SIR Hearing West Bengal (SIR শুনানি পশ্চিমবঙ্গ): রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ শুনানি পর্ব ঘিরে উত্তেজনার পারদ চড়ছে। দিকে দিকে ছোটখাটো অশান্তির খবর আসতেই এবার নড়েচড়ে বসল কমিশন। সাফ জানিয়ে দেওয়া হলো, অশান্তি হলেই বন্ধ করে দেওয়া হবে শুনানি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সম্পূর্ণ দায় বর্তানো হয়েছে রাজ্য পুলিশের উপর। ভোটারদের হয়রানি রুখতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রাপ্তি স্বীকারের রসিদ বা স্লিপ দেওয়া নিয়েও কড়া অবস্থান নিয়েছে কমিশন। সন্দেশখালি সহ একাধিক জায়গায় বিক্ষিপ্ত ঘটনার মাঝেই উঠে এল বিএলও-দের গাফিলতির চাঞ্চল্যকর তথ্য।
অশান্তির আঁচ পেলেই থমকে যাবে SIR শুনানি, কড়া বার্তা কমিশনের
রাজ্যে চলা ভোটার তালিকা সংশোধন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (SIR) কাজ ঘিরে গত কয়েকদিন ধরেই উত্তপ্ত পরিস্থিতি। এই আবহে নির্বাচন কমিশন (EC) এবার অত্যন্ত কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। কমিশনের অন্দরমহল সূত্রে খবর, যেখানেই অশান্তির খবর পাওয়া যাবে বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, সেখানেই তাৎক্ষণিকভাবে SIR শুনানি বন্ধ করে দেওয়া হবে। সুষ্ঠ পরিবেশ বজায় না থাকলে যে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে কমিশন।
সিইও (CEO) দপ্তরের খবর অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি পুরোপুরি রাজ্য সরকারের এক্তিয়ারভুক্ত। তাই শুনানির সময় বুথ বা বিডিও অফিস চত্বরে শান্তি বজায় রাখার দায়িত্ব পুলিশকেই নিতে হবে। যদি কোথাও গোলমাল পাকিয়ে শুনানি পণ্ড হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে তার কৈফিয়ত তলব করা হবে খোদ রাজ্যের পুলিশ প্রধান অর্থাৎ ডিজির (DG) কাছ থেকে। কমিশনের এই কড়া অবস্থানে রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে প্রশাসনিক মহলে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের দোহাই দিয়ে রাজ্যের কোর্টেই বল ঠেলল কমিশন
নির্বাচন কমিশন যে এবার আর আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না, তা তাদের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে পরিষ্কার। সুপ্রিম কোর্টের গতকালের একটি নির্দেশের কথা উল্লেখ করে সিইও দপ্তরের এক শীর্ষ কর্তা স্পষ্ট জানিয়েছেন, “অর্ডার কপির সাত নম্বর পয়েন্টটা ভালো করে পড়ে নিন।” আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, শুধুমাত্র শুনানি পর্ব নয়, গোটা SIR শুনানি প্রক্রিয়াটি মসৃণভাবে সম্পন্ন করার দায়িত্ব রাজ্য পুলিশের ডিজির।
রাজ্যের ডিজি রাজীব কুমারকে (DG Rajeev Kumar) উদ্দেশ্য করে পরোক্ষভাবে কমিশন বুঝিয়ে দিয়েছে, বল এখন রাজ্যের কোর্টে। অর্থাৎ, যদি কোথাও আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়, তবে দায় এড়াতে পারবে না রাজ্য পুলিশ। কমিশন মনে করছে, বর্তমানে যে ছিটেফোঁটা ঝামেলার খবর আসছে, তা জেলা স্তরেই সামাল দেওয়া সম্ভব। পরিস্থিতি হাতের বাইরে গেলে জেলা নির্বাচনী আধিকারিকরা (DEO) নিশ্চয়ই সিইও দপ্তরে রিপোর্ট করতেন। তবে কমিশন রাজ্যকে সতর্ক করে দিয়েছে যে, নিরাপত্তার সামান্যতম গাফিলতিও বরদাস্ত করা হবে না।
সন্দেশখালি থেকে ফরাক্কা— দিকে দিকে অশান্তির খবর, কী ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ?
কমিশন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করলেও বাস্তব চিত্রটা বেশ কিছু জায়গায় অন্যরকম। SIR শুনানি চলাকালীন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে উত্তেজনার খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালিতে বিডিও অফিসে (BDO Office) ভাঙচুরের ঘটনা বড়সড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে প্রশাসনিক নিরাপত্তাকে। অভিযোগ উঠেছে, একদল দুষ্কৃতী আচমকাই বিডিও দপ্তরে ঢুকে তাণ্ডব চালায়।
শুধুমাত্র ভাঙচুরই নয়, অফিসের ভেতরে থাকা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র তছনছ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এই আকস্মিক হামলায় বিডিও অফিসের কর্মীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। প্রাণভয়ে অনেকে দপ্তর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। খবর পেয়ে বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং বর্তমানে গোটা এলাকা পুলিশের কড়া নজরদারিতে রয়েছে। সন্দেশখালি ছাড়াও ফরাক্কা ও চাকুলিয়া থেকেও অশান্তির খবর এসেছে।
একনজরে অশান্তির ঘটনাবলি:
| স্থান | ঘটনার বিবরণ | বর্তমান পরিস্থিতি |
|---|---|---|
| সন্দেশখালি | বিডিও দপ্তরে ভাঙচুর ও নথি তছনছ | বিশাল পুলিশ বাহিনী ও অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন |
| ফরাক্কা | বিক্ষিপ্ত অশান্তি ও উত্তজনা | পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে |
| চাকুলিয়া | শুনানির সময় গণ্ডগোল | স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি বৃদ্ধি |
ভোটারদের চরম হয়রানি রুখতে সুপ্রিম কোর্টের বড় পদক্ষেপ, রসিদ বাধ্যতামূলক
নির্বাচন কমিশনের নিত্যনতুন নিয়মাবলীর জেরে সাধারণ ভোটাররা যে চূড়ান্ত হেনস্থার শিকার হচ্ছেন, তা বলাই বাহুল্য। বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ভোটাররা তাদের প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার পরেও কোনো প্রমাণপত্র বা প্রাপ্তি স্বীকারের কাগজ (Acknowledgement Slip) পাচ্ছেন না। ফলে পরবর্তীকালে কোনো সমস্যা হলে তাদের হাতে প্রমাণের কোনো নথি থাকছে না। এই বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট এবার কড়া রায় শুনিয়েছে।
সোমবারই শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, ভোটাররা নথি জমা দিলে কমিশনকে অবশ্যই তার রসিদ বা স্লিপ দিতে হবে। কমিশন সূত্রে খবর, সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ মেনে খুব শীঘ্রই রিসিট দেওয়ার নীতি-নির্দেশিকা জারি করা হবে। এর ফলে SIR শুনানি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
ভোটারদের মূল অভিযোগসমূহ:
১. বহুক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাজ না হওয়া।
২. সঠিক নথি জমা দেওয়ার পরেও প্রাপ্তি স্বীকারের রসিদ না পাওয়া।
৩. কমিশনের সার্ভার বা প্রক্রিয়ার জটিলতায় সময় নষ্ট হওয়া।
৪. ফর্ম ফিলাপ নিয়ে বিএলও-দের কাছ থেকে সঠিক সহযোগিতা না পাওয়া।
বিএলও-দের ভুলের খেসারত, ভুয়ো তথ্য নিয়ে কমিশনের চরম হুঁশিয়ারি
ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে যুক্ত বিএলও (BLO)-দের ভূমিকা নিয়েও এবার বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন উঠে এসেছে। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ভোটারদের তথ্যে অদ্ভুত গরমিল পাওয়া গেছে। উদাহরণস্বরূপ, এমন অনেক ব্যক্তির নাম নথিভুক্ত হয়েছে, যাদের নামের পাশে আট, দশ, বারো বা তারও বেশি সন্তানের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে! এক বা দুই সন্তানের পিতা এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এই ধরনের ভুল তথ্য এন্ট্রি করা হয়েছে।
কমিশন মনে করছে, এই ধরনের ভুল সম্পূর্ণভাবেই বিএলও স্তরে ঘটেছে। ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, এই ধরনের গাফিলতিকে ‘গর্হিত অন্যায়’ বলে উল্লেখ করেছে কমিশন। সিইও মনোজ আগরওয়াল (CEO Manoj Agarwal)-এর দপ্তর থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, তদন্তে যদি কোনো বিএলও-র বিরুদ্ধে গাফিলতির প্রমাণ মেলে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএলও-দের প্রতি কমিশনের নির্দেশিকা:
১. তথ্য এন্ট্রির সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
২. ইচ্ছাকৃত ভুল প্রমাণিত হলে চাকরি নিয়ে টানাটানি হতে পারে।
৩. প্রতিটি তথ্যের সত্যতা যাচাই করে তবেই পোর্টালে আপলোড করতে হবে।
প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
অশান্তি হলে কি সত্যিই শুনানি বন্ধ হয়ে যাবে?
হ্যাঁ, কমিশন এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। যদি কোনো নির্দিষ্ট বুথ বা কেন্দ্রে বড় ধরনের অশান্তি বা বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তবে সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে SIR শুনানি প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেওয়া হবে। সুষ্ঠ পরিবেশ ফিরে না আসা পর্যন্ত কাজ শুরু হবে না।
শুনানির সময় নিরাপত্তার দায়িত্ব কার উপর থাকছে?
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, শুনানির সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাজ্য পুলিশের। রাজ্যের ডিজিপি-কে সুনিশ্চিত করতে হবে যেন ভোটার এবং নির্বাচনী আধিকারিকরা নিরাপদে তাদের কাজ করতে পারেন।
নথিপত্র জমা দেওয়ার পর রসিদ না পেলে কী করবেন?
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে রসিদ বা একনলেজমেন্ট স্লিপ দেওয়া বাধ্যতামূলক। যদি কেউ রসিদ না পান, তবে তিনি তৎক্ষণাৎ বিষয়টি উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের নজরে আনতে পারেন। কমিশন খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে বিস্তারিত গাইডলাইন প্রকাশ করবে।



