নিজস্ব প্রতিবেদন, সিঙ্গুর: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে সিঙ্গুর একটি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং গুরুত্বপূর্ণ নাম। আর সেই সিঙ্গুরের মাটি থেকেই আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে এক বিরাট রাজনৈতিক হুঙ্কার দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাজ্যে শিল্পের আকাল এবং যুবসমাজের কর্মসংস্থানের অভাবকে হাতিয়ার করে তিনি সরাসরি তৃণমূল সরকারকে বিঁধেছেন। একসময় যে জমি থেকে টাটারা বিদায় নিয়েছিল, সেই জমি থেকেই প্রধানমন্ত্রী বাংলার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার ডাক দিলেন। তাঁর এই ভাষণে যেমন ছিল উন্নয়নের রূপরেখা, তেমনই ছিল বিরোধীদের জন্য কড়া হুঁশিয়ারি। সিঙ্গুরের মানুষের ক্ষোভকে অনুধাবন করে মোদী স্পষ্ট করে দিলেন যে, ডবল ইঞ্জিন সরকার ছাড়া বাংলার উন্নয়ন সম্ভব নয়।
শিল্পের মরুভূমি বনাম উন্নয়নের স্বপ্ন: সিঙ্গুর থেকে মোদীর বার্তা ঠিক কী?
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর ভাষণে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সিঙ্গুর একসময় সারা দেশের নজর কেড়েছিল শিল্পের সম্ভাবনার কারণে। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থে সেই সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। তিনি আক্ষেপের সুরে জানান, আজ বাংলার শিক্ষিত যুবকদের কাজের খোঁজে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিতে হচ্ছে। সিঙ্গুর থেকে মোদীর বার্তা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই বন্ধ্যাত্ব দূর হবে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প এবং কৃষির মেলবন্ধন ঘটিয়ে সিঙ্গুরকে আবার তার পুরনো পরিচয়ে ফিরিয়ে আনা হবে। মোদীর এই কথাগুলো সিঙ্গুরের সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আশার আলো জাগিয়েছে।
কৃষক দরদী ভাবমূর্তি বনাম রাজনৈতিক স্বার্থ: সরাসরি তোপ তৃণমূলকে
সিঙ্গুরের আন্দোলন ছিল কৃষকদের জমি রক্ষার আন্দোলন, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন যে, সেই আন্দোলনের ফসল সাধারণ মানুষ ঘরে তুলতে পারেনি। সিঙ্গুর থেকে মোদীর বার্তা দেওয়ার সময় তিনি তৃণমূলের নাম না করে আক্রমণ শানিয়ে বলেন, যারা কৃষকদের নাম করে ক্ষমতায় এসেছিল, তারাই আজ কৃষকদের পিএম কিষাণ যোজনার সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা সরাসরি কৃষকদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে রাজ্য সরকার। মোদীজি জোর দিয়ে বলেন যে, বাংলার কৃষকরা আজ পরিবর্তন চাইছে এবং সেই পরিবর্তনের শুরু হবে সিঙ্গুরের এই উর্বর জমি থেকেই।
যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্বেগ
মোদীর বক্তৃতার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বাংলার যুবশক্তির কথা। তিনি বলেন, বাংলা মেধার খনি হওয়া সত্ত্বেও কেন এখানকার ছেলেমেয়েরা বাইরে যাবে? সিঙ্গুর থেকে মোদীর বার্তা অনুযায়ী, রাজ্যে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি না হওয়ার জন্য তোষণ ও সিন্ডিকেট রাজ দায়ী। তিনি আশ্বাস দেন যে, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়নে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে রেল ও সড়কপথের যে উন্নয়ন গত কয়েক বছরে কেন্দ্র করেছে, তার সুফল সিঙ্গুর তথা গোটা হুগলি জেলা পাবে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, শিল্প না এলে বাংলার এই অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটবে না।
রাজনৈতিক সমীকরণ: কেন সিঙ্গুরকেই বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী?
বিশ্লেষকদের মতে, সিঙ্গুর থেকে মোদীর বার্তা দেওয়ার পেছনে এক গভীর রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে। সিঙ্গুর মানেই বামফ্রন্টের পতন এবং তৃণমূলের উত্থানের প্রতীক। সেই একই জায়গা থেকে বিজেপি যদি নিজেদের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে পারে, তবে তা রাজ্যের মানুষের কাছে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক বার্তা পৌঁছে দেবে। মোদী জানেন, সিঙ্গুরের মানুষ এখন শুধু রাজনীতি নয়, পেটের ভাত এবং কাজের নিশ্চয়তা চায়। আর সেই নাড়ি টিপেই তিনি উন্নয়নের কার্ডটি খেলেছেন। ২০২৬-এর নির্বাচনী রণকৌশলে সিঙ্গুর যে একটি এপিসেন্টার হতে চলেছে, প্রধানমন্ত্রীর এই সভা তা প্রমাণ করে দিল।
সিঙ্গুরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছু জরুরি প্রশ্ন ও উত্তর (FAQs)
১. সিঙ্গুর থেকে মোদীর বার্তা রাজ্যের সাধারণ মানুষের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সিঙ্গুর একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কেন্দ্রস্থল। এখান থেকে মোদী যখন শিল্পের কথা বলেন, তখন তা মানুষের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। বেকারত্ব মেটাতে তাঁর দেওয়া আশ্বাস ভোটারদের সিদ্ধান্ত বদলাতে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
২. প্রধানমন্ত্রী কি সরাসরি টাটাদের ফেরার কথা বলেছেন?
তিনি সরাসরি কোনো কোম্পানির নাম না নিলেও, রাজ্যে বড় মাপের শিল্প স্থাপনের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরি হলে যেকোনো বড় কোম্পানিই আবার বাংলায় ফিরতে আগ্রহী হবে।
৩. সিঙ্গুর জনসভায় কৃষকদের জন্য মোদী কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন?
তিনি কৃষকদের ফসলের সঠিক দাম দেওয়া, হিমঘর তৈরি করা এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলোর সুবিধা সরাসরি তাঁদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিশেষ করে কিষাণ ক্রেডিট কার্ড ও সম্মান নিধি প্রকল্পের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন।
পরিবর্তনের ডাক এবং মোদীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বক্তৃতার শেষে প্রধানমন্ত্রী ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্নকে নতুন করে উসকে দেন। তিনি বলেন, বাংলা পিছিয়ে থাকলে ভারত এগোতে পারবে না। সিঙ্গুর থেকে মোদীর বার্তা এটাই যে, বাংলার মানুষের উচিত ভয় ও দুর্নীতির শৃঙ্খল ভেঙে উন্নয়নের পক্ষে দাঁড়ানো। তিনি রাজ্যের মা-বোনেদের উদ্দেশ্যেও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বনাম কেন্দ্রীয় প্রকল্পের স্থায়ী উপকারের তুলনা টানেন। মোদীজির এই বার্তা সিঙ্গুর ছাড়িয়ে সারা রাজ্যের রাজনৈতিক অলিন্দে এখন আলোচনার প্রধান বিষয়।





