কলকাতার মেয়র পদ থেকে ফিরহাদ হাকিমের ইস্তফা

দীর্ঘ জল্পনা ও বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে কলকাতা পুরসভার মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দিলেন ফিরহাদ হাকিম। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুমতি পাওয়ার পর চেয়ারপার্সন মালা রায়ের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। পুরসভার কাজে ক্রমাগত বাধা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তিনি আগের মতো কাজ করতে পারছিলেন না বলে ইস্তফার কারণ হিসেবে জানিয়েছেন বিদায়ী মেয়র।

Firhad Hakim resignation news পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক উত্তাল রাজনৈতিক আবহের মধ্যে কলকাতা পুরসভায় এক নজিরবিহীন ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন ঘটে গেল। সমস্ত জল্পনা ও দীর্ঘ টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে কলকাতা পুরসভার মেয়র পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্তফা দিলেন প্রবীণ তৃণমূল নেতা ফিরহাদ হাকিম। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে শাসক দলের বিপর্যয়ের পর থেকেই তাঁর এই পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র গুঞ্জন চলছিল। অবশেষে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবুজ সংকেত মেলার পরেই তিনি পুরসভার চেয়ারপার্সন মালা রায়ের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন। গত কয়েক দশকের মধ্যে কলকাতার পুরপ্রশাসনের শীর্ষ পদে এমন বড়সড় ওলটপালট আর দেখা যায়নি, যা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

ফিরহাদ হাকিমের আচমকা ইস্তফা ও নেপথ্যের আসল কারণ

কলকাতা পুরসভার অলিন্দে বেশ কিছুদিন ধরেই ফিরহাদ হাকিমের অবস্থান নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা চলছিল। বিশেষ করে রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে পুরসভার কাজে বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হচ্ছিল বলে দলীয় সূত্রে খবর। এই পরিস্থিতিতে নিজের সম্মান রক্ষা করে পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
ইস্তফা দেওয়ার পর প্রবীণ এই জননেতা জানান যে, সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে তিনি আগের মতো স্বাধীনভাবে এবং সঠিকভাবে কাজ করতে পারছিলেন না। পুরসভার কাজে ক্রমাগত বাধা আসায় এবং রাজ্য সরকারের সাথে সমন্বয়ের অভাবে তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই মানসিক চাপে ছিলেন। সেই কারণেই তিনি এই চরম পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবুজ সংকেত ও কুণাল ঘোষের বক্তব্য

তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশ এই ইস্তফার বিষয়টি আগেই সংবাদমাধ্যমের সামনে এনেছিলেন। দলের প্রবীণ বিধায়ক তথা মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বুধবার সন্ধ্যায় নবান্নে এক বৈঠক শেষে জানান যে, ফিরহাদ হাকিম নিজেই দলনেত্রীর কাছে সসম্মানে পদ থেকে সরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এর আগেও একাধিকবার ববি হাকিম পদত্যাগের অনুমতি চেয়েছিলেন, কিন্তু তখন তাঁকে বারণ করা হয়েছিল। তবে পুরসভার বর্তমান অচল অবস্থা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কথা বিবেচনা করে অবশেষে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এই আবেদনে সম্মতি প্রদান করেন। দলনেত্রীর অনুমোদন পাওয়ার পরেই পদত্যাগের প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত রূপ পায়।

ছোট লালবাড়িতে চরম অশান্তি এবং বিজেপির গেরুয়া ঝড়

কলকাতা পুরসভা বা ‘ছোট লালবাড়ি’-তে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে ধরনের নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তা এই পদত্যাগকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। কিছুদিন আগেই এক মাসিক অধিবেশনকে কেন্দ্র করে পুরসভার অন্দরে মেয়র ও চেয়ারপার্সনকে নিজেদের চেম্বারে ঢুকতে না দিয়ে তালাবন্ধ করে রাখার মতো মারাত্মক অভিযোগ উঠেছিল।
এর পাশাপাশি সম্প্রীতি পুরসভার এক কাউন্সিলর দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ায় দলের ভাবমূর্তি ধাক্কা খেয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে কলকাতার ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১০২টিতেই বিরোধী দল বিজেপি বিপুল ভোটে এগিয়ে রয়েছে। এই তীব্র গেরুয়া হাওয়া এবং পুরসভার ভেতরে কাউন্সিলরদের দলবদল ও ক্ষোভ সামাল দেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠছিল বিদায়ী মেয়রের পক্ষে।

তিন দশকের বিশ্বস্ততার অবসান ও কলকাতার ভবিষ্যৎ

তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকে ফিরহাদ হাকিম ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম প্রধান বিশ্বস্ত সেনাপতি। ২০১৮ সালে শোভন চট্টোপাধ্যায়ের আকস্মিক পদত্যাগের পর তিনি কলকাতার মেয়রের দায়িত্ব সামলান এবং ২০২১ সালে দ্বিতীয়বার এই পদে বসেন। প্রায় তিন দশক ধরে দলের সমস্ত সংকটে পাশে থাকা এই হেভিওয়েট সংখ্যালঘু মুখের বিদায় দলের জন্য এক মস্ত বড় ধাক্কা।
তাঁর এই চলে যাওয়ার পর কলকাতা পুরসভার ভবিষ্যৎ এখন কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কারণ আগামী ডিসেম্বর মাসেই কলকাতা পুরসভার সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগেই মেয়রের এই পদত্যাগ নিচুতলার কর্মীদের মনোবলকে অনেকটাই ভেঙে দিয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।

কেন হঠাৎ করে মেয়র পদ ছাড়তে চাইলেন ফিরহাদ হাকিম?

বিদায়ী মেয়রের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর পুরসভার স্বাভাবিক কাজকর্মে নানা ধরনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বাধা আসছিল। তিনি যেভাবে আগে সাবলীলভাবে কলকাতার নাগরিকদের পরিষেবা দিতে পারতেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা আর সম্ভব হচ্ছিল না বলেই তিনি সম্মানের সাথে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

এই পদত্যাগের পেছনে কুণাল ঘোষের ভূমিকা কী ছিল?

কুণাল ঘোষ মূলত দলের আনুষ্ঠানিক বার্তাটি সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, এই ইস্তফা কোনও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ফল নয়, বরং ফিরহাদ হাকিম নিজেই দলনেত্রীর কাছে সসম্মানে বিদায় নেওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিস্থিতি বিবেচনা করে সেই অনুমতি দিয়েছেন।

আগামী দিনে কলকাতা পুরসভার দায়িত্ব কে সামলাবেন?

ফিরহাদ হাকিমের ইস্তফা দেওয়ার পর পরবর্তী মেয়র কে হবেন, তা নিয়ে এখনও তৃণমূল কংগ্রেস বা পুরসভার তরফ থেকে কোনও নাম চূড়ান্ত করা হয়নি। চেয়ারপার্সন মালা রায় পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করার পর নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা বা নতুন মেয়র নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করবেন।

Leave a Comment

Created with ❤
Exit mobile version