বাংলার রাজনীতিতে ভোটার লিস্টের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি ভিডিও পোস্ট সেই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটার তালিকায় বড়সড় কারচুপির অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, নিয়মের ফাঁক গলিয়ে এবং ফর্ম ৬-এর অপব্যবহার করে ভোটার তালিকায় জালিয়াতি করা হচ্ছে, যা অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথে বড় অন্তরায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের একবার নির্বাচন কমিশন এবং শাসকদলের মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে।
এক নজরে
ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক পোস্ট
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে একটি ভিডিও শেয়ার করে চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন। তাঁর মতে, রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এক গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। ভিডিওটিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে সেখানে ভিনরাজ্যের বাসিন্দাদের নাম ঢোকানো হচ্ছে। অভিষেক স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন যে, বিজেপি নেতাদের নির্দেশে এবং নির্বাচন কমিশনের একাংশের মদতে এই অশুভ আঁতাত চলছে। ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ তুলে তিনি দেখিয়েছেন যে, উত্তরপ্রদেশ, বিহার বা রাজস্থানের মতো রাজ্য থেকে আসা ব্যক্তিদের নাম বাংলার ভোটার লিস্টে যুক্ত করা হচ্ছে।
অভিষেকের পোস্ট করা সেই ভিডিওতে ফর্ম ৬ (নতুন ভোটার হওয়ার আবেদনপত্র) নিয়ে কারচুপির কৌশল ফাঁস করার দাবি করা হয়েছে। তৃণমূলের দাবি, প্রায় ৩০ হাজার ভুয়ো ফর্ম ৬ জমা দিয়ে ভোটার তালিকায় নাম তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন যে, নির্বাচন কমিশন যদি নিরপেক্ষ হয়, তবে তারা কেন এই ধরনের জালিয়াতি রুখতে পারছে না?
ফর্ম ৬-এর অপব্যবহার এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির ছক
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো এলাকায় নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করতে গেলে ফর্ম ৬ জমা দিতে হয়। কিন্তু অভিষেকের অভিযোগ, এই ফর্মকেই হাতিয়ার করেছে বিরোধীরা। ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন যে, অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে আলাদা আলাদা নামে বা ঠিকানায় আবেদন করা হচ্ছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, কীভাবে বাল্ক বা একসাথে প্রচুর পরিমাণে আবেদনপত্র জমা পড়ছে কোনো রকম সঠিক ভেরিফিকেশন ছাড়াই।
তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, এই জালিয়াতি কেবল নতুন নাম তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। অন্যদিকে, রাজ্যের ভূমিপুত্র বা আদি বাসিন্দাদের নাম কৌশলে তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হচ্ছে বলেও অভিষেক দাবি করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে একজন আধিকারিক যাচাই না করেই এই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ ফর্মগুলো গ্রহণ করছেন? এই কারচুপির ফলে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ঘাসফুল শিবির। কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিষেক একে ‘গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ’ বলে অভিহিত করেছেন।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং সিইও অফিসে তৃণমূলের ডেপুটেশন
এই ভিডিওটি সামনে আসার পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের একটি প্রতিনিধি দল কলকাতার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (CEO) মনোজ আগরওয়ালের দপ্তরে গিয়ে প্রতিবাদ জানান। তাঁরা দাবি করেন, অবিলম্বে এই ভুয়ো ভোটারদের চিহ্নিত করতে হবে এবং দায়ী আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ নিয়ে কমিশনের দপ্তরে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়। অভিষেক সাফ জানিয়েছেন যে, তাঁরা রাজপথে যেমন লড়ছেন, তেমনই আইনি লড়াইও চালিয়ে যাবেন।
ইতিমধ্যে কমিশন সূত্রে জানানো হয়েছে যে, প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যুক্তি, ভিডিওতে যে তথ্য সামনে এসেছে তা অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। তৃণমূল সাংসদ আরও অভিযোগ করেছেন যে, ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বা ক্রিকেটার মহম্মদ শামির মতো ব্যক্তিত্বদেরও ছাড়া হয়নি, যা অত্যন্ত অবমাননাকর। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে কমিশনকে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
ভোটার তালিকায় জালিয়াতি নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভিডিওতে ঠিক কী দেখিয়েছেন?
ভিডিওটিতে দাবি করা হয়েছে যে, ফর্ম ৬-এর মাধ্যমে ভিনরাজ্যের বাসিন্দাদের নাম বাংলার ভোটার তালিকায় অবৈধভাবে ঢোকানো হচ্ছে এবং প্রচুর পরিমাণে জাল আবেদনপত্র জমা পড়ছে।
ফর্ম ৬ কী কাজে ব্যবহার করা হয়?
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, যখন কোনো ব্যক্তি প্রথমবার ভোটার হিসেবে নিজের নাম নথিভুক্ত করতে চান বা এক বিধানসভা থেকে অন্য বিধানসভায় নাম স্থানান্তর করতে চান, তখন তাঁকে ফর্ম ৬ পূরণ করতে হয়।
কেন এই কারচুপির অভিযোগ তোলা হচ্ছে?
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, বিজেপি নেতাদের কথায় নির্বাচন কমিশন বাংলার আদি ভোটারদের নাম বাদ দিচ্ছে এবং বাইরে থেকে আসা লোকেদের নাম তুলে ভোটের সমীকরণ বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
কমিশনের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
তৃণমূলের অভিযোগের পর কমিশন বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে বলে জানিয়েছে। এছাড়া ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় গাফিলতির অভিযোগে ইতিমধ্যে বেশ কিছু আধিকারিককে বদলিও করা হয়েছে।
আন্দোলনের পরবর্তী রূপরেখা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ভিডিও পোস্ট এবং তৎপরতা রাজ্যে এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করেছে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, প্রতিটি বুথ স্তরে তাঁদের কর্মীরা সতর্ক থাকবেন যাতে কোনো ভুয়ো ভোটার ভোট দিতে না পারে। ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ যদি প্রমাণিত হয়, তবে তা দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দেবে। অভিষেক মনে করেন, ভোটার লিস্টে যদি গরমিল থাকে, তবে সেই সরকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
অন্যদিকে বিরোধীরা এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। তাদের মতে, পরাজয় নিশ্চিত জেনে এখন থেকেই অজুহাত তৈরি করছে শাসকদল। তবে অভিষেকের পোস্ট করা ভিডিও এবং তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের দায় এখন নির্বাচন কমিশনের ওপর। বাংলার মানুষ এখন তাকিয়ে আছে কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। ভোটার তালিকা যদি সত্যিই কলঙ্কিত হয়ে থাকে, তবে তা আগামী দিনের গণতন্ত্রের জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবেই বিবেচিত হবে।