ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ আবেদন পদ্ধতি ও সুবিধার বিস্তারিত তথ্য Aikyashree Scholarship 2026

পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক অনন্য দান 'ঐক্যশ্রী'। এই প্রতিবেদনে জানুন আবেদনের শেষ তারিখ, যোগ্যতা এবং টাকা পাওয়ার নিয়ম।

ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ

ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ (Aikyashree Scholarship 2026) : রাজ্যের ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায় যাতে কোনো অভাব না থাকে, তার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের (মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, পার্সি ও জৈন) ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে চালু হয়েছে ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ আবেদন পদ্ধতি ও সুবিধার বিস্তারিত তথ্য সম্বলিত এই বিশেষ প্রকল্প। পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও অর্থ নিগম (WBMDFC)-এর অধীনে পরিচালিত এই প্রকল্পটি বর্তমানে রাজ্যের লাখ লাখ পড়ুয়ার পড়াশোনার প্রধান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের প্রতিবেদনে আমরা এই প্রকল্পের খুটিনাটি আলোচনা করব।

ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ আসলে কী এবং কেন এটি চালু করা হয়েছে?

আমাদের সমাজে অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রী থাকা সত্ত্বেও কেবল আর্থিক অনটনের কারণে তাদের পড়াশোনা মাঝপথে থেমে যায়। এই সমস্যার কথা মাথায় রেখেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১৯ সালে ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ চালু করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে পিএইচডি স্তর পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের বার্ষিক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সংখ্যালঘু পড়ুয়াদের মধ্যে স্কুলছুটের সংখ্যা কমানো এবং তাদের স্বনির্ভর করে তোলা।

এই প্রকল্পের সবথেকে বড় বিশেষত্ব হলো এর স্বচ্ছতা। সরাসরি ছাত্রছাত্রীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়, ফলে মাঝপথে কোনো দুর্নীতির সুযোগ থাকে না। যারা পড়াশোনায় ভালো কিন্তু অভাবের কারণে বইখাতা বা স্কুলের ফি দিতে পারছে না, তাদের জন্য ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ আবেদন পদ্ধতি ও সুবিধার বিস্তারিত তথ্য জানা অত্যন্ত জরুরি।

বিভিন্ন ধরণের ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ এবং তার ধরণ

এই প্রকল্পের আওতায় মূলত তিনটি প্রধান ভাগে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। ছাত্রছাত্রীরা তাদের বর্তমান ক্লাসের ভিত্তিতে এই বিভাগগুলো থেকে আবেদন করতে পারেন। নিচে এই বিভাগগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

নিচে এই প্রকল্পের বিভাগগুলো একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

স্কলারশিপের নামকোন ক্লাসের জন্য প্রযোজ্যমূল বৈশিষ্ট্য
প্রি-ম্যাট্রিকপ্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণিস্কুল স্তরের শিক্ষার্থীদের বার্ষিক খরচ প্রদান।
পোস্ট-ম্যাট্রিকএকাদশ শ্রেণি থেকে পিএইচডিকলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার সহায়তা।
মেরিট-কাম-মিনসপ্রফেশনাল ও টেকনিক্যাল কোর্সইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল বা ম্যানেজমেন্ট কোর্স।

ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা

সবাই চাইলেই এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না, এর জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতার মাপকাঠি সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে। আপনি যদি ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ আবেদন পদ্ধতি ও সুবিধার বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী আবেদন করতে চান, তবে নিচের শর্তগুলো পূরণ করতে হবে:

প্রথমত, আবেদনকারীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ছাত্রছাত্রীকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। এছাড়াও, আবেদনকারীকে তার আগের শেষ পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হতে হবে (প্রথম শ্রেণির ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়)। সবশেষে, পরিবারের বার্ষিক আয় ২ লক্ষ টাকার বেশি হওয়া চলবে না (মেরিট-কাম-মিনস-এর ক্ষেত্রে ২.৫ লক্ষ টাকা)।

আবেদনের জন্য যে নথিপত্র আপনার কাছে রাখতে হবে:

  • ছাত্র বা ছাত্রীর নিজস্ব আধার কার্ড।
  • আগের বছরের রেজাল্ট বা মার্কশিট।
  • সচল একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (নিজের নামে থাকলে ভালো)।
  • পরিবারের আয়ের শংসাপত্র (ইনকাম সার্টিফিকেট)।
  • বর্তমানে যেখানে ভর্তি হয়েছেন, সেই প্রতিষ্ঠানের রসিদ।
  • এক কপি রঙিন পাসপোর্ট সাইজ ছবি।

ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ আবেদন পদ্ধতি ও সুবিধার বিস্তারিত তথ্য: অনলাইনে আবেদনের নিয়ম

বর্তমানে এই প্রকল্পের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল বা অনলাইন পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়। আপনাকে WBMDFC-এর অফিসিয়াল পোর্টালে গিয়ে আবেদন করতে হবে। অনেকে আবেদন করতে গিয়ে ভুল করেন, তাই ধাপগুলো নিচে সহজভাবে দেওয়া হলো।

ধাপে ধাপে আবেদন পদ্ধতি:

১. প্রথমে ঐক্যশ্রী পোর্টালে গিয়ে ‘Student Registration’ লিঙ্কে ক্লিক করুন।

২. আপনার জেলা এবং বর্তমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম সিলেক্ট করুন।

৩. নিজের ব্যক্তিগত তথ্য যেমন—নাম, জন্ম তারিখ, মোবাইল নম্বর ও আধার নম্বর দিয়ে রেজিস্টার করুন।

বিজ্ঞাপন

৪. এরপর একটি ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড পাবেন, যা দিয়ে লগ-ইন করতে হবে।

৫. লগ-ইন করার পর আপনার পড়াশোনার তথ্য এবং ব্যাংক ডিটেইলস খুব সাবধানে ফিলাপ করুন।

৬. সবশেষে নথিপত্র আপলোড করে ফর্মটি সাবমিট করুন এবং প্রিন্ট আউট কপি নিজের কাছে রেখে দিন।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে ঠিক কত টাকা পাওয়া যায়?

অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে যে এই প্রকল্পে আবেদনের পর কত টাকা অ্যাকাউন্টে আসে। আসলে এটি নির্ভর করে আপনি কোন ক্লাসে পড়ছেন তার ওপর। সাধারণত প্রি-ম্যাট্রিক স্তরের ছাত্রছাত্রীরা বছরে ১,১০০ টাকা থেকে ৫,৫০০ টাকা পর্যন্ত পেতে পারে। পোস্ট-ম্যাট্রিক স্তরে এই টাকার পরিমাণ ৫,০০০ থেকে ১৬,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আর যারা ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন, তারা বছরে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত সহায়তা পেতে পারেন। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ একজন ছাত্রের ভবিষ্যৎ গড়তে কতটা সাহায্য করে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ সংক্রান্ত কিছু জরুরি প্রশ্নোত্তর (FAQ)

আমি কি একই সাথে স্বামী বিবেকানন্দ স্কলারশিপ ও ঐক্যশ্রী আবেদন করতে পারি?

না, নিয়ম অনুযায়ী আপনি বছরে যেকোনো একটি সরকারি স্কলারশিপের সুবিধাই ভোগ করতে পারবেন। আপনি যদি ঐক্যশ্রী পোর্টালে আবেদন করেন, তবে সেখান থেকেই স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট-কাম-মিনস (SVMCM) এর জন্য আলাদা ক্যাটাগরি পেয়ে যাবেন যদি আপনার নম্বর ৭৫ শতাংশের বেশি থাকে।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কি ছাত্রের নামেই হতে হবে?

হ্যাঁ, বড় ক্লাসের পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে নিজের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকা বাধ্যতামূলক। তবে খুব ছোট ক্লাসের পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে অনেক সময় বাবা-মায়ের সাথে জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট থাকলেও ছাড় দেওয়া হয়, তবে নিজের নামে থাকাটাই সবথেকে নিরাপদ।

আবেদনের শেষ তারিখ কবে?

ঐক্যশ্রী প্রকল্পের আবেদন প্রক্রিয়া সাধারণত আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হয় এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে। তবে মাঝেমধ্যেই সরকার এই সময়সীমা বাড়িয়ে থাকে। সঠিক সময় জানতে সবসময় পোর্টালে নজর রাখা উচিত।

কেন এই স্কলারশিপ আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে?

শুধুমাত্র টাকার জন্য পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি জাতির জন্য সবথেকে বড় ক্ষতি। ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ আবেদন পদ্ধতি ও সুবিধার বিস্তারিত তথ্য জেনে সঠিক সময়ে আবেদন করলে একজন মেধাবী পড়ুয়া তার লক্ষ্য পূরণে অনেক ধাপ এগিয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিটি সংখ্যালঘু পরিবারের মেধাবী সন্তানের পাশে দাঁড়িয়েছে। এই টাকা দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা বই কেনা, টিউশন ফি মেটানো বা হোস্টেলের খরচ অনায়াসেই চালাতে পারে।

পরিশেষে, আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এই তথ্যটি প্রতিটি সংখ্যালঘু পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া। শিক্ষা হলো শ্রেষ্ঠ সম্পদ, আর সেই সম্পদ অর্জনের পথে আর্থিক বাধা যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটাই নিশ্চিত করছে ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ। আপনার যদি যোগ্যতার সবটুকু থাকে, তবে দেরি না করে আজই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করে দিন।

Table of Contents

Leave a Comment