আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রাজ্যে প্রকাশিত হচ্ছে ৯৪ লক্ষ ভোটারের লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি তালিকা

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রাজ্যে প্রকাশিত হতে চলেছে লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি তালিকা। ৯৪ লক্ষ ভোটারের তথ্যে অসঙ্গতি নিয়ে এবার বুথ ও বিধানসভা ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ লিস্ট প্রকাশ করতে চলেছে নির্বাচন কমিশন। বিস্তারিত জেনে নিন।

লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি তালিকা (Logical Discrepancy List)

সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশের পর অবশেষে রাজ্যে লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি তালিকা প্রকাশের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এই তালিকা প্রকাশ নিয়ে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তবে নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর মিলেছে যে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই এই পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ্যে আসতে চলেছে। প্রায় ৯৪ লক্ষ ভোটারের নাম সম্বলিত এই তথ্যগত অসঙ্গতিপূর্ণ তালিকাটি বুথ এবং বিধানসভা ভিত্তিক প্রস্তুত করা হচ্ছে। শনিবার রাতের মধ্যেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রাথমিক প্রস্তুতি সেরে ফেলা হবে বলে জানা গিয়েছে, যা নিয়ে বর্তমানে রাজ্যজুড়ে প্রশাসনিক তৎপরতা তুঙ্গে।

রাজ্যে প্রকাশিত হতে চলেছে লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি তালিকা, জেনে নিন বিস্তারিত খুঁটিনাটি

​পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবার বড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে নির্বাচন কমিশন। সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল যে, এসআইআর (SIR) মামলার প্রেক্ষিতে যে সমস্ত ভোটারদের তথ্যে গরমিল বা অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছে, তাদের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করতে হবে। এই লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি তালিকা প্রকাশের জন্য ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও, আইনি ও প্রযুক্তিগত কিছু কারণে তা সামান্য পিছিয়ে যায়। তবে এখন খবর পাওয়া যাচ্ছে যে, কমিশন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই কাজের প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে ফেলেছে।

​তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের প্রায় ৯৪ লক্ষ ভোটারের তথ্যে বিভিন্ন ধরনের ভুল বা অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের নামের তালিকা এবার সাধারণ মানুষের দেখার জন্য প্রকাশ করা হবে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বুথ স্তর থেকে শুরু করে বিধানসভা ভিত্তিক এই তথ্য বিন্যাস করার কাজ চলছে যাতে সাধারণ ভোটারদের বুঝতে কোনো অসুবিধা না হয়। এই তালিকায় নাম থাকা মানেই যে ভোটাধিকার চলে যাওয়া, তা নয়; বরং তথ্যের ভুল সংশোধনের একটি প্রক্রিয়া এটি।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ এবং লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি তালিকা নিয়ে প্রশাসনিক তৎপরতা

​গত ১৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। সেই রায়ে পরিষ্কার জানানো হয়েছিল যে, রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সির তালিকা বা তথ্যে গরমিল থাকা ভোটারদের নাম প্রকাশ করতে হবে। শীর্ষ আদালতের এই নির্দেশের পরই রাজ্য প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। ডিজি এবং রাজ্যের মুখ্যসচিবকে দ্রুত এই নির্দেশ কার্যকর করার জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

​শনিবার রাতের মধ্যেই বুথ এবং বিধানসভা ভিত্তিক এই অসঙ্গতির তালিকা প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার কথা। এরপর আগামী তিন দিনের অর্থাৎ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রাম পঞ্চায়েত অফিস, ব্লক অফিস এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড অফিসগুলোতে এই লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া হবে। এতে সাধারণ মানুষ সহজেই দেখে নিতে পারবেন কার কার তথ্যে সমস্যা রয়েছে। কমিশনের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো ভোটার তালিকায় থাকা ডুপ্লিকেট নাম বা ভুল তথ্য সরিয়ে একটি নির্ভুল ডাটাবেস তৈরি করা।

তথ্যগত গরমিল থাকা ভোটারদের নিয়ে কমিশনের পরিকল্পনা

​কমিশন সূত্রে খবর, বর্তমানে বাজারে বা বিভিন্ন জায়গায় যে সমস্ত তালিকা ঘুরছে, সেগুলোর সবকটি কিন্তু কমিশন স্বীকৃত নয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনেই কেবল সরকারিভাবে এই তালিকা প্রকাশ করা হবে। যদি কোনো ভোটারের মনে হয় যে তার নাম ভুলবশত এই তালিকায় এসেছে, তবে তিনি নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে অভিযোগ জানাতে পারবেন। প্রয়োজনে জেলা নির্বাচনী আধিকারিক বা ডিইও-দের সাথে এই বিষয়ে কথা বলবে কমিশন।

​নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো তুলে ধরা হলো:

বিষয়বিবরণ
মোট ভোটারের সংখ্যা (প্রায়)৯৪ লক্ষ
প্রকাশের সম্ভাব্য সময়আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে
তালিকার ভিত্তিবুথ এবং বিধানসভা ভিত্তিক
প্রকাশের স্থানপঞ্চায়েত, ব্লক এবং ওয়ার্ড অফিস
আইনি নির্দেশ দাতাভারতের সুপ্রিম কোর্ট

কেন এই লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে?

​অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে যে হঠাৎ করে কেন এত বড় তালিকা প্রকাশ করার প্রয়োজন পড়ল? মূলত এসআইআর (SIR) সংক্রান্ত মামলায় ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় একই ব্যক্তির নাম একাধিক বুথে রয়েছে অথবা তথ্যে বড় রকমের ভুল আছে। এই ধরনের গরমিল দূর করতেই লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সির তালিকা তৈরির নির্দেশ দেয় আদালত। এটি ভোটারদের অধিকার হরণ নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করার একটি প্রচেষ্টা।

​এই তালিকায় যে বিষয়গুলো প্রধানত খতিয়ে দেখা হচ্ছে:

  • ​একই ছবি বা নাম একাধিক ভোটারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে কি না।
  • ​ঠিকানা বা বয়সের ক্ষেত্রে কোনো আকাশ-পাতাল পার্থক্য বা লজিক্যাল ভুল আছে কি না।
  • ​মৃত ব্যক্তি বা স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম তালিকায় থেকে গিয়েছে কি না।

তালিকা প্রকাশের পরবর্তী ধাপসমূহ কী কী?

​১. তালিকাটি স্থানীয় সরকারি অফিসগুলোতে নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে দেওয়া হবে।

২. ভোটাররা তাদের নাম সেই তালিকায় আছে কি না তা যাচাই করার সুযোগ পাবেন।

বিজ্ঞাপন

৩. যাদের নাম থাকবে, তাদের সঠিক তথ্য দিয়ে পুনরায় আবেদন করার বা সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি তালিকা সম্পর্কে সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি বলতে আসলে কী বোঝায়?

​ভোটার কার্ডের তথ্যে যদি কোনো যুক্তিসঙ্গত ভুল থাকে (যেমন একই মানুষের নাম দুবার থাকা বা বয়সের অসঙ্গতি), তবে তাকেই লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি বা তথ্যের গরমিল বলা হয়। এই ভুলগুলো চিহ্নিত করে যে তালিকা হয়, তাই হলো লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি তালিকা

এই তালিকায় নাম থাকলে কি ভোট দেওয়া যাবে না?

​তালিকায় নাম থাকা মানেই ভোটার কার্ড বাতিল হওয়া নয়। এর অর্থ হলো আপনার তথ্যে কোনো ত্রুটি রয়েছে যা সংশোধন করা প্রয়োজন। কমিশন এই বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশিকা জারি করবে। তবে তথ্যের সঠিকতা প্রমাণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে।

কোথায় এই তালিকা দেখা যাবে?

​সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, এই তালিকা আপনার নিকটবর্তী গ্রাম পঞ্চায়েত অফিস, ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিস (BDO) এবং মিউনিসিপ্যালিটি বা ওয়ার্ড অফিসে দেখতে পাওয়া যাবে। এছাড়া আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এটি জনসমক্ষে আনার ব্যবস্থা করছে কমিশন।

ভোটারদের জন্য জরুরি কিছু সতর্কতা

​বর্তমান সময়ে বিভিন্ন অসাধু চক্র ভুল তালিকা ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। তাই কমিশন বারবার সতর্ক করছে যে, কেবলমাত্র সরকারি দপ্তরে টাঙানো বা কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি তালিকা-ই বিশ্বাসযোগ্য। বেসরকারি কোনো সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আতঙ্কিত হবেন না। যদি আপনার এলাকায় তালিকায় কোনো বড় ধরনের গরমিল লক্ষ্য করেন, তবে সরাসরি বিডিও বা মহকুমা শাসকের দপ্তরে যোগাযোগ করুন।

​রাজ্য নির্বাচন কমিশন তাদের প্রস্তুতিতে জানিয়েছে যে, তারা প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে প্রতিটি বুথ স্তরে নিখুঁতভাবে এই কাজ সম্পন্ন করছে। এই বিশাল সংখ্যক ভোটারের তথ্য যাচাই করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ হলেও, আদালতের নির্দেশে তা এখন বাধ্যতামূলক। সুতরাং, আগামী কয়েক দিন রাজ্যের ভোটারদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।

Leave a Comment