেতৃত্বসাধারণ যাত্রী ও নিত্যযাত্রীসাময়িক স্থগিত

অভিযুক্ত ‘স্যার’ ও সিভিক ভলান্টিয়ারদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

যাত্রীদের প্রধান অভিযোগ ছিল ওই পুলিশ কর্মীর বিরুদ্ধে, যিনি নিজেকে ‘স্যার’ পরিচয় দিয়ে স্টেশনে নিজের আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে হকার এবং গ্রাম থেকে আসা সাধারণ যাত্রীদের তিনি নানাভাবে ভয় দেখাতেন বলে খবর পাওয়া গিয়েছে। বর্ধমান স্টেশনে যাত্রীদের বিক্ষোভ চলাকালীন অনেক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি সাধারণ মানুষকে মানুষ বলেই গণ্য করেন না। এই বিক্ষোভের ফলে রেল কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয় উচ্চপর্যায়ের তদন্তের আশ্বাস দিতে।

কেন হঠাৎ করে এই বিক্ষোভ শুরু হলো?

নিত্যযাত্রীদের মতে, পুলিশের দুর্ব্যবহার প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এদিন এক যাত্রীকে প্রকাশ্য দিবালোকে মারধর করার উপক্রম করলে মানুষের ধৈর্য চ্যুতি ঘটে এবং প্রতিবাদ শুরু হয়।

অবরোধের ফলে কোন কোন রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল?

প্রধানত বর্ধমান থেকে হাওড়া মেইন ও কর্ড লাইন এবং আসানসোল অভিমুখে যাওয়া সমস্ত ট্রেন পরিষেবা প্রায় দুই ঘণ্টার জন্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

রেল কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নিল?

বিক্ষোভকারীদের চাপে পড়ে রেল পুলিশের বড় কর্তারা ঘটনাস্থলে আসেন এবং অভিযুক্ত কর্মীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও তাকে ডিউটি থেকে সরানোর প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা

বর্ধমান স্টেশনে যাত্রীদের বিক্ষোভ কেবল একজন পুলিশ কর্মীর বিরুদ্ধে ছিল না, এটি ছিল দীর্ঘদিনের অবহেলার বিরুদ্ধে এক জোরালো আওয়াজ। মানুষ প্রশ্ন তুলছেন, রক্ষক যদি ভক্ষক হয়ে ওঠে তবে সাধারণ যাত্রী যাবে কোথায়? জিপিআরপি এবং আরপিএফ-এর সমন্বয়ের অভাব এবং সিভিক ভলান্টিয়ারদের অপব্যবহার নিয়েও এদিন স্টেশনে সরব হন অনেকে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, স্টেশনে নিরাপত্তা বাড়ানোর নামে যাত্রীদের পকেট কাটা বা হেনস্থা করা চলবে না।

বিক্ষোভের মূল দাবিগুলি এক নজরে:

  • অভিযুক্ত রেল পুলিশ কর্মীকে অবিলম্বে বরখাস্ত করতে হবে।
  • যাত্রীদের সাথে কথা বলার সময় পুলিশকে নমনীয় হতে হবে।
  • স্টেশনে সিভিক ভলান্টিয়ারদের ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

অবশেষে রেল পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসে বিক্ষোভকারীরা অবরোধ তুলে নেন। তবে বর্ধমান স্টেশনে যাত্রীদের বিক্ষোভ দেখিয়ে দিয়ে গেল যে, সাধারণ মানুষের ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া প্রশাসনের পক্ষে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

Leave a Comment