টলিউড অভিনেতা তথা খড়গপুরের বিজেপি বিধায়ক হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে এখন রাজ্যজুড়ে চর্চা চলছে। গত ২০ জানুয়ারি বেনারসের ঘাটে ঋতিকা গিরির সঙ্গে তাঁর বিয়ের ছবি সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হতেই বিতর্কের শুরু। হিরণের প্রথম স্ত্রী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায় দাবি করেছেন, তাদের মধ্যে কোনো আইনি বিচ্ছেদ বা ডিভোর্স হয়নি। এই অবস্থায় হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে দাবি তুলে তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন। আজ আমরা এই চাঞ্চল্যকর খবরের গভীরে গিয়ে পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করব।
বেনারসের ঘাটে সাতপাকে হিরণ: সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল বিয়ের ছবি
গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি খবর ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে— হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিয়ে সেরে ফেলেছেন। বেনারসের গঙ্গার ঘাটে মডেল ও অভিনেত্রী ঋতিকা গিরির সঙ্গে তাঁর বিয়ের একাধিক ছবি ও ভিডিও সামনে আসে। ছবিতে দেখা যায়, হিরণ ধুতি-পাঞ্জাবিতে এবং ঋতিকা লাল বেনারসিতে সেজে বৈদিক নিয়ম মেনে বিয়ে করছেন।
এই খবরটি প্রকাশ্যে আসতেই অবাক হন অভিনেতার ভক্ত থেকে শুরু করে টলিউডের সহকর্মীরা। কারণ, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সংসার। তাদের ১৯ বছরের একটি মেয়েও রয়েছে। বিয়ের এই ছবিগুলো সামনে আসার পর থেকেই টলিউডের অন্দরে কানাঘুষো শুরু হয় যে, হিরণ কি সত্যিই প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলেছেন?
অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়ের পাল্টা তোপ: “ডিভোর্স হয়নি আমাদের”
বিয়ের খবর চাউর হতেই মুখ খুলেছেন হিরণের প্রথম স্ত্রী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়। তিনি সংবাদমাধ্যমকে সাফ জানিয়েছেন, হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিয়ে করার কোনো আইনি অধিকার নেই কারণ তাদের ডিভোর্স হয়নি। ২০০০ সালের ১১ ডিসেম্বর তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। অনিন্দিতার দাবি, তাঁরা এখনও স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই পরিচিত এবং হিরণ মাঝেমধ্যেই কলকাতা এসে তাঁদের সঙ্গে সময় কাটাতেন।
অনিন্দিতা আরও অভিযোগ করেছেন যে, তাঁকে কোনো ডিভোর্স নোটিস পাঠানো হয়নি। যদিও হিরণের দ্বিতীয় স্ত্রী ঋতিকা দাবি করেছেন যে অনিন্দিতাকে নোটিস দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু অনিন্দিতা সেই দাবি সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিয়ে প্রমাণের দাবি তুলেছেন। এই দ্বন্দ্বে এখন সরগরম নেটদুনিয়া।
হিরণের প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীর দাবির তুলনা
| বিষয় | অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায় (প্রথম স্ত্রী) | ঋতিকা গিরি (দ্বিতীয় স্ত্রী) |
| বিচ্ছেদের স্থিতি | কোনো ডিভোর্স হয়নি | ডিভোর্স নোটিস পাঠানো হয়েছে |
| বিয়ের বৈধতা | দ্বিতীয় বিয়েটি সম্পূর্ণ বেআইনি | বিয়েটি বৈধ এবং তাঁরা ৫ বছর ধরে একসাথে |
| বর্তমান পদক্ষেপ | পুলিশের কাছে এফআইআর দায়ের | আইনি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত |
আনন্দপুর থানায় এফআইআর দায়ের ও মেয়ের প্রতিক্রিয়া
বিতর্ক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায় আর চুপ থাকেননি। তিনি বুধবার রাতে তাঁর মেয়ে নিয়াশা এবং আইনজীবীকে নিয়ে আনন্দপুর থানায় পৌঁছান। সেখানে তিনি হিরণ এবং ঋতিকার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিয়ে রুখতে এবং তাঁর অধিকার ফিরে পেতে তিনি আইনের লড়াই শুরু করেছেন।
থানার বাইরে কান্নায় ভেঙে পড়েন হিরণের কন্যা নিয়াশা। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, সোশ্যাল মিডিয়া থেকেই তিনি তাঁর বাবার বিয়ের খবর জানতে পেরেছেন। একজন বাবা হিসেবে হিরণ ব্যর্থ— এমন কঠোর মন্তব্যও শোনা যায় তাঁর মুখে। মেয়ের এই ভেঙে পড়া দেখে নেটিজেনদের বড় একটি অংশ অনিন্দিতার পাশে দাঁড়িয়েছেন।
হিরণ ও অনিন্দিতা বির্তক নিয়ে কিছু জরুরি প্রশ্নোত্তর (FAQ)
হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম বিয়ে কবে হয়েছিল?
হিরণ এবং অনিন্দিতার বিয়ে হয়েছিল ২০০০ সালের ১১ ডিসেম্বর। তাঁদের বিয়ের বয়স প্রায় ২৫ বছর।
হিরণের দ্বিতীয় স্ত্রী ঋতিকা গিরি কে?
ঋতিকা গিরি একজন মডেল এবং অভিনেত্রী। হিরণের দাবি অনুযায়ী, তাঁরা গত ৫ বছর ধরে একে অপরের সাথে যুক্ত।
পুলিশ এই বিষয়ে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?
অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে আনন্দপুর থানা মামলা দায়ের করেছে এবং পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
ঋতিকা গিরির বয়ান: “অনিন্দিতা সব জানতেন”
হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর ঋতিকা গিরি চুপ করে থাকেননি। তিনি একটি দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন যে, তিনি এবং হিরণ গত ৫ বছর ধরে লিভ-ইন সম্পর্কে ছিলেন এবং তাঁদের বিয়ের বিষয়টি অনিন্দিতা আগে থেকেই জানতেন। ঋতিকার মতে, তিনি তাঁর বয়স নিয়ে কোনো ভুল তথ্য দেননি এবং হিরণ অনেক আগেই বিবাহবিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন।
ঋতিকা আরও জানিয়েছেন যে, তিনি কোনো ঘর ভাঙেননি। বরং হিরণ এবং অনিন্দিতার সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই তলানিতে ছিল। যদি কেউ মনে করে এই বিয়ে অবৈধ, তবে তিনি আদালতে তা প্রমাণ করতে প্রস্তুত। এই বয়ান বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
টলিউড ও রাজনীতির ওপর এই বিতর্কের প্রভাব
হিরণ শুধু একজন অভিনেতাই নন, তিনি একজন সক্রিয় রাজনীতিক ও বিধায়ক। তাই হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে এই বিতর্ক শুধু বিনোদন জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা রাজনৈতিক মহলেও পৌঁছে গিয়েছে। বিরোধীরা ইতিমধ্যেই এই বিষয়টি নিয়ে বিজেপি বিধায়ককে আক্রমণ করতে শুরু করেছেন।
টলিপাড়ার অনেকেই মনে করছেন, একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে হিরণের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। যদিও হিরণ নিজে এখনও সংবাদমাধ্যমের সামনে সরাসরি কোনো বিবৃতি দেননি। তিনি আপাতত এই বিতর্ক থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চাইছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত তালিকা:
- ২০ জানুয়ারি: বেনারসের বিয়ের ছবি ভাইরাল।
- ২১ জানুয়ারি: অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক দাবি।
- ২২ জানুয়ারি: আনন্দপুর থানায় এফআইআর দায়ের।
- ২২ জানুয়ারি: ঋতিকা গিরির সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট।
পরিশেষে বলা যায়, হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিয়ে সংক্রান্ত এই আইনি যুদ্ধ এখন আদালতের চৌকাঠ পর্যন্ত পৌঁছেছে। অনিন্দিতা তাঁর দাবিতে অনড়, অন্যদিকে ঋতিকাও পিছু হটতে রাজি নন। এখন দেখার, পুলিশি তদন্তে কোনো নতুন তথ্য বেরিয়ে আসে কিনা। হিরণ চট্টোপাধ্যায় শেষ পর্যন্ত তাঁর নীরবতা ভেঙে কী সাফাই দেন, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের মানুষ।




