পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি অনন্য এবং মানবিক উদ্যোগ হলো খাদ্য সাথী প্রকল্প। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো রাজ্যের প্রতিটি মানুষের কাছে স্বল্প মূল্যে বা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খাদ্যশস্য পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে আর্থিক ও সামাজিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া মানুষদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই জনকল্যাণমূলক প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আপনি কি জানেন এই প্রকল্পের মাধ্যমে ঠিক কতজন মানুষ উপকৃত হচ্ছেন এবং ডিজিটাল রেশন কার্ডের গুরুত্ব কী? আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা খাদ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা, চাল-গমের বরাদ্দ এবং আবেদনের নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানাব।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় ২০১৬ সালে পথচলা শুরু করা খাদ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা আজ পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১০ কোটিরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। এটি শুধু একটি রেশন ব্যবস্থা নয়, বরং অনাহারমুক্ত রাজ্য গড়ার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। আগে রেশন ব্যবস্থার মান নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকলেও, বর্তমানে এই প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে। নিচে এই প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
খাদ্য সাথী প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ও সামাজিক প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের অধীনে পরিচালিত এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হলো কোনো মানুষ যেন অভুক্ত না থাকে। বিশেষ করে জঙ্গলমহল এলাকা, চা বলয়ের শ্রমিক এবং আইলা বা আমফানের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে খাদ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে অত্যন্ত নিম্ন আয়ের মানুষদের মাত্র ২ টাকা কেজি দরে চাল ও গম সরবরাহ করা হয়, যা বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে।
এই উদ্যোগের ফলে রাজ্যের দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষরা তাদের আয়ের একটি বড় অংশ অন্য কাজে ব্যবহার করতে পারছেন, কারণ খাবারের মৌলিক চাহিদা মেটাচ্ছে সরকার। ডিজিটাল রেশন কার্ডের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হওয়ায় দুর্নীতির সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এখন গ্রাহকরা তাদের প্রাপ্য খাদ্যশস্য সরাসরি ন্যায্য মূল্যের দোকান থেকে সংগ্রহ করতে পারেন।
ডিজিটাল রেশন কার্ডের শ্রেণিবিভাগ ও বরাদ্দের পরিমাণ
খাদ্য সাথী প্রকল্পের অধীনে সকল উপভোক্তাকে সমানভাবে দেখা হলেও, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা অনুযায়ী রেশন কার্ডকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মূলত এই কার্ডের ক্যাটাগরির ওপর নির্ভর করে যে আপনি ঠিক কতটা পরিমাণ খাদ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। কার্ডগুলো মূলত AAY, PHH, SPHH, RKSY-I এবং RKSY-II এই ভাগে বিভক্ত।
নিচে বিভিন্ন ধরনের কার্ড ও তাদের খাদ্যশস্য পাওয়ার পরিমাণ একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| কার্ডের ধরন | চালের পরিমাণ (জনপ্রতি/পরিবার পিছু) | গমের পরিমাণ (জনপ্রতি/পরিবার পিছু) | বিশেষ সুবিধা |
| AAY (অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা) | ২১ কেজি (পরিবার পিছু) | ১৩.৩ কেজি (পরিবার পিছু) | অত্যন্ত দরিদ্রদের জন্য |
| PHH (অগ্রাধিকার প্রাপ্ত) | ২ কেজি (জনপ্রতি) | ৩ কেজি (জনপ্রতি) | স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে |
| SPHH (বিশেষ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত) | ২ কেজি (জনপ্রতি) | ৩ কেজি (জনপ্রতি) | নির্দিষ্ট পুষ্টি নিশ্চিত করা |
| RKSY-I (রাজ্য খাদ্য সুরক্ষা-১) | ২ কেজি (জনপ্রতি) | ৩ কেজি (জনপ্রতি) | সম্পূর্ণ সরকারি ভর্তুকি |
| RKSY-II (রাজ্য খাদ্য সুরক্ষা-২) | ১ কেজি (জনপ্রতি) | ১ কেজি (জনপ্রতি) | আংশিক ভর্তুকি যুক্ত |
দুয়ারে রেশন: বাড়ি বসেই খাদ্যশস্য পাওয়ার সুযোগ
রাজ্য সরকারের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলো ‘দুয়ারে রেশন’ কর্মসূচি। এর মাধ্যমে এখন আর দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না, বরং রেশন ডিলাররা সরাসরি আপনার পাড়ায় বা বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে যান। এই ব্যবস্থার ফলে বৃদ্ধ এবং শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা সহজেই খাদ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন। এটি খাদ্য বিতরণের ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে ই-কেওয়াইসি (e-KYC) এবং আধার লিঙ্কিং করার ফলে রেশন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বেড়েছে। আপনি যদি সঠিক উপভোক্তা হন, তবে আপনার আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে সহজেই রেশন সংগ্রহ করতে পারবেন। এর ফলে ভুয়া কার্ডের সমস্যা মিটেছে এবং প্রকৃত অভাবী মানুষরা তাদের হক বুঝে পাচ্ছেন।
বিশেষ শ্রেণীর মানুষদের জন্য বিশেষ নজরদারি
খাদ্য সাথী প্রকল্পে কিছু বিশেষ পেশার মানুষের জন্য আলাদাভাবে নজর দেওয়া হয়েছে। যারা অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল, তাদের জন্য সরকার অতিরিক্ত বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছে।
এই প্রকল্পের বিশেষ কিছু সুবিধার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- টোটো বা রিকশাচালকদের জন্য সহজলভ্য রেশন।
- চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য বিশেষ খাদ্য প্যাকেট।
- দুর্যোগ কবলিত এলাকার জন্য অতিরিক্ত খাদ্য সহায়তা।
- আইসিডিএস (ICDS) এবং মিড-ডে মিলের মাধ্যমে শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা।
আবেদন করার প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় তথ্যাদি
আপনি যদি পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হন এবং আপনার কাছে কোনো ডিজিটাল রেশন কার্ড না থাকে, তবে আপনি খুব সহজেই এর জন্য আবেদন করতে পারেন। বর্তমানে সরকারি অফিস ছাড়াও ‘দুয়ারে সরকার’ ক্যাম্পের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ করা হয়। এছাড়া অনলাইনে খাদ্য দপ্তরের পোর্টালে গিয়েও নতুন কার্ড বা নাম সংশোধনের কাজ করা সম্ভব।
আবেদনের জন্য সাধারণত নিম্নলিখিত ধাপগুলো অনুসরণ করতে হয়:
১. নির্দিষ্ট ফর্ম (যেমন ফর্ম ৩ বা ৪) সংগ্রহ করা।
২. পরিবারের প্রধানের আধার কার্ড ও ভোটার কার্ডের ফটোকপি জমা দেওয়া।
৩. ঠিকানার প্রমাণপত্র হিসেবে ইলেকট্রিক বিল বা কাস্ট সার্টিফিকেট (যদি থাকে)।
৪. সক্রিয় মোবাইল নম্বর প্রদান করা।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQs)
খাদ্য সাথী কার্ডের স্ট্যাটাস কীভাবে চেক করব?
খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনার কার্ড নম্বর এবং ক্যাটাগরি দিলেই বর্তমান স্ট্যাটাস জানতে পারবেন। আপনার কার্ডটি সক্রিয় আছে কি না বা আধার লিঙ্ক হয়েছে কি না, তাও এখান থেকে জানা সম্ভব।
পরিবারের নতুন সদস্যের নাম কীভাবে যোগ করব?
পরিবারে নতুন সদস্য বা শিশুর নাম যোগ করার জন্য ৩ নম্বর বা ৪ নম্বর ফর্ম ফিলাপ করে জমা দিতে হবে। শিশুর ক্ষেত্রে জন্মের শংসাপত্র (Birth Certificate) এবং বাবা-মায়ের রেশন কার্ডের কপি প্রয়োজন হয়। এর মাধ্যমে আপনি সহজেই নতুন সদস্যের জন্য খাদ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেন।
রেশন কার্ডের সঙ্গে আধার লিঙ্ক করা কি বাধ্যতামূলক?
হ্যাঁ, বর্তমানে স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য এবং সঠিক মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য আধার লিঙ্ক করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটি আপনি নিকটবর্তী রেশন দোকানে বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে বা বাংলা সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে করতে পারেন।
প্রকল্পের ভবিষ্যৎ ও আধুনিকায়ন
খাদ্য সাথী প্রকল্পটিকে আরও উন্নত করতে সরকার প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এখন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেও আপনি জানতে পারবেন যে আপনার ডিলার আপনাকে সঠিক পরিমাণ চাল বা গম দিচ্ছে কি না। রেশন ব্যবস্থায় যাতে ওজনে কোনো কারচুপি না হয়, তার জন্য ইলেকট্রনিক ওয়েইং মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই প্রকল্পের মূল শক্তি হলো এর বিশাল নেটওয়ার্ক। রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে রেশন দোকানগুলো সক্রিয় রয়েছে, যা নিশ্চিত করছে যে কোনো দরিদ্র পরিবার যেন অর্থের অভাবে অনাহারে না দিন কাটায়। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় খাদ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা এখন মানুষের হাতের মুঠোয়।





