Kolkata Airport Bomb Threat : সাতসকালে কলকাতা বিমানবন্দরে তীব্র আতঙ্ক, শিলংগামী বিমানে বোমার হুমকি ঘিরে হুলস্থুল কান্ড, সপ্তাহের শেষেই বড়সড় বিপত্তি কলকাতা বিমানবন্দরে। শনিবার সকালে আচমকাই খবর আসে, ইন্ডিগোর একটি বিমানে বোমা রাখা আছে। মুহূর্তে শোরগোল পড়ে যায় বিমানবন্দর চত্বরে। একের পর এক সাইরেনের শব্দ আর পুলিশের তৎপরতায় যাত্রীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তড়িঘড়ি বিমানটিকে নিরাপদ দূরত্বে বা আইসোলেশন বে-তে নিয়ে যাওয়া হয় এবং যাত্রীদের নামিয়ে শুরু হয় চিরুনি তল্লাশি। ঘটনাটি ঘটেছে কলকাতা থেকে শিলংগামী ইন্ডিগোর ৬ই ৭৯১ নম্বর বিমানে।
এক নজরে
কলকাতা বিমানবন্দরে বোমাতঙ্ক: মাঝ আকাশে নয়, মাটি ছোঁয়ার আগেই ত্রাস
শনিবার সকাল তখন সবে আলো ফুটছে, যাত্রীরা একে একে বিমানে উঠে নিজেদের সিটে বসছেন। গন্তব্য মেঘালয়ের রাজধানী শিলং। কিন্তু বিমান ওড়ার আগেই ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। বিমানের শৌচালয় বা টয়লেটের ভিতর থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার হয়, আর তাতেই লেখা ছিল বিমানে বোমা রয়েছে! এই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তেই কলকাতা বিমানবন্দরে বোমাতঙ্ক গ্রাস করে সবাইকে। পাইলট তৎক্ষণাৎ এটিসি বা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে বিষয়টি জানান। কোনো ঝুঁকি না নিয়ে সিআইএসএফ এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বিমানটিকে আর রানওয়ের দিকে এগোতে দেওয়া হয়নি, বরং সেটিকে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় জনমানবহীন আইসোলেশন বে-তে।
যাত্রীদের চোখেমুখে তখন শুধুই প্রশ্ন আর ভয়। কী হচ্ছে, কেন বিমান ছাড়ছে না—এই নিয়ে যখন গুঞ্জন শুরু হয়েছে, তখনই ঘোষণা করা হয় যে যান্ত্রিক বা নিরাপত্তা জনিত কারণে বিমানটি ছাড়তে দেরি হবে। কিন্তু আসল খবরটি জানাজানি হতেই যাত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। যদিও নিরাপত্তারক্ষীরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেন।
কেন বারবার টার্গেট হচ্ছে বিমানবন্দর?
সাম্প্রতিককালে বা গত কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে একের পর এক ভুয়ো হুমকির খবর আসছে। কখনও ইমেল মারফত, আবার কখনও বা উড়ো ফোনে এই ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তবে এবারের ঘটনাটি একটু অন্যরকম। সরাসরি বিমানের ভিতরেই পাওয়া গিয়েছে হুমকি চিঠি। এটি নিছকই কোনো মশকরা নাকি এর পিছনে বড় কোনো নাশকতার ছক রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। কলকাতা বিমানবন্দরে বোমাতঙ্ক ছড়ানোর অভিযোগে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে যে, শেষ কে বা কারা ওই শৌচালয় ব্যবহার করেছিলেন।
বোম স্কোয়াড ও ডগ স্কোয়াডের চিরুনি তল্লাশি
বিমানটিকে আইসোলেশন বে-তে নিয়ে যাওয়ার পর শুরু হয় আসল অ্যাকশন। ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছে যায় বোম স্কোয়াড এবং স্নিফার ডগ। বিমানের প্রতিটি কোণা, যাত্রীদের ফেলে যাওয়া প্রতিটি ব্যাগ এবং কার্গো বা মালপত্র তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়। সিআইএসএফ-এর উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা গোটা অপারেশনটি তদারকি করেন।
যাত্রীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে নিচে নামানো হয় সবাইকে। টার্মিনাল বিল্ডিংয়ের একটি নিরাপদ স্থানে তাঁদের বসিয়ে রাখা হয়। কিন্তু আতঙ্ক কিছুতেই পিছু ছাড়ছিল না। অনেকেই ফোনে বাড়ির লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলেন। কলকাতা বিমানবন্দরে বোমাতঙ্ক খবরটি টিভিতে ব্রেকিং নিউজ হতেই যাত্রীদের পরিজনরাও উদগ্রীব হয়ে পড়েন।
নিচে নিরাপত্তার খাতিরে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল তার একটি তালিকা দেওয়া হলো:
- যাত্রীদের হ্যান্ডব্যাগ ও চেক-ইন লাগেজ পুনরায় স্ক্যান করা।
- বিমানের প্রতিটি সিট, ওভারহেড বিন এবং ককপিট পরীক্ষা করা।
- যাত্রীদের মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পুনরায় চেক করা।
- বিমানবন্দরের ওই নির্দিষ্ট জোনটিকে কর্ডন করে রাখা বা ঘিরে ফেলা।
- অগ্নিনির্বাপক দল এবং অ্যাম্বুলেন্সকে স্ট্যান্ডবাই রাখা।
প্রশ্ন উত্তর: যাত্রীদের মনে হাজারও জিজ্ঞাসা
বিমানটিতে কি সত্যিই কোনো বিস্ফোরক পাওয়া গিয়েছে?
এখন পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, দীর্ঘ তল্লাশির পরেও বিমানটিতে সন্দেহজনক কোনো বিস্ফোরক বা বোমা পাওয়া যায়নি। মনে করা হচ্ছে, এটি একটি ‘হোক্স’ বা ভুয়ো হুমকি ছিল। তবে নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুযায়ী, যতক্ষণ না পর্যন্ত সম্পূর্ণ ক্লিয়ারেন্স বা ছাড়পত্র মিলছে, ততক্ষণ বিমানটিকে ওড়ার অনুমতি দেওয়া হবে না। এই ধরনের ভুয়ো খবরের জেরে যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়, কিন্তু সুরক্ষার সঙ্গে কোনো আপোষ করা সম্ভব নয়।
হুমকি চিঠিটি কে রেখেছিল?
এটি এখনও তদন্তসাপেক্ষ বিষয়। বিমানের শৌচালয়ে চিঠিটি পাওয়া গিয়েছে, তাই সন্দেহ করা হচ্ছে কোনো যাত্রী বা গ্রাউন্ড স্টাফের কেউ এই কাজ করে থাকতে পারে। পুলিশ হাতের লেখা এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে। দোষী প্রমাণিত হলে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাঁকে ‘নো ফ্লাই লিস্ট’-এ অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। কলকাতা বিমানবন্দরে বোমাতঙ্ক তৈরির এই চেষ্টা অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ।
যাত্রীদের ভোগান্তি ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ
স্বাভাবিকভাবেই, এই ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সকালের ফ্লাইট ধরে অনেকেই শিলংয়ে জরুরি কাজে বা ভ্রমণে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এই ঘটনায় তাঁদের শিডিউল বা সময়সূচি পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের তরফে যাত্রীদের খাবার এবং জল সরবরাহ করা হলেও, মানসিক চাপ ছিল অনেক বেশি।
অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন। কেউ লিখেছেন, “ভেবেছিলাম শান্তিতে শিলং যাব, কিন্তু শুরুতেই এই বিভীষিকা।” আবার কেউ লিখেছেন, “নিরাপত্তাই সবার আগে, কিন্তু এই ধরনের ভুয়ো হুমকিদাতাদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।” কলকাতা বিমানবন্দরে বোমাতঙ্ক যেন যাত্রীদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছিল। তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের আশ্বস্ত করেছে যে, তাঁদের সুরক্ষাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
| ফ্লাইট তথ্য | বিবরণ |
| বিমান সংস্থা | ইন্ডিগো (IndiGo) |
| ফ্লাইট নম্বর | 6E 791 |
| রুট | কলকাতা (CCU) থেকে শিলং (SHL) |
| ঘটনার সময় | শনিবার সকাল |
| উদ্ধার হওয়া বস্তু | হুমকিপুর্ণ চিরকুট |
| বর্তমান অবস্থা | তল্লাশি চলছে / যাত্রীরা সুরক্ষিত |
সুরক্ষা ব্যবস্থায় কি কোনো ফাঁক ছিল?
প্রশ্ন উঠছে, এত কড়াকড়ির পরেও কীভাবে বিমানের শৌচালয়ে এমন হুমকি চিঠি পৌঁছল? বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সিকিউরিটি চেকিং কি তবে যথেষ্ট নয়? সিআইএসএফ বা সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স অবশ্য দাবি করেছে যে তাদের চেকিংয়ে কোনো ত্রুটি ছিল না। কোনো যাত্রী হয়তো চেকিং পার হয়ে বিমানে ওঠার পর পকেট থেকে কাগজ বের করে এই কান্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু কাগজের টুকরো নিয়ে বিমানে ওঠা তো আর নিষিদ্ধ নয়, তাই এটি আটকানো কঠিন।
তবে এই ঘটনার পর কলকাতা বিমানবন্দরে বোমাতঙ্ক এড়াতে নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে চেক-ইন কাউন্টার এবং বোর্ডিং গেটগুলোতে নজরদারি দ্বিগুণ করা হয়েছে। সন্দেহভাজন যাত্রীদের ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে করণীয়
বারবার এমন ভুয়ো হুমকির জেরে কেবল যাত্রীদের হয়রানি হয় না, বিমান সংস্থাগুলোরও বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়। জ্বালানি খরচ, পার্কিং চার্জ, এবং কর্মীদের বাড়তি সময়—সব মিলিয়ে ক্ষতির অঙ্ক নেহাত কম নয়। সরকার ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে কঠোর আইন আনার চিন্তাভাবনা করছে।
বিমান যাত্রার সময় যাত্রীদেরও কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়। নিচে কিছু সুরক্ষা বিধির তালিকা দেওয়া হলো যা মেনে চলা জরুরি:
- অপরিচিত কারো কাছ থেকে কোনো প্যাকেট বা ব্যাগ গ্রহণ করবেন না।
- বিমানবন্দরে বা বিমানের ভিতর সন্দেহজনক কিছু দেখলে তৎক্ষণাৎ ক্রু বা নিরাপত্তাকর্মীদের জানান।
- শৌচালয় বা সিটের পকেটে কোনো অ্য়াকাশ্নেবল বস্তু বা চিরকুট দেখলে হাত দেবেন না।
- ইয়ারফোন কানে দিয়ে সবসময় বসে থাকবেন না, ঘোষণার দিকে মন দিন।
- আতঙ্কিত হয়ে হুড়োহুড়ি করবেন না, কেবিন ক্রু-এর নির্দেশ মেনে চলুন।
পরবর্তী পদক্ষেপ ও তদন্ত
আপাতত বিমানটিকে টেক-অফ বা ওড়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। যাত্রীদের হয়তো অন্য কোনো বিমানে গন্তব্যে পাঠানো হতে পারে অথবা নিরাপত্তা ক্লিয়ারেন্স বা ছাড়পত্র মিললে ওই বিমানেই তাঁরা যাবেন। তবে ঘটনার আকস্মিকতায় অনেকেই যাত্রা বাতিল করার কথাও ভাবছেন। কলকাতা বিমানবন্দরে বোমাতঙ্ক যেন শনিবারের ছুটির মেজাজটাই মাটি করে দিল।
পুলিশ জানিয়েছে, তারা একটি মামলা রুজু করেছে এবং তদন্ত শুরু হয়েছে। এর আগে চেন্নাই, মুম্বাই এবং দিল্লির মতো বড় শহরগুলোতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, মানসিক বিকারগ্রস্ত কেউ বা স্রেফ মজা করার জন্য কিশোর বয়সের কেউ এই কাজ করেছে। কিন্তু বিমান পরিষেবার মতো সংবেদনশীল জায়গায় এই ‘মজা’ যে কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, তা হয়তো তারা বোঝে না।
রাজ্য প্রশাসনের তরফেও বিষয়টির খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। যাত্রীরা যাতে নিরাপদে এবং দ্রুত তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছতে পারেন, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। আপাতত দমদম বিমানবন্দরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে, তবে চাপা উত্তেজনা বা টেনশন এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
