আলু চাষিদের পাশে মুখ্যমন্ত্রী: বিমার টাকা ও সরাসরি আলু কেনার বড় ঘোষণা মমতার

২০২৬ নির্বাচনের আগে আলু চাষিদের জন্য বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বিমার টাকা থেকে শুরু করে সরাসরি আলু কেনা— কৃষকদের স্বস্তি দিতে নবান্নের একগুচ্ছ পরিকল্পনা। বিস্তারিত পড়ুন আজকের প্রতিবেদনে।

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ডামাডোলের মাঝেই রাজ্যের আলু চাষিদের জন্য বড়সড় স্বস্তির বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের কৃষিপ্রধান জেলাগুলিতে যখন আলুর ফলন এবং সঠিক দাম পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, ঠিক তখনই সরাসরি হস্তক্ষেপ করলেন প্রশাসনিক প্রধান। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং অসময়ের বৃষ্টির কারণে যারা লোকসানের সম্মুখীন হয়েছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন তিনি। বিশেষ করে হুগলি, বর্ধমান এবং জলপাইগুড়ির চাষিদের জন্য এই আশ্বাস নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

​আলু চাষিদের পাশে মুখ্যমন্ত্রী এবং সরকারের বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ

​বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হলো আলু চাষ। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় আলুর ফলন ব্যাহত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আলু চাষিদের পাশে মুখ্যমন্ত্রী দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছেন যে, যাদের ফসল নষ্ট হয়েছে তাঁদের ‘বাংলা শস্য বিমা’ (Bangla Shasya Bima) প্রকল্পের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, তাঁর সরকার কৃষকদের ওপর কোনো প্রিমিয়ামের বোঝা চাপায় না; বিমার সমস্ত টাকা রাজ্য সরকারই বহন করে। ইতিপূর্বে প্রায় ১ লক্ষেরও বেশি আলু চাষির অ্যাকাউন্টে ১৫৮ কোটি টাকার বেশি আর্থিক সহায়তা পাঠানো হয়েছে।

​মুখ্যমন্ত্রী আরও স্পষ্ট করেছেন যে, বাজারে আলুর যোগান বৃদ্ধি পেলেও চাষিরা যেন সঠিক দাম পান, তার জন্য সরকার সরাসরি আলু কেনার পরিকল্পনা করছে। মিড-ডে মিল এবং আইসিডিএস (ICDS) প্রকল্পের জন্য প্রায় ১০ লক্ষ টন আলু সরকারিভাবে কেনা হবে। এর ফলে ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং প্রান্তিক চাষিরা সরাসরি লাভবান হবেন। এই খাতে সরকার অতিরিক্ত ৬৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করার কথা ভাবছে।

​বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ এবং কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের রূপরেখা

​নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কৃষকদের স্বার্থে একগুচ্ছ নতুন প্রকল্পের রূপরেখা পেশ করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্পের মাধ্যমে বার্ষিক ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা পাচ্ছেন রাজ্যের ১ কোটির বেশি কৃষক। আলু চাষিদের পাশে মুখ্যমন্ত্রী থাকার আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এই অনুদানের পরিমাণ আরও বাড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে। এছাড়াও কৃষকদের জন্য বিশেষ কোল্ড স্টোরেজ বা হিমঘর তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে যাতে আলু দীর্ঘক্ষণ পচে না গিয়ে সংরক্ষিত থাকে।

​মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন যে, কেন্দ্র সরকার কৃষকদের নিয়ে রাজনীতি করলেও তাঁর সরকার সর্বদা মানুষের পাশে থাকে। বিশেষ করে সিঙ্গুরে একটি কৃষি-শিল্প পার্ক (Agro-Industrial Park) তৈরির কথা ঘোষণা করা হয়েছে, যা চাষিদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বাজারে বিক্রি করতে সাহায্য করবে। নির্বাচনের ইস্তেহারেও কৃষি খাতের জন্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটের ইঙ্গিত দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী, যা বিরোধীদের চাপে ফেলার জন্য যথেষ্ট।

​হিমঘরের সমস্যা ও আলু সংরক্ষণে সরকারি হস্তক্ষেপ

​আলু চাষিদের একটি বড় সমস্যা হলো পর্যাপ্ত হিমঘরের অভাব এবং সেখানে আলুর বন্ড পাওয়া নিয়ে বিশৃঙ্খলা। এই সমস্যা মেটাতে মুখ্যমন্ত্রী জেলাশাসকদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন যাতে কোনো কালোবাজারি না হয়। আলু চাষিদের পাশে মুখ্যমন্ত্রী কেবল প্রতিশ্রুতিতে নয়, বরং প্রশাসনিক কড়াকড়িতেও নজর দিচ্ছেন। জানানো হয়েছে, কোল্ড স্টোরেজে আলুর ভাড়া নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত আলু সংরক্ষণের সময়সীমা বাড়িয়ে চাষিদের স্বস্তি দেওয়া হয়েছে।

​মুখ্যমন্ত্রী পরামর্শ দিয়েছেন যে, অতিরিক্ত ফলনের সময় রাজ্যবাসী যেন বেশি করে আলু খান, যাতে চাহিদার ভারসাম্য বজায় থাকে। এই মজার ছলে দেওয়া পরামর্শের আড়ালে ছিল চাষিদের লোকসান থেকে বাঁচানোর এক গভীর আর্তি। এছাড়াও অসময়ে বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের বিমার টাকা দ্রুত মেটানোর জন্য জেলা স্তরে টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে। নবান্ন সূত্রে খবর, এপ্রিল মাসের মধ্যেই সিংহভাগ বিমার টাকা উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে।

​আলু চাষিদের স্বার্থ ও সরকারি সাহায্য নিয়ে কিছু প্রশ্ন উত্তর

​প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত আলু চাষিরা কীভাবে সাহায্য পাবেন?

​যাদের ফসল নষ্ট হয়েছে, তাঁরা রাজ্য সরকারের ‘বাংলা শস্য বিমা’ প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক সাহায্য পাবেন। এর জন্য কোনো প্রিমিয়াম দিতে হয় না।

​মুখ্যমন্ত্রী আলু চাষিদের জন্য কী বিশেষ ঘোষণা করেছেন?

​মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে সরকার সরাসরি ১০ লক্ষ টন আলু কিনবে যা মিড-ডে মিল এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে ব্যবহৃত হবে, যাতে বাজারে আলুর দাম পড়ে না যায়।

​’কৃষক বন্ধু’ প্রকল্পের সুবিধা কারা পাবেন?

​রাজ্যের সকল কৃষক এবং বর্গাদাররা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। বার্ষিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন ৪ হাজার টাকা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

​হিমঘর নিয়ে সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?

​সরকার হিমঘরের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সিন্ডিকেট বা বন্ড নিয়ে কারচুপি রুখতে প্রশাসনের তরফ থেকে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে।

​কৃষি নির্ভর রাজনীতির নতুন মোড় এবং তৃণমূলের কৌশল

​আসন্ন নির্বাচনে গ্রাম বাংলার ভোট ব্যাংকে জমি শক্ত করতে কৃষিই তৃণমূলের প্রধান হাতিয়ার। আলু চাষিদের পাশে মুখ্যমন্ত্রী থাকার এই বার্তাটি সরাসরি ভোটদাতাদের হৃদয়ে পৌঁছাতে চাইছে শাসকদল। বিরোধীরা যখন আলুর দাম নিয়ে সরব হচ্ছে, তখন মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি অর্থ সাহায্য এবং ফসল কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেই আক্রমণের ধার কমিয়ে দিলেন। তাঁর মতে, কৃষক হাসলে তবেই বাংলা হাসবে, আর তাই যেকোনো দুর্যোগে সরকার তাঁদের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে।

​সবশেষে বলা যায়, মুখ্যমন্ত্রীর এই সক্রিয়তা কেবল একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি রাজ্যের লক্ষ লক্ষ কৃষকের জীবন-জীবিকার সাথে যুক্ত। আলু চাষিরা যাতে ঋণের জালে জড়িয়ে না পড়েন, তার জন্য সস্তায় কৃষি ঋণ এবং সঠিক সময়ে বিমার টাকা প্রদানই হবে আগামী দিনে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। মে মাসেই বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হবে, আর সেখানেই বোঝা যাবে চাষিরা মুখ্যমন্ত্রীর এই আশ্বাসে কতটা ভরসা রাখলেন।

Leave a Comment

Created with ❤