জাগো প্রকল্প ২০২৬: লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পর এবার মহিলাদের ৫,০০০ টাকা অনুদান দিচ্ছে রাজ্য, জানুন শর্তাবলি

রাজ্যের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করার জন্য এককালীন ৫,০০০ টাকা অনুদান দিচ্ছে রাজ্য সরকার। জাগো প্রকল্পের যোগ্যতা এবং নিয়মকানুনগুলি বিস্তারিত জেনে নিন।

জাগো প্রকল্প ২০২৬ (Jago Scheme 2026): রাজ্যের মহিলাদের আর্থিকভাবে সাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্যে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে একের পর এক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করা হচ্ছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ব্যাপক সাফল্যের পর এবার স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (Self Help Group) মহিলাদের জন্য নিয়ে আসা হয়েছে এক বিশেষ আর্থিক সহায়তা স্কিম, যার মাধ্যমে এককালীন ৫,০০০ টাকা অনুদান দেওয়া হচ্ছে। এই সরকারি উদ্যোগের ফলে গ্রাম ও শহরের অসংখ্য মহিলা তাদের ছোট ব্যবসা এবং ক্ষুদ্র উৎপাদনে অভাবনীয় সাহায্য পাচ্ছেন। চলুন, এই স্কিমটি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।

​মহিলাদের আর্থিক ক্ষমতায়নে রাজ্য সরকারের নতুন দিশা এবং জাগো প্রকল্প ২০২৬-এর সূচনা

​পশ্চিমবঙ্গ সরকার সবসময়েই রাজ্যের মহিলাদের উন্নয়ন এবং তাদের অর্থনৈতিক সুরক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে এসেছে। সেই লক্ষ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে যে সমস্ত স্কিমগুলি চালু করা হয়েছে, তার মধ্যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার আজ ঘরে ঘরে এক অত্যন্ত পরিচিত এবং জনপ্রিয় নাম। তবে শুধু মাসিক ভাতাতেই থেমে থাকতে চায় না সরকার, তারা চায় মহিলারা নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে রোজগার করুক। আর সেই কারণেই রাজ্যের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত মহিলাদের জন্য এই বিশেষ আর্থিক সহায়তা কর্মসূচিটি নিয়ে আসা হয়েছে।

​এই অনুদান কর্মসূচিটি গ্রামীণ এবং শহরতলীর মহিলাদের জন্য একটি বিরাট সুযোগ নিয়ে এসেছে। অনেক মহিলাই টাকার অভাবে নিজেদের ছোট ব্যবসা বা হস্তশিল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন না। মূলত তাদের এই প্রাথমিক মূলধনের অভাব মেটাতেই সরকার এককালীন ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত আর্থিক অনুদান দিচ্ছে। এই অর্থ সরাসরি তাদের উৎপাদন বাড়াতে এবং স্বনিযুক্তির ক্ষেত্রে একটি শক্ত ভিত তৈরি করতে সাহায্য করছে। যারা এখনও এই স্কিমের সুবিধা পাননি, তাদের জন্য এই বছরটি একটি বড় সুযোগ হতে পারে।

​রাজ্যের স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির জন্য ঠিক কী এই আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি এবং এর প্রধান উদ্দেশ্য কী?

​এই বিশেষ উদ্যোগটি মূলত পশ্চিমবঙ্গের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (Self Help Group) সদস্য মহিলাদের জন্য তৈরি করা একটি সরকারি আর্থিক অনুদান কর্মসূচি। এটি রাজ্যের স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও স্বনিযুক্তি দপ্তরের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। সরকারের একটি সুস্পষ্ট ভিশন বা লক্ষ্য রয়েছে যে, শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি গোষ্ঠীকে শক্তিশালী করলে তার প্রভাব পুরো পরিবার এবং সমাজের ওপর পড়ে।

​এই স্কিমের প্রধান এবং প্রাথমিক উদ্দেশ্যগুলি হলো:

  • ​রাজ্যের গ্রাম ও শহরের মহিলাদের আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী করে তোলা।
  • ​স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে আরও বেশি করে শক্তিশালী করা এবং তাদের ছোট ব্যবসার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা।
  • ​গ্রামীণ অর্থনীতিকে মজবুত করা এবং মহিলাদের নিজস্ব আয়ের পথ প্রশস্ত করা।

​স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের এই স্কিমের অধীনে ঠিক কত টাকা করে সরকারি অনুদান দেওয়া হয়?

​এই অনুদান কর্মসূচির আওতায় সরকার প্রতিটি যোগ্য এবং শর্ত পূরণ করা স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে এককালীন ৫,০০০ টাকা করে আর্থিক সাহায্য প্রদান করে থাকে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই টাকাটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, এটি কোনো ঋণ নয় যে পরবর্তীকালে সরকারকে সুদ সমেত ফেরত দিতে হবে। মূলত গোষ্ঠীগুলিকে তাদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ এবং ছোট ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই এই টাকাটি রাজ্য সরকারের তরফ থেকে অনুদান হিসেবে দেওয়া হচ্ছে।

​টাকা প্রদানের ক্ষেত্রে সরকার অত্যন্ত স্বচ্ছ একটি পদ্ধতি অবলম্বন করে। এই অনুদানের অর্থ কোনো সদস্যের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয় না, বরং এটি সরাসরি গোষ্ঠীর নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার বা DBT পদ্ধতির মাধ্যমে এই টাকা প্রদান করা হয় বলে কোনো রকম দুর্নীতির সুযোগ থাকে না। সরকারি সূত্র থেকে জানা গেছে, এই নির্দিষ্ট উদ্যোগের জন্য ইতিমধ্যেই কয়েক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এবং রাজ্যের লক্ষাধিক গোষ্ঠী এই সুবিধার আওতায় এসেছে।

অনুদানের বিবরণনিয়ম ও শর্তাবলি
আর্থিক সাহায্যের পরিমাণএককালীন ৫,০০০ টাকা (বিনামূল্যে)
টাকা প্রদানের মাধ্যমসরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (DBT)
অ্যাকাউন্টের ধরনশুধুমাত্র গোষ্ঠীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (ব্যক্তিগত নয়)
সুবিধাভোগীর সংখ্যালক্ষাধিক স্বনির্ভর গোষ্ঠী

কারা এই এককালীন আর্থিক অনুদান পাওয়ার সম্পূর্ণ যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন?

​যেকোনো সরকারি স্কিমের মতোই এখানেও কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড বা শর্ত রাখা হয়েছে। এই শর্তগুলি পূরণ করতে পারলেই একটি গোষ্ঠী এই অনুদান পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। এই স্কিমটি গ্রাম এবং শহর—উভয় অঞ্চলের মহিলাদের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য।

​যোগ্যতা অর্জনের প্রধান শর্তগুলি নিচে পর্যায়ক্রমে দেওয়া হলো:

১. আবেদনকারীকে অবশ্যই রাজ্যের কোনো একটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য হতে হবে।

বিজ্ঞাপন

২. যে গোষ্ঠীটি আবেদন করছে, তার বয়স অন্ততপক্ষে ১ বছর হতে হবে এবং ওই সময়কালে সেটি সক্রিয় থাকতে হবে।

৩. ওই গোষ্ঠীর নামে ব্যাংকে একটি সচল বা সক্রিয় অ্যাকাউন্ট থাকাটা একেবারেই বাধ্যতামূলক।

৪. ওই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সবসময়ে ন্যূনতম ৫,০০০ টাকা ব্যালেন্স থাকতে হবে এবং গোষ্ঠীর টার্ম লোন বা ক্যাশ ক্রেডিট লিমিট থাকা প্রয়োজন।

৫. সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, গোষ্ঠীর সমস্ত সদস্যকেই আবশ্যিকভাবে মহিলা হতে হবে।

​এই অনুদানের টাকা ঠিক কখন বা বছরের কোন সময় গোষ্ঠীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া হয়?

​স্বভাবতই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, এই অনুদানের টাকা ঠিক কবে পাওয়া যায়। নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণত বছরে একবার এই অনুদান প্রদান করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, আর্থিক বছরের শেষের দিকে অর্থাৎ মার্চ থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে এই টাকা যোগ্য গোষ্ঠীগুলির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি জমা হয়ে যায়।

​আপনার গোষ্ঠী যদি সমস্ত যোগ্যতা পূরণ করে থাকে এবং তবুও যদি এই টাকা না পেয়ে থাকেন, তবে এখনও আপনাদের কাছে আবেদন জানানোর এবং এই টাকা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ, যা সঠিক সময়ে মূলধনের জোগান দিয়ে ছোট ব্যবসাকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

​কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQs)

​এই স্কিমের টাকা পাওয়ার জন্য কি কোনো আলাদা ফর্ম পূরণ করে ব্যক্তিগতভাবে আবেদন করতে হয়?

​বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই স্কিমের টাকা পাওয়ার জন্য কোনো সদস্যকে আলাদা করে ব্যক্তিগত ফর্ম পূরণ করে আবেদন করতে হয় না। ব্লক বা জেলা প্রশাসন সরাসরি যোগ্য গোষ্ঠীগুলির একটি তালিকা যাচাই করে এবং তারপর স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অনুমোদন দিয়ে দেয়।

​একটি স্বনির্ভর গোষ্ঠী সর্বাধিক কত টাকা পর্যন্ত এই স্কিমের মাধ্যমে পেতে পারে?

​যোগ্যতা পূরণকারী প্রতিটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে এককালীন ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত আর্থিক অনুদান সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়।

​এই প্রকল্পের টাকা কি গোষ্ঠীর কোনো সদস্য তার নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিতে পারবেন?

​না, একেবারেই না। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এই ৫,০০০ টাকা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয় না। এই টাকাটি সরাসরি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নামে থাকা যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (DBT-এর মাধ্যমে) ট্রান্সফার করা হয়।

​এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য একটি গোষ্ঠীকে অন্তত কতদিন পুরোনো হতে হবে?

​এই সরকারি অনুদান পাওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, সংশ্লিষ্ট স্বনির্ভর গোষ্ঠীটিকে অন্ততপক্ষে ১ বছর পুরোনো হতে হবে এবং এই এক বছর ধরে তাদের নিয়মিত কাজকর্ম এবং বৈঠক চালু থাকতে হবে।

​উপসংহার: মহিলাদের স্বনির্ভরতার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার বড় সুযোগ

​সবশেষে বলা যায় যে, মহিলাদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগটি সত্যিই প্রশংসনীয়। জাগো প্রকল্প ২০২৬ হয়তো ৫,০০০ টাকার মতো একটি ছোট অঙ্কের অনুদান দিচ্ছে, কিন্তু যাদের কাছে কোনো মূলধনই নেই, তাদের কাছে এই অর্থ একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করার জন্য সঞ্জীবনীর মতো কাজ করতে পারে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পাশাপাশি এই ধরনের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীল স্কিম মহিলাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে অনেক বেশি সাহায্য করবে।

​আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ যদি কোনো স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য হয়ে থাকেন, তবে আজই আপনাদের গোষ্ঠীর যোগ্যতা যাচাই করুন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্লক অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করুন এবং খোঁজ নিন। সঠিক নিয়ম এবং শর্ত মেনে চললে, এই অনুদানের টাকা আপনাদের ছোট ব্যবসাকে সম্প্রসারণের পথে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

Leave a Comment

Created with ❤