রাতদখল এবং প্রতিবাদের আবহে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল কলকাতার রাজপথ। আরজি কর কাণ্ড নিয়ে রাজ্যজুড়ে চলা আন্দোলনের মাঝেই এবার নির্বাচন কমিশনের দপ্তরের সামনে নজিরবিহীন জমায়েত এবং বিক্ষোভের ঘটনা চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। খোদ মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বা সিইও (CEO)-এর অফিসের সামনে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকদের এই অবস্থান বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গভীর রাতে ধুন্ধুমার পরিস্থিতি তৈরি হয়। একদিকে যখন আন্দোলনকারীরা বিচারের দাবিতে সরব, ঠিক তখনই পালটা বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে প্রশাসনিক মহলে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মনোজ আগরওয়ালের দপ্তর থেকে রীতিমতো কড়া বার্তা জারি করা হয়েছে।
এক নজরে
নির্বাচন কমিশনের সামনে বিক্ষোভ এবং রাতের শহরের উত্তেজনা
কলকাতার আকাশবাণী ভবনের সামনে যেখানে নির্বাচন কমিশনের মূল কার্যালয় অবস্থিত, সেখানে হঠাৎ করেই শয়ে শয়ে তৃণমূল সমর্থক এসে জড়ো হন। তাঁদের অভিযোগ ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। আরজি কর নিয়ে বিরোধীদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে এবং শান্তি বজায় রাখার দাবিতে এই জমায়েত বলে জানা গিয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের সামনে বিক্ষোভ চলকালীন পরিস্থিতি যে এতটা জটিল হবে, তা বোধহয় পুলিশের কাছেও আন্দাজ ছিল না। রাতের অন্ধকারে মশাল এবং পোস্টার হাতে তৃণমূলের কর্মীরা লাগাতার স্লোগান দিতে থাকেন, যার জেরে ওই এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হয়।
এই জমায়েত নিয়ে শাসকদলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক উস্কানি নয়, বরং একতরফা অপপ্রচারের প্রতিবাদ জানাতেই তাঁরা রাস্তায় নেমেছেন। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা এই অবস্থানের ফলে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি দপ্তরের স্বাভাবিক কাজেও ব্যাঘাত ঘটে। পুলিশ এসে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা পিছু হটতে রাজি হননি। এই গোটা ঘটনাটি নিয়ে প্রশাসনের অন্দরে ব্যাপক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে কারণ একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সামনে এভাবে রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়া বা জমায়েত করার আইনত কিছু বিধি নিষেধ থাকে।
মনোজ আগরওয়ালের দপ্তরের কড়া নির্দেশ এবং আইনি পদক্ষেপ
তৃণমূলের এই জমায়েত এবং উত্তাল পরিস্থিতির খবর পৌঁছানো মাত্রই সক্রিয় হয়ে ওঠে সিইও অফিস। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালের দপ্তরের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠিয়ে জানানো হয় যে, সরকারি কাজের জায়গায় এই ধরনের বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। নির্বাচন কমিশনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি করার জন্য কোনো আগাম অনুমতি নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, সংরক্ষিত এলাকায় বা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবনের সামনে এই ধরনের জমায়েত আইনত দণ্ডনীয়।
কমিশনের পক্ষ থেকে পুলিশ প্রশাসনকেও কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে দ্রুত সেই এলাকা খালি করে দেওয়া হয়। মনোজ আগরওয়ালের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কমিশনের কাজ একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে চলে এবং কোনো রাজনৈতিক চাপ বা বাইরের গোলমাল তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে না। যদি অবিলম্বে এই জমায়েত না সরে, তবে আইনি পথে হাঁটার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এরপরেই বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু হয়।
তৃণমূল কর্মীদের দাবিপত্র এবং প্রশাসনের সাথে সংঘাত
বিক্ষোভকারীদের প্রধান লক্ষ্য ছিল নির্বাচন কমিশনের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়া। তাঁদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী দলগুলো রাজ্যে অশান্তি ছড়াতে চাইছে এবং কমিশনকে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে হবে। যদিও মাঝরাতে কমিশনের দপ্তরে কোনো আধিকারিক না থাকায় উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। কর্মীরা দাবি তোলেন, সরাসরি শীর্ষ আধিকারিকদের সাথে কথা বলতে হবে। এই কেন্দ্রবিন্দুতেই সংঘাত বাধে পুলিশের সঙ্গে। পুলিশ আধিকারিকরা বুঝিয়ে বলেন যে, স্মারকলিপি দেওয়ার নির্দিষ্ট সময় থাকে এবং এভাবে বিশৃঙ্খলা করে কোনো সুরাহা হবে না।
দীর্ঘক্ষণ ধস্তাধস্তি এবং বাকবিতণ্ডার পর পুলিশ পরিস্থিতি কিছুটা আয়ত্তে আনে। নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের প্রবেশ পথ ঘিরে ব্যারিকেড করে দেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীরা সেখানে বসেই স্লোগান দিতে শুরু করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি না থাকলেও যেকোনো বড় জমায়েতের ওপর আগে থেকেই নজরদারি ছিল। এই ঘটনাটি কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে জলঘোলা শুরু হয়েছে, কারণ শাসকদলের সমর্থকরা কেন হঠাৎ একটি কেন্দ্রীয় বা সাংবিধানিক সংস্থার দপ্তরে হানা দিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিরোধীরা।
নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে বিক্ষোভ নিয়ে কিছু জরুরি প্রশ্ন
কেন এই বিক্ষোভ কর্মসূচি সংগঠিত হয়েছিল?
মূলত আরজি কর কাণ্ড নিয়ে বিরোধীদের ক্রমাগত আন্দোলনের পালটা জবাব দিতে এবং রাজ্যের শান্তি বজায় রাখার আবেদন নিয়ে তৃণমূল কর্মীরা সিইও দপ্তরে গিয়েছিলেন।
মনোজ আগরওয়ালের দপ্তরের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালের দপ্তর এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেছে। তারা পরিষ্কার জানিয়েছে যে, কমিশনের দপ্তরের সামনে আইন লঙ্ঘন করে কোনো প্রতিবাদ সহ্য করা হবে না।
বিক্ষোভকারীরা কি তাদের স্মারকলিপি জমা দিতে পেরেছে?
রাত হওয়ার কারণে সরাসরি কোনো বড় আধিকারিকের সাথে দেখা না হলেও, পুলিশের মধ্যস্থতায় তাদের অভাব-অভিযোগের কথা জানানো হয়, তবে বড় কোনো আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি জমা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এই জমায়েতের ফলে কি সাধারণ মানুষের সমস্যা হয়েছে?
হ্যাঁ, গভীর রাতে আকাশবাণী ভবন এবং সংলগ্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের যাতায়াত এবং অফিসগামী বা জরুরি পরিষেবার ক্ষেত্রে কিছুটা বাধার সৃষ্টি হয়েছিল।
রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী পরিস্থিতি
এই পুরো ঘটনাটি নিয়ে বিরোধীরা তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে। তাঁদের মতে, মূল ইস্যু থেকে মানুষের নজর ঘোরাতে শাসকদল এখন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। তবে তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, গণতন্ত্রে প্রতিবাদের অধিকার সবার আছে এবং তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবেই তাঁদের অভিযোগ জানাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু কমিশন দপ্তরের কড়া মনোভাব এবং মনোজ আগরওয়ালের নির্দেশের পর শাসকদল কিছুটা হলেও পিছু হটতে বাধ্য হয়।
রাত বাড়ার সাথে সাথে পুলিশি পাহারায় বিক্ষোভকারীদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তবে নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে জমায়েত এবং এই টানাপোড়েন আগামী কয়েকদিন রাজ্য রাজনীতিতে যে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। পুলিশ বর্তমানে ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখছে এবং অনুমতি ছাড়া জমায়েত করার জন্য উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।


