2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে? পুরী, বারিপদা এবং দিল্লির রথযাত্রার সম্পূর্ণ সময়সূচি ও ইতিহাস

২০২৬ সালের পুরী, বারিপদা এবং দিল্লির রথযাত্রার সঠিক তারিখ ও সময়সূচি খুঁজছেন? 2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে, রথ নির্মাণের রহস্য, হেরা পঞ্চমী ও মহাপ্রসাদের মাহাত্ম্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।

Rath Yatra 2026 Dates and Details: সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষদের কাছে রথযাত্রা কেবল একটি সাধারণ বাৎসরিক উৎসব নয়, এটি পরম ভক্তি, আবেগ এবং আধ্যাত্মিক মিলনের এক মহামহোৎসব। আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে যখন ভগবান শ্রী জগন্নাথ, তাঁর বড় ভাই বলভদ্র এবং আদরের বোন সুভদ্রাকে নিয়ে রথে চড়ে মাসির বাড়ি গুন্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামে রাজপথে। ২০২৬ সালের রথযাত্রা নিয়ে ইতিমধ্যেই সারা বিশ্বের জগন্নাথ ভক্তদের মধ্যে এক বিপুল উদ্দীপনা এবং উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। অনেকেই ইন্টারনেটে বা পঞ্জিকায় খোঁজ নেওয়া শুরু করেছেন যে, 2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে?

​আপনি যদি এই পবিত্র রথযাত্রায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে এই প্রতিবেদনটি আপনার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। বিশাল তথ্যসমৃদ্ধ এই প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে আমরা পুরীর ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা, ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার বিখ্যাত বারিপদা রথযাত্রা এবং দিল্লির ত্যাগরাজ জগন্নাথ মন্দিরের রথযাত্রার বিস্তারিত সময়সূচি ও ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করব।

​2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে: হিন্দু পঞ্জিকা এবং পুণ্যতিথির বিস্তারিত খুঁটিনাটি

​হিন্দু বৈদিক পঞ্জিকা অনুযায়ী, প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়। এই বিশেষ দিনটিকে কেন্দ্র করে ওড়িশা থেকে শুরু করে বাংলা, এমনকি সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জগন্নাথ মন্দিরগুলোতে এলাহি আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। ভগবান জগন্নাথ হলেন শ্রীবিষ্ণুর অন্যতম অবতার এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি। বিশ্বাস করা হয়, এই বিশেষ দিনে তিনি গর্ভগৃহের রত্নবেদী ছেড়ে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি আসার জন্য রাজপথে নেমে আসেন।

​যারা জানতে চাইছেন 2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে, তাদের সুবিধার্থে জানানো হচ্ছে যে, ২০২৬ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই পবিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হতে চলেছে (সাধারণত ইংরেজি ক্যালেন্ডারের জুলাই মাসেই এই তিথি পড়ে)। রথযাত্রার প্রায় ১৮ দিন আগে স্নান পূর্ণিমার দিন জগন্নাথ দেব, বলভদ্র এবং সুভদ্রা দেবীকে ১০৮ ঘড়া সুগন্ধি জল দিয়ে মহাস্নান করানো হয়। প্রবল স্নানের ফলে ভগবান অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং টানা ১৫ দিন ‘অনসর’ বা ‘অণসর’ ঘরে বিশ্রামে থাকেন। এই সময়ে সাধারণ ভক্তরা ভগবানের দর্শন পান না। বিশ্রাম শেষে নবযৌবন প্রাপ্ত হয়ে এবং নেত্র উৎসবের মাধ্যমে ভগবান যখন পুনরায় দর্শন দেন, তার ঠিক পরের দিনই এই বিশ্ববিখ্যাত রথযাত্রার সূচনা হয়।

​পুরীর রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে এবং শ্রীক্ষেত্রের ঐশ্বরিক প্রস্তুতি

​রথযাত্রা বলতেই সবার আগে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে শ্রীক্ষেত্র পুরী ধামের ছবি। পুরীর রথযাত্রা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহত্তম রথোৎসব হিসেবে পরিগণিত হয়। লক্ষ লক্ষ ভক্তের মনে এখন একটাই গভীর প্রশ্ন, পুরীর রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে? জ্যোতিষশাস্ত্র এবং পঞ্জিকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি (সম্ভাব্য তারিখ ১৬ বা ১৭ জুলাই) আষাঢ় শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে পুরীতে রথের দড়ি টানা হবে। তবে পুরীর রথযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় বহু মাস আগে থেকেই।

রথযাত্রা ২০২৬: বিভিন্ন স্থানের পবিত্র সময়সূচি এক নজরে

বিভিন্ন স্থানের পবিত্র সময়সূচিরথযাত্রা ২০২৬-এর সঠিক তারিখ ও তিথি
২০২৬ সালে পবিত্র রথযাত্রা উৎসবের মূল দিনটি কবে পড়েছে?২০২৬ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি (আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে) মূল রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।
শ্রীক্ষেত্র পুরীর রথযাত্রা ২০২৬ সালে কত তারিখ পড়েছে?পুরী ধামের ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিখ্যাত রথযাত্রা ২০২৬ সালের ১৬ই জুলাই (বৃহস্পতিবার) অনুষ্ঠিত হবে।
ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার বারিপদা রথযাত্রা ২০২৬ সালে কত তারিখ পড়েছে?দ্বিতীয় শ্রীক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত বারিপদা রথযাত্রা ২০২৬ সালের ১৭ই জুলাই (শুক্রবার) থেকে শুরু হবে (স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী)।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ত্যাগরাজ জগন্নাথ মন্দিরে ২০২৬ সালে রথযাত্রা কবে অনুষ্ঠিত হবে?দিল্লির ত্যাগরাজ নগর জগন্নাথ মন্দিরেও মূল পঞ্জিকা মেনে ১৬ই জুলাই, ২০২৬ তারিখে রথযাত্রা ধুমধামের সাথে পালিত হবে।
ভগবান জগন্নাথের মাসির বাড়ি গুন্ডিচা মন্দিরে আড়প দর্শন কবে থেকে শুরু হবে?রথযাত্রার ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ১৭ই জুলাই, ২০২৬ (শুক্রবার) থেকে গুন্ডিচা মন্দিরে পবিত্র আড়প দর্শন শুরু হবে।
স্বামী-স্ত্রীর মান-অভিমানের প্রতীকী উৎসব ‘হেরা পঞ্চমী’ ২০২৬ সালে কত তারিখে পড়েছে?রথযাত্রার পঞ্চম দিনে অর্থাৎ ২০শে জুলাই, ২০২৬ (সোমবার) পুরীতে ঐতিহ্যবাহী হেরা পঞ্চমী উৎসব পালিত হবে।
ভগবান জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি থেকে ফেরার ফিরতি যাত্রা বা উল্টো রথ ২০২৬ সালে কবে অনুষ্ঠিত হবে?মাসির বাড়ি থেকে শ্রীমন্দিরে ফেরার পবিত্র বহুদা যাত্রা বা উল্টো রথ ২০২৬ সালের ২৪শে জুলাই (শুক্রবার) অনুষ্ঠিত হবে।
রথের ওপর ভগবান জগন্নাথের বিপুল স্বর্ণসজ্জা বা সুনা বেশ ২০২৬ সালে কত তারিখে দর্শন করা যাবে?বহুদা যাত্রার পরের দিন অর্থাৎ ২৫শে জুলাই, ২০২৬ (শনিবার) একাদশী তিথিতে রথের ওপর মহিমান্বিত সুনা বেশ অনুষ্ঠিত হবে।
দেবতাদের শ্রীমন্দিরের মূল রত্নবেদিতে পুনঃপ্রবেশ বা নীলাদ্রি বিজে ২০২৬ সালে কবে পালিত হবে?রসগোল্লা খাইয়ে দেবী লক্ষ্মীর মানভঞ্জন করে দেবতাদের মন্দিরে প্রবেশের চূড়ান্ত পর্ব বা নীলাদ্রি বিজে ২০২৬ সালের ২৭শে জুলাই (সোমবার) সম্পন্ন হবে।

​পবিত্র অক্ষয় তৃতীয়ার দিন থেকে পুরীতে তিনটি বিশাল রথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এই রথগুলো নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো রকম লোহা বা সাধারণ পেরেকের ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রাচীন প্রযুক্তি এবং নির্দিষ্ট জঙ্গল থেকে আনা পবিত্র কাঠ (যেমন- ফাসি, ধৌরা, অশন) দিয়ে এই তিনটি রথ তৈরি করেন বংশপরম্পরায় নিযুক্ত বিশেষ কারিগর বা মহারাণারা।

রথযাত্রা ২০২৬ সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে? পুরী, বারিপদা এবং দিল্লির রথযাত্রার সম্পূর্ণ সময়সূচি ও ইতিহাস
২০২৬ সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে? পুরী, বারিপদা এবং দিল্লির রথযাত্রার সম্পূর্ণ সময়সূচি ও ইতিহাস

​পুরীর রথযাত্রার দিন সকাল থেকেই মন্দিরের ভেতরে বিশেষ পূজার্চনা শুরু হয়। এরপর ‘পহণ্ডি বিজে’ বা দুলিয়ে দুলিয়ে ভগবানকে রথে তোলার এক অদ্ভুত সুন্দর প্রথা পালিত হয়। তিনটি রথে ভগবান আসীন হওয়ার পর পুরীর গজপতি মহারাজ সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথের চারপাশ পরিষ্কার করেন, যাকে ‘ছেরাপহঁরা’ প্রথা বলা হয়। এই প্রথা প্রমাণ করে যে ভগবানের সামনে রাজা থেকে প্রজা—সবাই সমান।

রথের নামদেবতার নামরথের রং ও আচ্ছাদনচাকার সংখ্যারথের উচ্চতা (আনুমানিক)
নন্দীঘোষশ্রী জগন্নাথ দেবলাল এবং হলুদ১৬টি৪৫.৬ ফুট
তালধ্বজপ্রভু বলভদ্রলাল এবং সবুজ১৪টি৪৫ ফুট
দর্পদলনদেবী সুভদ্রালাল এবং কালো১২টি৪৪.৬ ফুট

বারিপদা রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে: ময়ূরভঞ্জের ঐতিহাসিক ও অদ্বিতীয় উৎসব

​পুরীর রথযাত্রার পরেই ওড়িশায় যে রথযাত্রাটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং ঐতিহাসিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো ময়ূরভঞ্জ জেলার বারিপদা রথযাত্রা। বারিপদাকে ওড়িশার “দ্বিতীয় শ্রীক্ষেত্র” বা “Second Srikhetra” বলা হয়। যারা ওড়িশায় যাওয়ার প্ল্যান করছেন, তাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে যে, বারিপদা রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে? সরকারি তথ্য এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বারিপদায় ২০২৬ সালের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে ১৭ই জুলাই, ২০২৬ (17th July, 2026) তারিখে।

​বারিপদার রথযাত্রা সাধারণ রথযাত্রার থেকে বেশ কিছুটা আলাদা এবং এর নিজস্ব কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ১৫৭৫ সালে ময়ূরভঞ্জের তৎকালীন মহারাজা বৈদ্যনাথ ভঞ্জ এই রথযাত্রার প্রচলন করেছিলেন। এখানকার রথগুলো পুরীর রথের চেয়ে আকারে কিছুটা ছোট হলেও, ভক্তদের উন্মাদনায় কোনো খামতি থাকে না। বারিপদার রথযাত্রা একদিনের বদলে সাধারণত দুই দিন ধরে টানা হয়, যা এখানকার একটি বিশেষ প্রথা।

  • বারিপদা রথযাত্রার সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য (মহিলাদের ক্ষমতায়ন): ১৯৭৫ সাল থেকে (আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ উপলক্ষে) বারিপদায় এক যুগান্তকারী প্রথার সূচনা হয়। মা সুভদ্রার রথ ‘দর্পদলন’-এর দড়ি শুধুমাত্র মহিলারাই টানেন। সারা পৃথিবী থেকে হাজার হাজার মহিলা ভক্ত শুধুমাত্র মা সুভদ্রার রথ টানার এই বিরল এবং পবিত্র অধিকার লাভের জন্য বারিপদায় ভিড় জমান। এই প্রথাটি নারী ক্ষমতায়ন এবং নারী শক্তির এক বিশাল প্রতীক হিসেবে সারা বিশ্বে সমাদৃত হয়েছে। তাই ১৭ই জুলাই, ২০২৬-এর জন্য এখন থেকেই ময়ূরভঞ্জ প্রশাসন এবং ভক্তরা প্রহর গুনতে শুরু করেছেন।

​দিল্লির ত্যাগরাজ জগন্নাথ মন্দিরে 2026 সালের রথযাত্রার বিশাল আয়োজন

​ওড়িশা বা বাংলার বাইরে রথযাত্রার এক বিশাল প্রভাব দেখতে পাওয়া যায় ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে। দিল্লির হাউজ খাস এলাকার কাছে অবস্থিত ত্যাগরাজ নগর জগন্নাথ মন্দির (Thyagraj Jagannath Mandir) প্রবাসী ওড়িয়া এবং স্থানীয় জগন্নাথ ভক্তদের জন্য এক পরম তীর্থস্থান। যারা জানতে চাইছেন 2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে, তাদের জানিয়ে রাখি যে, দিল্লির এই মন্দিরেও মূল পঞ্জিকার তিথি মেনেই অত্যন্ত ধুমধামের সাথে রথযাত্রা পালিত হয়।

বিজ্ঞাপন

​দিল্লির এই মন্দিরটি ১৯৬০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তারপর থেকে প্রতি বছর এখানে রথযাত্রার বিশাল শোভাযাত্রা বের হয়। রথের দিন সকালে মন্দিরে মঙ্গলারতি, অবকাশ নীতি এবং বিশেষ পূজার পর ভগবানকে রথে অধিষ্ঠিত করা হয়। দিল্লির মতো একটি ব্যস্ত এবং আধুনিক শহরে যখন জগন্নাথ দেবের রথ রাজপথে নেমে আসে, তখন চারপাশের পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে যায়। খোল, করতাল, শঙ্খ এবং ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজধানীর আকাশ-বাতাস। হাজার হাজার ভক্ত এই রথের দড়ি একবার ছুঁয়ে দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় অপেক্ষা করেন।

​দিল্লির রথযাত্রায় কেবল প্রবাসী ওড়িয়া বা বাঙালিরাই নন, উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের অবাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও প্রবল উৎসাহের সাথে অংশগ্রহণ করেন। রথের যাত্রাপথে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তরফ থেকে ভক্তদের মধ্যে বিনামূল্যে জল, শরবত এবং মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়। দিল্লির মতো জায়গায় এই উৎসব ভারতের “বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য”-এর এক অন্যতম সেরা উদাহরণ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ায়।

​রথযাত্রা ২০২৬ সম্পর্কিত কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

​2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে বলে পঞ্জিকায় উল্লেখ রয়েছে?

​সনাতন হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে, প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা পালিত হয়। ২০২৬ সালে এই পবিত্র তিথিটি ইংরেজি ক্যালেন্ডারের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে (মূলত ১৬ বা ১৭ জুলাইয়ের আশেপাশে) পড়েছে।

​পুরীর রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে এবং এর প্রধান আকর্ষণ কী?

​পুরীর রথযাত্রা ২০২৬ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি অনুষ্ঠিত হবে। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো তিনটি বিশাল রথ—নন্দীঘোষ, তালধ্বজ এবং দর্পদলন। রথের আগে গজপতি মহারাজের সোনার ঝাড়ু দিয়ে পথ পরিষ্কার করা বা ‘ছেরাপহঁরা’ প্রথা এখানকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ।

​দ্বিতীয় শ্রীক্ষেত্র খ্যাত বারিপদা রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে?

​ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী বারিপদা রথযাত্রা ২০২৬ সালের ১৭ই জুলাই (17th July, 2026) অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। এই দিনটির জন্য ইতিমধ্যেই কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে এবং দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক টিকিট বুকিং শুরু করেছেন।

​বারিপদার রথযাত্রায় দেবী সুভদ্রার রথ টানার ক্ষেত্রে কী বিশেষ নিয়ম রয়েছে?

​বারিপদা রথযাত্রার একটি অনন্য এবং ঐতিহাসিক নিয়ম হলো, দেবী সুভদ্রার রথ (দর্পদলন) শুধুমাত্র মহিলারাই টানেন। ১৯৭৫ সাল থেকে চালু হওয়া এই প্রথা নারী শক্তির প্রতি এক বিশাল সম্মান প্রদর্শন করে এবং এটি বারিপদা রথযাত্রার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

​দিল্লির ত্যাগরাজ জগন্নাথ মন্দিরে রথযাত্রা কীভাবে পালিত হয়?

​দিল্লির ত্যাগরাজ নগর জগন্নাথ মন্দিরে মূল তিথি মেনেই বিশাল জাঁকজমকের সাথে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার প্রবাসী ওড়িয়া, বাঙালি এবং স্থানীয় অবাঙালি ভক্তরা মিলে রথের দড়ি টানেন এবং সারা রাজধানী মুখরিত হয় ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে। যাত্রাপথে ভক্তদের মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়।

রথযাত্রা ২০২৬ – দ্বিতীয় পর্ব (গুন্ডিচা যাত্রা, হেরা পঞ্চমী এবং বহুদা যাত্রার বিস্তারিত বিবরণ):

​প্রথম পর্বে আমরা বিস্তারিতভাবে জেনেছি যে 2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে, এবং পাশাপাশি শ্রীক্ষেত্র পুরী, ময়ূরভঞ্জের বারিপদা এবং নয়াদিল্লির ত্যাগরাজ মন্দিরের রথযাত্রার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছি। যারা ইন্টারনেটে বারবার খুঁজছেন যে পুরীর রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে কিংবা বারিপদা রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে, তাদের জন্য প্রথম পর্বটি ছিল অত্যন্ত তথ্যবহুল। এই দ্বিতীয় পর্বে আমরা রথযাত্রার পরবর্তী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র আচার-অনুষ্ঠানগুলি নিয়ে বিশদে আলোচনা করব। রথযাত্রা শুধুমাত্র একদিনের উৎসব নয়, এটি ৯ থেকে ১২ দিনের একটি দীর্ঘ আধ্যাত্মিক পরিক্রমা। আসুন, ভগবান শ্রী জগন্নাথের মাসির বাড়ি যাত্রা, হেরা পঞ্চমী, সুনা বেশ এবং নীলাদ্রি বিজে সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

​গুন্ডিচা মন্দিরে ভগবান জগন্নাথের আগমন এবং আড়প মণ্ডপের পবিত্র অবস্থান

​পুরীর শ্রীমন্দির বা মূল মন্দির থেকে গুন্ডিচা মন্দিরের দূরত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার। এই বিস্তীর্ণ রাজপথকে ‘বড়দাণ্ড’ বলা হয়। রথযাত্রার দিন লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগমে, খোল-করতাল এবং হরিনাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে তিনটি বিশালাকার রথ—নন্দীঘোষ, তালধ্বজ এবং দর্পদলন ধীরে ধীরে বড়দাণ্ড ধরে গুন্ডিচা মন্দিরের দিকে অগ্রসর হয়। অনেকেই ভাবেন রথযাত্রা মানেই উৎসবের শেষ, কিন্তু আসলে এটি উৎসবের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা মাত্র।

​ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রা গুন্ডিচা মন্দিরে পৌঁছানোর পর সরাসরি মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করেন না। রথগুলো গুন্ডিচা মন্দিরের বাইরে এসে দাঁড়ালে, সেদিন রাতটি দেবতারা রথের ওপরেই অবস্থান করেন। পরের দিন অত্যন্ত ভক্তিভরে এবং সুনির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের রথ থেকে নামিয়ে গুন্ডিচা মন্দিরের ভেতরে থাকা পবিত্র ‘আড়প মণ্ডপ’ বা ‘জন্মবেদি’-তে অধিষ্ঠিত করা হয়। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন এবং তাঁর স্ত্রী রানি গুন্ডিচার অসীম ভক্তির কারণে ভগবান জগন্নাথ বছরে একবার তাঁর জন্মস্থানে বা মাসির বাড়িতে এই নয় দিনের জন্য অবস্থান করেন।

​যাঁরা ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন যে 2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে, তাঁদের এটাও জেনে রাখা উচিত যে রথযাত্রার ঠিক পরের দিন আড়প মণ্ডপে ভগবানের প্রথম দর্শন পাওয়া অত্যন্ত পুণ্যের কাজ বলে মনে করা হয়। এই বিশেষ দর্শনকে ‘আড়প দর্শন’ বলা হয়। হিন্দু ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, কুরুক্ষেত্রে কোটি বছর ধরে তপস্যা করলে যে পুণ্য লাভ হয়, গুন্ডিচা মন্দিরের আড়প মণ্ডপে ভগবান জগন্নাথকে এক মুহূর্ত দর্শন করলে তার চেয়েও সহস্র গুণ বেশি পুণ্য অর্জিত হয়।

​আড়প মহাপ্রসাদ এবং মাসির বাড়ির আতিথেয়তার অনবদ্য আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

​গুন্ডিচা মন্দিরে ভগবান জগন্নাথের এই অবস্থানকাল শুধুমাত্র ভক্তদের জন্যই নয়, স্বয়ং ভগবানের জন্যও অত্যন্ত আনন্দের। শ্রীমন্দিরে ভগবান যে প্রসাদ গ্রহণ করেন, তার চেয়ে গুন্ডিচা মন্দিরের প্রসাদ সম্পূর্ণ আলাদা এবং এর স্বাদ ও মাহাত্ম্য অদ্বিতীয়। এই ৯ দিন ধরে ভগবানকে যে বিশেষ প্রসাদ নিবেদন করা হয়, তাকে ‘আড়প মহাপ্রসাদ’ বা ‘আড়প অভড়া’ বলা হয়।

​পুরীর প্রধান মন্দিরের নিয়মকানুন অত্যন্ত কঠোর হলেও, গুন্ডিচা মন্দিরে অর্থাৎ মাসির বাড়িতে ভগবান অনেক বেশি স্বাধীন এবং স্নেহ-আদরে থাকেন। প্রতিদিন সকালে মঙ্গলারতি থেকে শুরু করে রাতে পহুড় (শয়ন) পর্যন্ত সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান অত্যন্ত ভক্তি ও নিষ্ঠার সাথে পালিত হয়। হাজার হাজার ভক্ত প্রতিদিন এই আড়প মহাপ্রসাদ গ্রহণ করার জন্য গুন্ডিচা মন্দিরের বাইরে অপেক্ষা করেন। বিশ্বাস করা হয়, মাসির বাড়িতে ভগবান তাঁর ভক্তদের দুই হাত ভরে আশীর্বাদ করেন এবং যে কেউ এই পবিত্র প্রসাদ গ্রহণ করলে তার সমস্ত পাপ খণ্ডন হয়ে যায়।

অনুষ্ঠানের নামতিথি ও সময়কালপ্রধান বৈশিষ্ট্য
আড়প দর্শনরথযাত্রার পরের দিনগুন্ডিচা মন্দিরের জন্মবেদিতে প্রভুর প্রথম দর্শন।
হেরা পঞ্চমীরথযাত্রার পঞ্চম দিনদেবী লক্ষ্মীর ক্রোধ এবং জগন্নাথের রথের অংশ ভাঙার প্রথা।
বহুদা যাত্রারথযাত্রার নবম দিনমাসির বাড়ি থেকে শ্রীমন্দিরের উদ্দেশ্যে প্রভুর ফিরতি যাত্রা।
সুনা বেশবহুদা যাত্রার পরের দিনরথের ওপর ভগবানকে বিপুল স্বর্ণালঙ্কারে সাজানোর ঐশ্বরিক রূপ।
নীলাদ্রি বিজেএকাদশী/দ্বাদশী তিথিরথ থেকে নেমে শ্রীমন্দিরের রত্নবেদিতে ভগবানের পুনঃপ্রবেশ।

হেরা পঞ্চমী: দেবী লক্ষ্মীর মানভঞ্জন ও রথ ভাঙার এক অভিনব এবং পৌরাণিক প্রথা

​রথযাত্রা উৎসবের অন্যতম একটি আকর্ষণীয় এবং নাটকীয় পর্ব হলো ‘হেরা পঞ্চমী’। রথযাত্রার ঠিক পঞ্চম দিনে এই বিশেষ আচারটি পালিত হয়। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, ভগবান জগন্নাথ রথযাত্রার দিন তাঁর স্ত্রী দেবী লক্ষ্মীকে কথা দিয়েছিলেন যে তিনি খুব তাড়াতাড়ি মাসির বাড়ি থেকে ফিরে আসবেন। কিন্তু চার দিন কেটে যাওয়ার পরেও স্বামী ফিরে না আসায় এবং তাঁকে সাথে না নিয়ে ভাই-বোনকে নিয়ে মাসির বাড়ি যাওয়ায় দেবী লক্ষ্মী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন।

​স্বামীর খোঁজ নিতে এবং নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করতে পঞ্চম দিনের দিন দেবী লক্ষ্মী একটি সুসজ্জিত পালকিতে চড়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে গুন্ডিচা মন্দিরে এসে পৌঁছান। সেখানে এসে তিনি দেখেন যে ভগবান জগন্নাথ তাঁর ভাই-বোনকে নিয়ে অত্যন্ত আনন্দে সময় কাটাচ্ছেন এবং লক্ষ্মী দেবীর কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেছেন। রাগে এবং অভিমানে দেবী লক্ষ্মী তাঁর সেবকদের নির্দেশ দেন ভগবান জগন্নাথের রথ ‘নন্দীঘোষ’-এর একটি কাঠের টুকরো ভেঙে দেওয়ার জন্য। এই প্রথাটি ‘রথ ভাঙা’ নামে পরিচিত।

​এরপর দেবী লক্ষ্মী সেখান থেকে অভিমান করে ফিরে যান। এই পুরো পর্বটি অত্যন্ত প্রতীকী এবং এটি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার মান-অভিমানের এক সুন্দর মানবিক রূপ তুলে ধরে। যারা জানতে চাইছেন পুরীর রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে, তাঁদের হিসাব করে রাখা উচিত যে সেই নির্দিষ্ট তারিখের ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় পুরীতে এই অসামান্য হেরা পঞ্চমী উৎসব পালিত হবে।

​বহুদা যাত্রা বা উল্টো রথ: শ্রীমন্দিরে ফেরার এক আবেগঘন ঐশ্বরিক মুহূর্ত

​গুন্ডিচা মন্দিরে নয় দিনের আতিথেয়তা এবং ভক্তদের মনস্কামনা পূর্ণ করার পর, আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে ভগবান শ্রী জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রা তাঁদের নিজ গৃহ অর্থাৎ শ্রীমন্দিরে ফিরে আসার জন্য প্রস্তুতি নেন। এই ফিরতি যাত্রাকেই বলা হয় ‘বহুদা যাত্রা’ বা উল্টো রথ।

​গুন্ডিচা মন্দির থেকে ভগবানের বিদায়বেলার দৃশ্যটি অত্যন্ত আবেগঘন। ভক্তদের চোখে জল থাকে, কারণ তাদের প্রিয় ঠাকুর মাসির বাড়ি ছেড়ে পুনরায় মূল মন্দিরের রত্নবেদির কঠিন নিয়মের ঘেরাটোপে ফিরে যাচ্ছেন। যাওয়ার দিনের মতোই পহণ্ডি বা দুলিয়ে দুলিয়ে তিন দেবতাকে রথে তোলা হয় এবং লক্ষ লক্ষ ভক্ত আবার সেই বড়দাণ্ড ধরে উল্টো রথের দড়ি টানতে শুরু করেন।

  • পোড়াপিঠা ভোগ এবং মাউসী মা মন্দির: বহুদা যাত্রার পথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিরতি রয়েছে। শ্রীমন্দিরে ফেরার পথে রথগুলো ‘মাউসী মা’ বা মাসির মন্দিরের সামনে এসে থামে। এখানে ভগবান জগন্নাথকে তাঁর মাসির তৈরি বিশেষ ‘পোড়াপিঠা’ নিবেদন করা হয়। পোড়াপিঠা হলো চালের গুঁড়ো, নারকেল, গুড় এবং নানা রকম মশলা দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ ধরনের মিষ্টি, যা ভগবান জগন্নাথের অত্যন্ত প্রিয়। এই ভোগ নিবেদনের পরেই রথগুলো শ্রীমন্দিরের দিকে আবার এগোতে শুরু করে।

​সুনা বেশ: রথের ওপর ভগবান জগন্নাথের বিপুল স্বর্ণসজ্জা এবং ঐশ্বরিক রূপের প্রকাশ

​বহুদা যাত্রার দিন রথগুলো শ্রীমন্দিরের সিংহদুয়ারের সামনে এসে পৌঁছালেও, দেবতারা সেদিনই মন্দিরের ভেতর প্রবেশ করেন না। একাদশী তিথিতে রথের ওপরেই ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রাকে প্রায় ২০০ কেজিরও বেশি ওজনের খাঁটি সোনার অলঙ্কারে সাজানো হয়। এই বিশেষ রূপকে বলা হয় ‘সুনা বেশ’ বা ‘রাজাধিরাজ বেশ’।

​বছরে মাত্র কয়েকটি বিশেষ দিনেই ভগবান জগন্নাথকে এই সুনা বেশে সাজানো হয়, যার মধ্যে রথযাত্রার সময় রথের ওপর এই সাজটি সবচেয়ে বিখ্যাত। লক্ষ লক্ষ ভক্ত শুধু এই স্বর্ণখচিত ঐশ্বরিক রূপ দর্শন করার জন্য পুরীতে ভিড় জমান। বিশাল বিশাল সোনার মুকুট, কুণ্ডল, হার এবং নানা ধরনের প্রাচীন অলঙ্কারে দেবতাদের সাজানো হয়, যা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়।

  • সুনা বেশের প্রধান অলঙ্কারসমূহের একটি তালিকা:
    • স্বর্ণ মুকুট (শ্রী মুখ খণ্ডুয়া): দেবতাদের মাথায় পরানো বিশালাকার সোনার মুকুট।
    • কুণ্ডল ও কানাপাতা: কানের বিশাল সোনার দুল যা সূর্য এবং চন্দ্রের প্রতীক।
    • স্বর্ণ হস্ত ও পদ: জগন্নাথ এবং বলভদ্রের কৃত্রিম সোনার হাত এবং পা লাগানো হয়।
    • স্বর্ণ চক্র ও শঙ্খ: ভগবান জগন্নাথের ডান হাতে সোনার চক্র এবং বাঁ হাতে সোনার শঙ্খ দেওয়া হয়।
    • কদম্ব ফুল ও সেবতী ফুল: সোনার তৈরি বিভিন্ন ফুলের নকশা যা দেবতাদের গলায় পরানো হয়।

​অধরা পনা এবং নীলাদ্রি বিজে: মানভঞ্জন এবং মূল মন্দিরে পুনঃপ্রবেশ

​সুনা বেশের পরের দিন পালিত হয় ‘অধরা পনা’ উৎসব। এই দিন রথের ওপর থাকা দেবতাদের উদ্দেশ্য করে বিশাল মাটির হাঁড়িতে বিশেষ ধরনের শরবত বা পনা নিবেদন করা হয়। নিবেদনের পর সেই হাঁড়িগুলো রথের ওপর ভেঙে দেওয়া হয়, যাতে রথের আশেপাশে থাকা অশরীরী আত্মা এবং অন্যান্য দেবতারা সেই শরবত গ্রহণ করে তৃপ্ত হতে পারে।

​এরপর আসে রথযাত্রার চূড়ান্ত পর্ব—’নীলাদ্রি বিজে’। এটি হলো রথ থেকে নেমে দেবতাদের শ্রীমন্দিরের রত্নবেদিতে পুনঃপ্রবেশের অনুষ্ঠান। কিন্তু ভগবান জগন্নাথ যখন মন্দিরে প্রবেশ করতে যান, তখন দেবী লক্ষ্মী মন্দিরের দরজা বা জয়-বিজয় দ্বার ভেতর থেকে বন্ধ করে দেন। হেরা পঞ্চমীর সেই রাগ তখনো দেবীর মনে বিরাজমান। দীর্ঘ সময় ধরে ভগবান জগন্নাথের সেবক এবং দেবী লক্ষ্মীর সেবকদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা চলে, যা অত্যন্ত রোমাঞ্চকর।

​অবশেষে ভগবান জগন্নাথ দেবী লক্ষ্মীর মানভঞ্জন করার জন্য তাঁকে মিষ্টি রসগোল্লা উপহার দেন। রসগোল্লা পেয়ে লক্ষ্মী শান্ত হন এবং মন্দিরের দরজা খুলে দেন। এরপর ভগবান জগন্নাথ শ্রীমন্দিরের রত্নবেদিতে গিয়ে আসীন হন এবং এর মাধ্যমেই রথযাত্রা উৎসবের শুভ সমাপ্তি ঘটে।

​বারিপদা এবং দিল্লির মন্দিরে গুন্ডিচা ও বহুদা যাত্রার সমতুল্য আয়োজন

​যাঁরা বারিপদা রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে তা নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন, তাঁদের জেনে রাখা ভালো যে ময়ূরভঞ্জের বারিপদাতেও পুরীর মতোই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে গুন্ডিচা যাত্রা, বহুদা যাত্রা এবং অন্যান্য সমস্ত নীতি পালিত হয়। বারিপদাতেও রথ মাসির বাড়ি যায় এবং সেখানেও লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হয়। তবে এখানকার রথ টানা দু’দিন ধরে হয় বলে এর সময়সূচি পুরীর থেকে সামান্য আলাদা থাকে।

​একইভাবে, দিল্লির ত্যাগরাজ জগন্নাথ মন্দিরেও প্রবাসী ওড়িয়া এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা গুন্ডিচা যাত্রা এবং বহুদা যাত্রা অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে পালন করেন। রথযাত্রার দিন ভগবানকে মন্দির থেকে কিছুটা দূরে একটি অস্থায়ী ‘গুন্ডিচা মণ্ডপ’-এ নিয়ে যাওয়া হয় এবং নয় দিন পর সেখান থেকেই আবার উল্টো রথ বা বহুদা যাত্রার মাধ্যমে মূল মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়। দিল্লির বুকেও এই উৎসব সনাতন ধর্মের এক বিরাট মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়।

​রথযাত্রা ২০২৬ – দ্বিতীয় পর্বের কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

​রথযাত্রার পর ভগবান জগন্নাথ কোথায় গিয়ে অবস্থান করেন এবং কতদিনের জন্য?

​রথযাত্রার দিন শ্রীমন্দির থেকে রওনা হয়ে ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রা তাঁদের মাসির বাড়ি অর্থাৎ ‘গুন্ডিচা মন্দির’-এ যান। সেখানে তাঁরা পবিত্র ‘আড়প মণ্ডপ’ বা জন্মবেদিতে নয় দিনের জন্য অবস্থান করেন। এই নয় দিন ভক্তরা সেখানে প্রভুর আড়প দর্শন করার সুযোগ পান।

​হেরা পঞ্চমী উৎসবটি কী এবং এটি কেন পালন করা হয়?

​রথযাত্রার পঞ্চম দিনে হেরা পঞ্চমী পালিত হয়। ভগবান জগন্নাথ কথা দিয়েও ফিরে না আসায় দেবী লক্ষ্মী অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে গুন্ডিচা মন্দিরে পৌঁছান এবং ক্ষোভ প্রকাশ করতে জগন্নাথের রথের একটি কাঠের টুকরো ভেঙে দেন। স্বামী-স্ত্রীর এই মান-অভিমানের প্রতীকী রূপকেই হেরা পঞ্চমী বলা হয়।

​বহুদা যাত্রা বলতে কী বোঝায় এবং 2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে তার সাথে এর সম্পর্ক কী?

​গুন্ডিচা মন্দিরে নয় দিন থাকার পর ভগবান জগন্নাথের শ্রীমন্দিরে বা নিজ গৃহে ফিরে আসাকে ‘বহুদা যাত্রা’ বা উল্টো রথ বলা হয়। যাঁরা জানতে চান 2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে, তাঁদের জানিয়ে রাখি যে, ২০২৬ সালের রথযাত্রার মূল তারিখের (জুলাইয়ের মাঝামাঝি) ঠিক নয় দিন পর এই বহুদা যাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।

​সুনা বেশ কী এবং এটি রথযাত্রার কোন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়?

​সুনা বেশ হলো ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রাকে খাঁটি সোনার বিপুল অলঙ্কারে সাজানোর একটি ঐশ্বরিক রূপ। বহুদা যাত্রার মাধ্যমে রথগুলো শ্রীমন্দিরের সিংহদুয়ারে ফিরে আসার পর, একাদশী তিথিতে রথের ওপরেই দেবতাদের এই মহামূল্যবান স্বর্ণালঙ্কারে সাজানো হয়, যা দেখতে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড় হয়।

​নীলাদ্রি বিজে কী এবং কেন ভগবান জগন্নাথ দেবী লক্ষ্মীকে রসগোল্লা খেতে দেন?

​নীলাদ্রি বিজে হলো রথ থেকে দেবতাদের শ্রীমন্দিরের রত্নবেদিতে পুনঃপ্রবেশের অনুষ্ঠান। মন্দিরে প্রবেশের সময় দেবী লক্ষ্মী রাগের বশে দরজা বন্ধ করে দিলে, তাঁর মানভঞ্জন করতে এবং অভিমান ভাঙাতে ভগবান জগন্নাথ তাঁকে মিষ্টি রসগোল্লা উপহার দেন। এরপর দেবী লক্ষ্মী দরজা খুলে দিলে দেবতারা মন্দিরে প্রবেশ করেন এবং রথযাত্রা উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

রথযাত্রা ২০২৬ – তৃতীয় পর্ব (ইতিহাস, রথ নির্মাণ কৌশল এবং সামাজিক প্রভাবের বিস্তারিত বিবরণ):

​প্রথম দুটি পর্বে আমরা বিশদে আলোচনা করেছি যে 2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে, এবং পাশাপাশি শ্রীক্ষেত্র পুরী, ময়ূরভঞ্জ ও দিল্লির রথযাত্রার দিনক্ষণ, গুন্ডিচা যাত্রা, হেরা পঞ্চমী, এবং নীলাদ্রি বিজে সম্পর্কে জেনেছি। বিশেষ করে যারা জানতে আগ্রহী যে পুরীর রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে কিংবা বারিপদা রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে, তাদের জন্য আগের পর্বগুলো ছিল অত্যন্ত কার্যকরী। এই তৃতীয় পর্বে আমরা প্রবেশ করব রথযাত্রা উৎসবের গভীরে—এর প্রাচীন ইতিহাস, রথ নির্মাণের সেই অসামান্য ও প্রাচীন কারিগরি কৌশল, এবং এই উৎসব কীভাবে সমাজকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে, সেইসব অজানা এবং আকর্ষণীয় তথ্যের জগতে।

​রথযাত্রা উৎসবের প্রাচীন ইতিহাস এবং পৌরাণিক প্রেক্ষাপট

​রথযাত্রা ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দিনক্ষণ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন, কারণ এটি হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। তবে স্কন্দ পুরাণ, ব্রহ্ম পুরাণ, এবং কপিল সংহিতার মতো প্রাচীন হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলোতে রথযাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর এক পরম ভক্ত। তিনি স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন যে শ্রীক্ষেত্রে (পুরী) ভগবানের এক বিশেষ দারু মূর্তি (কাঠের মূর্তি) প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

​তাঁর স্ত্রী, রানি গুন্ডিচার অসীম ভক্তির কারণেই ভগবান জগন্নাথ বছরে একবার তাঁর জন্মস্থানে বা মাসির বাড়িতে যাওয়ার জন্য রথে আরোহণ করেন বলে বিশ্বাস করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, একাদশ শতকে গঙ্গা রাজবংশের রাজা অনন্তবর্মন চোলগঙ্গদেবের আমলে বর্তমান পুরীর শ্রীমন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং পরবর্তীকালে রাজা অনঙ্গভীম দেবের রাজত্বকালে তা সম্পন্ন হয়। এরপর থেকেই রথযাত্রা উৎসব একটি বিশাল আকার ধারণ করে এবং রাজপরিবারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এটি ওড়িশার প্রধান জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়।

​রথ নির্মাণের অনন্য কারিগরি কৌশল: পেরেকহীন প্রাচীন স্থাপত্যের বিস্ময়

​পুরীর রথযাত্রার সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং বিস্ময়কর দিক হলো এর রথ নির্মাণের প্রক্রিয়া। প্রতি বছর সম্পূর্ণ নতুন করে তিনটি বিশালাকার রথ তৈরি করা হয়, এবং এর জন্য কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি বা সাধারণ লোহার পেরেকের ব্যবহার করা হয় না। বংশপরম্পরায় নিযুক্ত বিশেষ কারিগর বা ‘মহারাণা’-রা অত্যন্ত নিষ্ঠা ও কঠোর নিয়ম মেনে এই রথগুলো নির্মাণ করেন।

​যাঁরা জানতে চাইছেন 2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে, তাঁদের জেনে রাখা ভালো যে রথযাত্রার মূল উৎসবের প্রায় আড়াই মাস আগে, পবিত্র অক্ষয় তৃতীয়ার দিন থেকেই রথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে যায়।

  • রথ নির্মাণের কাঠের উৎস এবং কাঠ সংগ্রহ: রথ নির্মাণের জন্য মূলত ফাসি, ধৌরা এবং অশন নামক বিশেষ জাতের কাঠ ব্যবহার করা হয়। এই কাঠগুলো ওড়িশার দশপল্লা বা নয়াগড়ের নির্দিষ্ট জঙ্গল থেকে অত্যন্ত পবিত্রতার সাথে সংগ্রহ করে পুরীতে আনা হয়। কাঠ চেরাইয়ের জন্য করাতকলের ব্যবহার শুরু হয় সরস্বতী পূজার দিন থেকে, আর অক্ষয় তৃতীয়া থেকে শুরু হয় রথের চাকা এবং মূল কাঠামো তৈরির কাজ।
  • কোনো লোহা বা পেরেকের ব্যবহার নেই: সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রায় ৪৫ ফুট উঁচু এবং একাধিক টন ওজনের এই রথগুলো তৈরি করতে কোনো লোহার পেরেক, নাট বা বল্টু ব্যবহার করা হয় না। প্রাচীন ‘জয়েন্ট’ বা খাঁজকাটা পদ্ধতিতে কাঠের সাথে কাঠ জুড়ে এই বিশাল রথগুলো তৈরি করা হয়। চাকার কেন্দ্রস্থল বা ‘তুম্ব’ তৈরি করা হয় অত্যন্ত শক্ত ফাসি কাঠ দিয়ে, যাতে রথ চলার সময় কোনোভাবেই তা ভেঙে না পড়ে।

​তিনটি রথের নিজস্ব পরিচিতি: নন্দীঘোষ, তালধ্বজ এবং দর্পদলন

​পুরীর রথযাত্রায় তিনটি আলাদা রথ ব্যবহার করা হয় এবং প্রতিটি রথের নিজস্ব নাম, রং, উচ্চতা এবং বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

​১. নন্দীঘোষ (ভগবান জগন্নাথের রথ): ভগবান শ্রী জগন্নাথের রথের নাম ‘নন্দীঘোষ’ বা ‘গরুড়ধ্বজ’। এই রথটি সবার চেয়ে বড় এবং এর উচ্চতা প্রায় ৪৫.৬ ফুট। এই রথে মোট ১৬টি বিশাল চাকা থাকে। নন্দীঘোষ রথের আচ্ছাদন বা কাপড়ের রং হয় লাল এবং হলুদ (পীতবর্ণ)। এই রথের রক্ষক হলেন স্বয়ং গরুড় এবং সারথির নাম দারুক।

​২. তালধ্বজ (প্রভু বলভদ্রের রথ): বড় ভাই বলভদ্রের রথের নাম ‘তালধ্বজ’। এর উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট এবং এতে ১৪টি চাকা থাকে। এই রথের আচ্ছাদনের রং হয় লাল এবং সবুজ। তালধ্বজ রথের রক্ষক হলেন বাসুদেব এবং এর সারথির নাম মাতলি।

​৩. দর্পদলন (দেবী সুভদ্রার রথ): আদরের বোন সুভদ্রা দেবীর রথের নাম ‘দর্পদলন’, ‘দেবদলন’ বা ‘পদ্মধ্বজ’। এর উচ্চতা প্রায় ৪৪.৬ ফুট এবং এতে ১২টি চাকা থাকে। দেবী সুভদ্রার রথের আচ্ছাদনের রং হয় লাল এবং কালো। এই রথের রক্ষক হলেন জয়দুর্গা এবং সারথির নাম অর্জুন।

রথের বৈশিষ্ট্যনন্দীঘোষ (জগন্নাথ)তালধ্বজ (বলভদ্র)দর্পদলন (সুভদ্রা)
চাকার সংখ্যা১৬টি১৪টি১২টি
আচ্ছাদনের রংলাল ও হলুদলাল ও সবুজলাল ও কালো
সারথির নামদারুকমাতলিঅর্জুন
রথের রক্ষকগরুড়বাসুদেবজয়দুর্গা

ছেরাপহঁরা প্রথা: রাজা এবং প্রজার সমানাধিকারের এক আধ্যাত্মিক বার্তা

​রথযাত্রার দিন একটি অত্যন্ত বিশেষ এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রথা পালিত হয়, যার নাম ‘ছেরাপহঁরা’। তিনটি রথে ভগবান আসীন হওয়ার পর, পুরীর বর্তমান গজপতি মহারাজ (যাঁকে ভগবানের প্রথম সেবক বা আদ্য সেবক মনে করা হয়) একটি পালকিতে করে রথের সামনে আসেন। তিনি অত্যন্ত ভক্তিভরে সোনার হাতল দেওয়া একটি ঝাড়ু দিয়ে রথের চারপাশ পরিষ্কার করেন এবং চন্দন জল ছেটান।

​এই প্রথাটির একটি গভীর সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, জগন্নাথ দেবের সামনে রাজা থেকে শুরু করে একজন সাধারণ ঝাড়ুদার বা প্রজা—সবাই সমান। ভগবানের চোখে মানুষের কোনো সামাজিক মর্যাদা বা অহংকারের দাম নেই, আছে কেবল ভক্তি। এই বিনয়ের বার্তাটিই ছেরাপহঁরা প্রথার মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। যাঁরা আগামী দিনে পুরীতে গিয়ে দেখতে চান যে পুরীর রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে, তাঁরা এই ছেরাপহঁরা প্রথাটি স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পেলে নিজেদের ধন্য মনে করবেন।

​রথযাত্রা এবং সমাজ: সাম্যবাদ ও জাতপাতের বেড়াজাল ভাঙার উৎসব

​হিন্দু ধর্মে বিভিন্ন মন্দিরে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনেক সময় নানা ধরনের বিধি-নিষেধ বা জাতপাতের ভেদাভেদ দেখা যায়। কিন্তু ভগবান জগন্নাথের রথযাত্রা এই সমস্ত বেড়াজাল ভেঙে এক সাম্যবাদী সমাজের বার্তা দেয়। রথযাত্রার দিন ভগবান স্বয়ং গর্ভগৃহের রত্নবেদী ছেড়ে রাজপথে নেমে আসেন শুধুমাত্র তাঁর অগণিত ভক্তদের দর্শন দেওয়ার জন্য।

​এই দিন কে উচ্চবর্ণ, কে নিম্নবর্ণ, কে ধনী, আর কে দরিদ্র—তার কোনো বিচার থাকে না। লক্ষ লক্ষ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রথের দড়ি টানেন। দড়ি টানার সময় পাশের মানুষটি কোন ধর্মের বা বর্ণের, তা কেউ জিজ্ঞেস করে না। রথের দড়ি একবার ছুঁয়ে দেখার জন্য মানুষের মধ্যে যে আবেগ এবং ভক্তি দেখা যায়, তা ভারতের বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের এক অনবদ্য উদাহরণ। এই কারণেই রথযাত্রাকে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব না বলে, একটি গণ-উৎসব বা মহামিলন মেলা বলা হয়ে থাকে।

​ময়ূরভঞ্জের বারিপদা রথযাত্রার ঐতিহাসিক পটভূমি এবং নারী ক্ষমতায়ন

​পুরীর পরেই আমরা ওড়িশার যে রথযাত্রা নিয়ে সবচেয়ে বেশি চর্চা করি, তা হলো বারিপদার রথযাত্রা। যাঁদের মনে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যে বারিপদা রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে, তাঁরা জেনে রাখুন যে ১৭ই জুলাই ২০২৬-এর জন্য এখন থেকেই ময়ূরভঞ্জ জেলায় সাজো সাজো রব। ১৫৭৫ সালে মহারাজা বৈদ্যনাথ ভঞ্জ এই রথযাত্রার প্রচলন করেছিলেন, যাতে তাঁর সাম্রাজ্যের যে সমস্ত সাধারণ মানুষ পুরী যেতে পারেন না, তাঁরা যেন নিজের এলাকায় বসেই জগন্নাথ দেবের দর্শন লাভ করতে পারেন।

​প্রথম পর্বে আমরা যেমন আলোচনা করেছি, বারিপদার রথযাত্রা নারী ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৯৭৫ সাল থেকে দেবী সুভদ্রার রথ শুধুমাত্র মহিলারাই টানেন। এই প্রথাটি সমাজে নারীদের অধিকার, সম্মান এবং সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি বিশাল এবং নীরব বিপ্লব। যখন হাজার হাজার মহিলা ‘জয় জগন্নাথ’ এবং ‘মা সুভদ্রা’ ধ্বনি দিয়ে রথের দড়ি টানেন, তখন সেই দৃশ্য যেকোনো মানুষের মনে এক গভীর আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক শিহরণ জাগিয়ে তোলে।

​দিল্লির ত্যাগরাজ জগন্নাথ মন্দির: প্রবাসে সনাতন সংস্কৃতির এক টুকরো শ্রীক্ষেত্র

​দিল্লির মতো একটি অতি ব্যস্ত, আধুনিক এবং বহুজাতিক শহরে রথযাত্রার মতো একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী উৎসব পালন করা মোটেও সহজ কাজ নয়। কিন্তু ত্যাগরাজ জগন্নাথ মন্দির কমিটি এবং হাজার হাজার প্রবাসী ওড়িয়া ও বাঙালি ভক্তদের ঐকান্তিক চেষ্টায় এটি আজ সম্ভব হয়েছে।

​যাঁরা দিল্লিতে থাকেন এবং জানতে চান 2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে, তাঁদের জন্য এই মন্দিরটি আক্ষরিক অর্থেই এক টুকরো শ্রীক্ষেত্র। ষাটের দশকে যখন এই মন্দিরটি তৈরি হয়, তখন এর উদ্দেশ্য ছিল প্রবাসে থাকা মানুষের মনে সনাতন ধর্ম এবং সংস্কৃতির বীজ বপন করা। আজ সেই ছোট্ট উদ্যোগটি একটি মহীরুহে পরিণত হয়েছে। দিল্লির রথযাত্রায় রথের নকশা থেকে শুরু করে পুজো, পহণ্ডি, এবং গুন্ডিচা যাত্রা—সবকিছুই পুরীর প্রাচীন নিয়ম মেনেই নিখুঁতভাবে পালন করার চেষ্টা করা হয়। এর ফলে উত্তর ভারতের মানুষরাও জগন্নাথ সংস্কৃতির মহান আদর্শের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।

​রথযাত্রা ২০২৬ – তৃতীয় পর্বের কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

​পুরীর রথ নির্মাণে কোন কোন বিশেষ কাঠ ব্যবহার করা হয় এবং তা কোথা থেকে আনা হয়?

​পুরীর রথ নির্মাণের জন্য মূলত ফাসি, ধৌরা এবং অশন জাতের কাঠ ব্যবহার করা হয়। এই বিশেষ কাঠগুলো ওড়িশার দশপল্লা বা নয়াগড়ের নির্দিষ্ট জঙ্গল থেকে অত্যন্ত পবিত্রতা ও রীতিনীতি মেনে সংগ্রহ করে আনা হয়।

​রথ নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিস্ময়কর কারিগরি দিকটি কী?

​রথ নির্মাণের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, ৪৫ ফুট উঁচু এবং বিশালাকার এই তিনটি রথ তৈরি করতে কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি বা সাধারণ লোহার পেরেক, নাট বা বল্টু ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ প্রাচীন খাঁজকাটা পদ্ধতিতে কাঠের সাথে কাঠ জুড়ে এটি তৈরি করা হয়।

​ছেরাপহঁরা প্রথাটি কী এবং এর সামাজিক ও আধ্যাত্মিক বার্তাটি কী?

​ছেরাপহঁরা প্রথা হলো পুরীর গজপতি মহারাজের সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথের চারপাশ পরিষ্কার করা। এর মাধ্যমে এই বার্তাই দেওয়া হয় যে, ভগবান জগন্নাথের সামনে রাজা এবং প্রজা, বা উচ্চ-নিচের কোনো ভেদাভেদ নেই; ভক্তির কাছে সবাই সমান।

​বারিপদা রথযাত্রায় নারী ক্ষমতায়নের কোন বিশেষ প্রথাটি পালিত হয়?

​যারা জানতে চান বারিপদা রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে, তাদের জেনে রাখা উচিত যে ১৯৭৫ সাল থেকে বারিপদায় দেবী সুভদ্রার রথ (দর্পদলন) শুধুমাত্র মহিলারাই টানেন। এটি সমাজে নারী ক্ষমতায়ন এবং নারী শক্তির প্রতি এক বিশাল সম্মান প্রদর্শনের অদ্বিতীয় প্রথা।

​দিল্লির ত্যাগরাজ জগন্নাথ মন্দিরের রথযাত্রা প্রবাসীদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

​দিল্লির ত্যাগরাজ মন্দিরের রথযাত্রা প্রবাসীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তাদের নিজস্ব শিকড় এবং সনাতন সংস্কৃতির সাথে যুক্ত রাখে। আধুনিক রাজধানী শহরে বসেও তাঁরা পুরীর মতো আবেশ পান এবং নিজেদের মধ্যে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন দৃঢ় করতে পারেন।

রথযাত্রা ২০২৬ – চতুর্থ ও শেষ পর্ব (বিশ্বব্যাপী প্রভাব, ইসকন, মহাপ্রসাদ এবং আধ্যাত্মিক দর্শন):

​প্রথম তিনটি পর্বে আমরা জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার ইতিহাস, রথ নির্মাণের অবাক করা কৌশল, গুন্ডিচা যাত্রা, হেরা পঞ্চমী এবং বহুদা যাত্রার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এর পাশাপাশি আমরা জেনেছি যে 2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে, এবং বিশেষ করে পুরীর রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছেবারিপদা রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে। এই বিশাল ও তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদনের চতুর্থ এবং চূড়ান্ত পর্বে আমরা আলোচনা করব কীভাবে শ্রীক্ষেত্রের এই উৎসব আজ গণ্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, রথযাত্রার পেছনের সুগভীর আধ্যাত্মিক দর্শন কী, এবং জগন্নাথ দেবের ‘মহাপ্রসাদ’-এর সেই ঐশ্বরিক মাহাত্ম্য নিয়ে, যা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।

​ইসকন (ISKCON) এবং বিশ্বজুড়ে রথযাত্রার প্রসার: শ্রীক্ষেত্র থেকে সান ফ্রান্সিসকো

​একসময় রথযাত্রা মূলত ওড়িশা, বাংলা এবং ভারতের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই উৎসব এক বিশ্বজনীন রূপ লাভ করে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রয়েছে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইসকনের (ISKCON) প্রতিষ্ঠাতা আচার্য এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের। ১৯৬৭ সালে তিনি যখন আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরে প্রথমবার রথযাত্রার আয়োজন করেন, তখন তা ছিল পশ্চিমা বিশ্বের কাছে এক অভাবনীয় দৃশ্য।

​আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যদি আপনি আমেরিকার নিউইয়র্ক, ব্রিটেনের লন্ডন, ফ্রান্সের প্যারিস বা রাশিয়ার মস্কোর মতো শহরগুলোতে খোঁজ নেন যে সেখানে 2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে, তাহলে অবাক হবেন যে সেখানকার স্থানীয় ভক্তরাও পঞ্জিকা মিলিয়ে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছেন। বিদেশি ভক্তরা, যাঁরা হয়তো কোনোদিন ভারতে আসেননি, তাঁরাও পরম ভক্তিভরে খোল-করতাল বাজিয়ে, ‘হরে কৃষ্ণ’ মহামন্ত্র এবং ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনি দিয়ে রাজপথে রথের দড়ি টানেন।

​জগন্নাথ শব্দের অর্থ হলো ‘জগতের নাথ’ বা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি। ইসকনের রথযাত্রা উৎসব এই নামের প্রকৃত অর্থকে সার্থক করেছে। আজ শুধু ভারতীয়রাই নন, সারা বিশ্বের অগণিত জগন্নাথ ভক্ত অত্যন্ত আগ্রহের সাথে জানতে চান যে পুরীর রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে, যাতে তাঁরাও দূরদেশ থেকে শ্রীক্ষেত্রে এসে এই মহামিলন তীর্থে অংশ নিতে পারেন বা অন্তত নিজেদের শহরে একই দিনে রথযাত্রা পালন করতে পারেন।

​মহাপ্রসাদের ঐশ্বরিক মাহাত্ম্য এবং আনন্দবাজারের সাম্যবাদ

​পুরীর শ্রীমন্দির এবং রথযাত্রা উৎসবের কথা উঠলে ‘মহাপ্রসাদ’ বা ‘অভড়া’-র কথা উল্লেখ না করলে আলোচনা সম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। হিন্দু ধর্মে অন্যান্য মন্দিরে দেবতাকে যা নিবেদন করা হয় তাকে সাধারণত ‘প্রসাদ’ বলা হয়, কিন্তু একমাত্র পুরীতে জগন্নাথ দেবকে যা নিবেদন করা হয় তা ‘মহাপ্রসাদ’ হিসেবে পরিচিত।

​পুরীর মন্দিরের রান্নাঘর বা ‘রন্ধনশালা’ (Rosaighara) বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম রান্নাঘর। এখানে ৭৫২টি মাটির উনুন রয়েছে এবং প্রতিদিন শত শত পাণ্ডা বা রাঁধুনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ভগবানের জন্য ৫৬ রকমের ভোগ বা ‘ছাপ্পান্ন ভোগ’ রান্না করেন। এই রান্নার পদ্ধতিও অত্যন্ত বিস্ময়কর। মাটির পাত্র বা ‘কুদুয়া’-তে করে সাতটি পাত্র পর পর উনুনের ওপর সাজিয়ে রাখা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সবচেয়ে ওপরে থাকা পাত্রের খাবার সবার আগে সেদ্ধ হয় এবং সবচেয়ে নিচের পাত্রের খাবার সবার শেষে সেদ্ধ হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, মা মহালক্ষ্মী স্বয়ং এই রন্ধনশালায় উপস্থিত থেকে রান্না তদারকি করেন।

  • আনন্দবাজার: যেখানে জাতপাতের কোনো ভেদাভেদ নেই শ্রীমন্দিরের ভেতরে থাকা ‘আনন্দবাজার’ হলো এমন একটি পবিত্র স্থান, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত একসঙ্গে বসে এই মহাপ্রসাদ গ্রহণ করেন। রথযাত্রার সময় এই আনন্দবাজারের ভিড় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এখানে কোনো উচ্চবর্ণ বা নিম্নবর্ণের ভেদাভেদ নেই। এক পংক্তিতে বসে একজন ব্রাহ্মণ এবং একজন দলিত একই পাত্র থেকে মহাপ্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন। এমনকি কারও এঁটো প্রসাদ গ্রহণ করাকেও এখানে পরম সৌভাগ্য বলে মনে করা হয়। শুকনো মহাপ্রসাদ বা ‘নির্মাল্য’ ভক্তরা সযত্নে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যান এবং যেকোনো শুভ কাজে বা মুমূর্ষু রোগীর মুখে এই নির্মাল্য দেওয়া হয়।

​রথযাত্রার সুগভীর আধ্যাত্মিক দর্শন এবং জীবনবোধ

​বাইরে থেকে দেখলে রথযাত্রা হলো তিনটি কাঠের রথে চড়ে ভগবানের এক মন্দির থেকে অন্য মন্দিরে যাওয়ার উৎসব। কিন্তু হিন্দু দর্শন, বিশেষ করে কঠোপনিষদ অনুযায়ী, এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে মানবজীবনের এক সুগভীর আধ্যাত্মিক তত্ত্ব।

​কঠোপনিষদে বলা হয়েছে, “আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেব তু। বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি মনঃ প্রগ্রহমেব চ।।”

অর্থাৎ, এই মানবদেহ হলো একটি রথস্বরূপ। আমাদের ভেতরে থাকা ‘আত্মা’ হলো এই রথের যাত্রী। আমাদের ‘বুদ্ধি’ হলো রথের সারথি বা চালক, ‘মন’ হলো ঘোড়ার লাগাম, এবং আমাদের পাঁচটি ‘ইন্দ্রিয়’ (চোখ, কান, নাক, জিভ, ত্বক) হলো রথটি টেনে নিয়ে যাওয়া শক্তিশালী ঘোড়া।

​এই তত্ত্ব অনুযায়ী, রথযাত্রা আসলে আমাদের জীবনযাত্রারই এক প্রতীকী রূপ। আমরা যদি আমাদের মন এবং ইন্দ্রিয়গুলোকে সঠিক বুদ্ধিরূপী সারথির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তবেই আমাদের আত্মারূপী যাত্রী তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে। ভগবান জগন্নাথ যখন রথে আসীন হন, তখন তিনি আমাদের এই বার্তাই দেন যে, জীবনের এই যাত্রাপথে তিনি আমাদের চিরস্থায়ী সঙ্গী। আমাদের শুধু ভক্তি এবং সমর্পণের মাধ্যমে তাঁর ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। রথের দড়ি টানা আসলে নিজের ভেতরের অহংকার এবং কুপ্রবৃত্তিকে টেনে বের করে ভগবানের চরণে সমর্পণ করার এক প্রতীকী আচার।

​২০২৬ সালের রথযাত্রার জন্য প্রস্তুতি এবং বিশেষ সতর্কতা

​ইতিমধ্যেই আমরা বিভিন্ন পর্বে আলোচনা করেছি যে 2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে (সম্ভাব্য ১৬-১৭ জুলাই) এই উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। যাঁরা এই বিশাল উৎসবে সশরীরে উপস্থিত থাকার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য কিছু বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

​যেহেতু এই সময় পুরীতে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়, তাই ট্রেনের টিকিট এবং হোটেল বুকিং অনেক আগে থেকেই করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। যাঁরা বিশেষভাবে জানতে চাইছেন পুরীর রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে, তাঁরা পঞ্জিকা এবং শ্রীমন্দিরের অফিশিয়াল ঘোষণার দিকে নজর রাখবেন, কারণ তিথির সামান্য হেরফেরে তারিখ এক-আধদিন এদিক-ওদিক হতে পারে।

​অন্যদিকে, যাঁরা ওড়িশার দ্বিতীয় শ্রীক্ষেত্র অর্থাৎ ময়ূরভঞ্জে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন এবং খুঁজছেন বারিপদা রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে, তাঁদের জন্য ১৭ই জুলাই ২০২৬ (17th July 2026) তারিখটি সরকারিভাবে নির্ধারিত রয়েছে। বারিপদার রথযাত্রায় যেহেতু মা সুভদ্রার রথ শুধুমাত্র মহিলারা টানেন, তাই মহিলা পুণ্যার্থীদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত বিশেষ এবং নিরাপদ গন্তব্য হতে পারে। এছাড়া দিল্লির ত্যাগরাজ জগন্নাথ মন্দিরেও যাঁরা রথযাত্রা দেখতে চান, তাঁরাও জুলাইয়ের মাঝামাঝি এই পবিত্র দিনে সেখানে উপস্থিত থাকতে পারেন।

​দিল্লির ত্যাগরাজ জগন্নাথ মন্দির এবং উত্তর ভারতে জগন্নাথ সংস্কৃতির প্রসার

​এই বৃহৎ প্রতিবেদনের উপসংহার টানার আগে দিল্লির ত্যাগরাজ জগন্নাথ মন্দিরের অবদানের কথা আরও একবার স্মরণ করা প্রয়োজন। ভারতের রাজধানী শহর দিল্লিতে জগন্নাথ সংস্কৃতির প্রসার ঘটানোর ক্ষেত্রে এই মন্দিরটি এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে।

​দিল্লির মতো শহরে যেখানে আধুনিকতার চরম ব্যস্ততা, সেখানে আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে যখন ভগবান জগন্নাথের রথ রাজপথে বেরিয়ে আসে, তখন মনে হয় যেন স্বয়ং শ্রীক্ষেত্র উঠে এসেছে রাজধানীর বুকে। প্রবাসী ওড়িয়া, বাঙালি এবং উত্তর ভারতীয় ভক্তরা মিলেমিশে একাকার হয়ে যান এই উৎসবে। এখানকার রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করলে বোঝা যায় যে ভগবান জগন্নাথ শুধু কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজ্য বা ভাষার মানুষের নন, তিনি সমগ্র মানবজাতির।

​উপসংহার: জগন্নাথ সংস্কৃতির মূল নির্যাস এবং মহামিলনের বার্তা

​পরিশেষে বলা যায়, রথযাত্রা কেবল একটি উৎসব নয়, এটি হলো এক পরম আধ্যাত্মিক অনুভূতির নাম। ভগবান জগন্নাথের বড় বড় দুই গোল চোখ প্রমাণ করে যে তিনি বিশ্বের প্রতিটি মানুষের সুখ-দুঃখের দিকে সর্বদা নজর রাখছেন। তাঁর অসম্পূর্ণ হাত দুটির অর্থ হলো, তিনি নিরাকার হয়েও ভক্তদের আলিঙ্গন করার জন্য সদা প্রস্তুত।

​২০২৬ সালের রথযাত্রা আমাদের জীবনে নতুন আশা, আনন্দ এবং পারষ্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধের বার্তা নিয়ে আসুক। আপনি পুরীতে থাকুন, বারিপদায় থাকুন, দিল্লিতে থাকুন বা বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, রথের দড়িতে একবার টান দেওয়ার সুযোগ পেলে জানবেন, আপনার জীবনের পরম সৌভাগ্যের দরজা খুলে গেছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং অহংকারের সমস্ত বেড়াজাল ছিন্ন করে, আসুন আমরা সবাই মিলে এক কণ্ঠে উচ্চারণ করি—“জয় জগন্নাথ!”

​রথযাত্রা ২০২৬ – চতুর্থ ও শেষ পর্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

​ইসকন (ISKCON) কীভাবে রথযাত্রা উৎসবকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তুলেছে?

​১৯৬৭ সালে ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোতে প্রথম রথযাত্রার সূচনা করেন। এরপর থেকে নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিসসহ বিশ্বের বহু প্রধান শহরে ইসকনের উদ্যোগে অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে রথযাত্রা পালিত হয়, যা জগন্নাথ সংস্কৃতিকে বিশ্বজনীন করে তুলেছে।

​পুরীর মন্দিরে মহাপ্রসাদ রান্না করার ক্ষেত্রে কোন বিশেষ অলৌকিক প্রথাটি দেখা যায়?

​পুরীর রন্ধনশালায় মাটির পাত্র বা ‘কুদুয়া’ ব্যবহার করে সাতটি পাত্র পর পর উনুনের ওপর সাজিয়ে রান্না করা হয়। এর সবচেয়ে বড় অলৌকিক দিকটি হলো, আগুনের সবচেয়ে কাছে থাকা নিচের পাত্রের খাবার সেদ্ধ হওয়ার আগেই, সবার ওপরে থাকা পাত্রের খাবার আগে সেদ্ধ হয়ে যায়।

​আনন্দবাজার কী এবং এর সামাজিক তাৎপর্য কতটা গভীর?

​পুরীর শ্রীমন্দিরের ভেতরে অবস্থিত ‘আনন্দবাজার’ হলো এমন একটি পবিত্র স্থান যেখানে ভক্তরা মহাপ্রসাদ গ্রহণ করেন। এর সামাজিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর কারণ, এখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা উচ্চ-নিচের কোনো ভেদাভেদ থাকে না। এক পংক্তিতে বসে ব্রাহ্মণ এবং দলিত একই পাত্র থেকে মহাপ্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন।

​আধ্যাত্মিক দর্শন অনুযায়ী রথ, সারথি এবং যাত্রীর রূপক অর্থ কী?

​কঠোপনিষদের আধ্যাত্মিক দর্শন অনুযায়ী, আমাদের মানবদেহ হলো একটি ‘রথ’, আত্মা হলো সেই রথের ‘যাত্রী’, আমাদের বুদ্ধি হলো ‘সারথি’, মন হলো ‘লাগাম’, এবং ইন্দ্রিয়গুলো হলো রথ টানা ‘ঘোড়া’। এই রূপকের মাধ্যমে জীবনে আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ভগবানের প্রতি সমর্পণের বার্তা দেওয়া হয়েছে।

​2026 সালে রথযাত্রা কবে পড়েছে এবং টিকিট বুকিংয়ের জন্য কোন তারিখটি মাথায় রাখা উচিত?

​সনাতন পঞ্জিকা অনুসারে, ২০২৬ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি (সম্ভাব্য ১৬-১৭ জুলাই) রথযাত্রা পালিত হবে। যাঁরা বিশেষ করে জানতে চাইছেন পুরীর রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে বা বারিপদা রথযাত্রা 2026 সালে কত তারিখ পড়েছে (১৭ জুলাই ২০২৬), তাঁদের এই জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়টি মাথায় রেখেই এখন থেকে ট্রেনের টিকিট এবং হোটেল বুকিংয়ের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।

এক নজরে

Leave a Comment

Created with ❤