বিধানসভা ভোটের প্রস্তুতি: এক দফার প্রস্তাব নিয়ে দিল্লি যাচ্ছেন সিইও

বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করতে দিল্লি পাড়ি দিচ্ছেন রাজ্যের সিইও মনোজ আগরওয়াল। এক দফায় ভোটের প্রস্তাব এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ভোটার তালিকার বিলম্ব নিয়ে কমিশনের সাথে হবে ম্যারাথন বৈঠক। বিস্তারিত জানুন।

রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের দামামা ধীরে ধীরে বাজতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক উত্তাপের মাঝেই এবার নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করতে দিল্লি যাচ্ছেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ভোটার তালিকা নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা এবং নির্বাচনের দফা নিয়ে জল্পনার মধ্যেই এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। আগামী মঙ্গলবার তিনি রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন এবং সেখানে নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্তাদের সাথে মুখোমুখি বৈঠকে বসবেন। রাজ্যের রাজনৈতিক মহল এখন এই বৈঠকের ফলাফলের দিকেই তাকিয়ে আছে।

​CEO Manoj Agarwal Delhi Visit for Assembly Election:

​পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন আর মাত্র কয়েক মাসের অপেক্ষা। ইতিমধ্যেই তামিলনাড়ু, কেরল, অসম এবং পুদুচেরির সাথে এরাজ্যেও ভোট হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে ভোট হয় এবং মার্চের শুরুতেই নির্ঘণ্ট ঘোষণা করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে রাজ্যের নির্বাচনী পরিকাঠামো কতটা প্রস্তুত, তা খতিয়ে দেখতেই মনোজ আগরওয়ালের এই দিল্লি সফর। তবে শুধু রুটিন বৈঠক নয়, রাজ্যের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোটার তালিকার কাজ কতদূর এগোল, সেসব নিয়েও বিশদ আলোচনা হবে বলে সিইও দপ্তর সূত্রে খবর।

​এক দফায় ভোট করানোর প্রস্তাব ও কমিশনের ভাবনা

​সিইও দপ্তরের একটি বিশেষ সূত্র জানিয়েছে যে, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্য কমিশন এক দফায় ভোট করানোর পক্ষে সওয়াল করতে পারে। ২০২১ সালে আট দফায় নির্বাচন করিয়ে কমিশন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। তৎকালীন করোনা পরিস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদী ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রশ্ন তুলেছিলেন। এবার যাতে সেই বিতর্ক এড়ানো যায় এবং কম সময়ে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করা যায়, সেই লক্ষ্যেই এক দফার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ভারতের নির্বাচন কমিশন। তারা রাজ্যের স্পর্শকাতর এলাকা এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর লভ্যতা বিচার করেই দফার সংখ্যা ঠিক করবে।

​সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ভোটার তালিকা নিয়ে নতুন জট

​মনোজ আগরওয়ালের দিল্লি সফরে ভোটার তালিকা বা SIR (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হবে সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে। সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি নির্দেশ দিয়েছে যে, ভোটার তালিকার স্ক্রুটিনি বা যাচাই পর্বের জন্য ইআরও-দের আরও ৭ দিন সময় দিতে হবে। এর ফলে ২১শে ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের যে কথা ছিল, তা এখন বিশ বাঁও জলে। সিইও দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৪ই ফেব্রুয়ারির পর আরও এক সপ্তাহ ধরে চলবে যাচাই পর্ব। তারপর জেলা স্তর থেকে তথ্য আসবে এবং সবশেষে সিইও দপ্তর চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করবে। ফলে নির্ধারিত সময়ের থেকে অনেকটা পিছিয়ে যেতে পারে তালিকা প্রকাশের কাজ।

​কমিশনের কড়া অবস্থান এবং রাজ্যকে বার্তা

​নির্বাচন কমিশন এর আগে রাজ্যের কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল, যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেও জলঘোলা হয়েছে। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, কমিশনের কাজে বাধা সৃষ্টি করা বরদাস্ত করা হবে না। মনোজ আগরওয়ালের এই বৈঠকে কমিশনের পক্ষ থেকে রাজ্যকে আরও কড়া বার্তা দেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে যারা ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে গাফিলতি বা পক্ষপাতিত্ব করছেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ আসতে পারে। সুষ্ঠু এবং অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে কমিশন যে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে, তা এই বৈঠকের এজেন্ডায় স্পষ্ট থাকবে।

​অতীতের নির্বাচনের দফা বিন্যাস এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট

​পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এখানে দফার সংখ্যা নিয়ে বরাবরই বিতর্ক থেকেছে। ২০১১ সালে যখন তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে, তখন ৬ দফায় ভোট হয়েছিল। এরপর ২০১৬ সালে ৭ দফায় এবং ২০২১ সালে রেকর্ড ৮ দফায় নির্বাচন হয়। বিরোধীরা সব সময়ই দাবি করে এসেছে যে, রাজ্যে পর্যাপ্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে নির্বাচন করা হোক। অন্যদিকে শাসক দল দীর্ঘমেয়াদী নির্বাচনের বিরোধিতা করে। এবার যদি সত্যিই এক বা দুই দফায় নির্বাচন হয়, তবে তা হবে এক নজিরবিহীন ঘটনা। দিল্লির বৈঠকে মনোজ আগরওয়াল রাজ্যের এই সেন্টিমেন্ট কমিশনের সামনে তুলে ধরতে পারেন।

​ভোটার তালিকা সংশোধনের বর্তমান অবস্থা

​রাজ্যজুড়ে এখন ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR চলছে। বুথ লেভেল অফিসাররা (BLO) বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এই প্রক্রিয়ার সময়সীমা বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা ধীর গতিতে কাজ এগোচ্ছে। মনোজ আগরওয়াল দিল্লিতে গিয়ে এই বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করবেন এবং নতুন সময়সীমা অনুযায়ী কবে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা সম্ভব, তার একটি রূপরেখা পেশ করবেন। কমিশনের সবুজ সংকেত পেলেই রাজ্যে পুরোদমে আবার তালিকা তৈরির কাজ শেষ করার দিকে এগোবে সিইও দপ্তর।

​নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার সম্ভাব্য সময়

​দিল্লির এই বৈঠকের পরেই হয়তো নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। সাধারণত মার্চের প্রথম সপ্তাহেই নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এবার ভোটার তালিকা পিছিয়ে যাওয়ার কারণে নির্ঘণ্ট ঘোষণাতেও সামান্য দেরি হতে পারে। তবে কমিশন চাইছে মে মাসের মধ্যেই সমস্ত নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ করতে। তাই খুব দ্রুত সব বকেয়া কাজ শেষ করার নির্দেশ নিয়েই মনোজ আগরওয়াল রাজ্যে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

​বিধানসভা নির্বাচন ও সিইও-র সফর নিয়ে কিছু জরুরি প্রশ্ন

​এক দফায় ভোট হলে সাধারণ মানুষের সুবিধা না অসুবিধা?

​এক দফায় ভোট হলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া খুব দ্রুত শেষ হয়, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কম প্রভাব ফেলে। তবে নিরাপত্তার দিক থেকে চ্যালেঞ্জ বেড়ে যায়, কারণ একদিনে পুরো রাজ্যে পর্যাপ্ত বাহিনী মোতায়েন করা কঠিন হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

​২১শে ফেব্রুয়ারি ভোটার তালিকা না বেরোলে কী সমস্যা হবে?

​ভোটার তালিকা দেরি হলে নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণাতেও দেরি হতে পারে। এছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বুথ ভিত্তিক প্রস্তুতি নিতে কম সময় পাবে। তবে নির্ভুল তালিকার স্বার্থে এই দেরি মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

​মনোজ আগরওয়াল কি নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক করবেন?

​না, নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক করার পূর্ণ এখতিয়ার ভারতের নির্বাচন কমিশনের। মনোজ আগরওয়াল রাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে শুধু প্রস্তাব এবং প্রস্তুতির রিপোর্ট দেবেন। কমিশন সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে।

​রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের এই দিল্লি সফর বিধানসভা নির্বাচনের আগে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এক দফার ভোটের প্রস্তাব কমিশন মেনে নেয় কি না এবং ভোটার তালিকার জট কীভাবে খোলে, সেদিকেই এখন সবার নজর।

Leave a Comment

🌍
Created with ❤