তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শারীরিক অবস্থা নিয়ে বর্তমানে রাজ্য রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সোনারপুরের কামালগাজিতে এক মৃত দলীয় কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে অনভিপ্রেত ঘটনার সম্মুখীন হন তিনি। এর পরেই আচমকা তাঁর শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং চিকিৎসার জন্য তাঁকে শহরের একাধিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাড়িতেই তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসকদের কড়া পর্যবেক্ষণে তাঁর বাড়িতেই অস্থায়ী হাসপাতালের মতো পরিকাঠামো তৈরি করে চিকিৎসা প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।
কেমন আছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়?
শনিবারের অনভিপ্রেত ঘটনার পর থেকেই ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখছেন চিকিৎসকেরা। জানা গিয়েছে, গত রাতে তাঁর মারাত্মক শারীরিক অস্বস্তি দেখা দিয়েছিল এবং রাতে তাঁর গা বমি-বমি ভাব ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কিছু সময় ধরে তাঁকে কৃত্রিম অক্সিজেন দিতে হয়েছিল। তৃণমূল নেতার শারীরিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী সমস্ত রকম প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
রাজনীতির আঙিনায় অত্যন্ত সক্রিয় এই যুব নেতার শারীরিক অবস্থা নিয়ে তাঁর অনুগামী এবং দলীয় কর্মীদের মধ্যে প্রবল উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। সোনারপুর থেকে ফেরার পথেই কামালগাছি সিগন্যালে তাঁর ওপর ডিম ও কাদা ছুড়ে হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে, যার জেরে তিনি প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক ধাক্কা পান। এর পরেই তাঁর শরীরে নানা উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে এবং দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ ও বর্তমান চিকিৎসা পদ্ধতি
আপাতত চিকিৎসকদের একটি বিশেষ দলের অধীনে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের চিকিৎসা চলছে। তাঁর শারীরিক দুর্বলতা ও অন্যান্য সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য স্যালাইন চালানো হচ্ছে। এর পাশাপাশি তাঁর শরীরে তীব্র যন্ত্রণার উপশমের জন্য চিকিৎসকেরা ব্যথার ওষুধ বা পেইন কিলার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
চিকিৎসার নিয়ম মেনে খাবার খাওয়ার আগে তাঁকে গ্যাসের ওষুধও সেবন করতে হচ্ছে। রাতেও খাবারের পর তাঁকে নির্দিষ্ট ব্যথার ওষুধ দেওয়া হয়েছে। যুব নেতার শারীরিক পরিস্থিতির ওপর ২৪ ঘণ্টা কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে যাতে নতুন করে কোনও জটিলতা তৈরি না হয়।
হাসপাতাল বিতর্ক ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মারাত্মক অভিযোগ
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শারীরিক অসুস্থতার পরেই তাঁকে কলকাতার বাইপাসের ধারের একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ, সেখানে প্রাথমিক পরীক্ষা ও দুই ঘণ্টা ইনটেনসিভ থেরাপি ইউনিট বা আইটিইউ-তে রাখার পর সামান্য কিছু ওষুধ দিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর পর অন্য একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালেও তাঁকে ভর্তি নেওয়া হয়নি বলে জানা গিয়েছে।
এই গোটা বিষয়টি নিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তিনি সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলে দাবি করেছেন যে, বিজেপি নেতাদের চাপ এবং পুলিশের কিছু আধিকারিকের কাছ থেকে আসা হুমকি ফোনের কারণেই কলকাতার নামী হাসপাতালগুলি অভিষেককে ভর্তি নিতে ভয় পেয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অসহায়তার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, চিকিৎসকেরা অত্যন্ত দুঃখিত হলেও চাপের মুখে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ঘরের ভেতরেই তৈরি হল অস্থায়ী হাসপাতাল
হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পর তৃণমূল নেত্রীর নির্দেশেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনকে কার্যত একটি মিনি হাসপাতালে রূপ দেওয়া হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, যেহেতু বাইরে চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করা হচ্ছে, তাই বাড়িই হবে এখন হাসপাতাল।
নেতার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে এবং পাশে দাঁড়াতে গত গভীর রাত পর্যন্ত তাঁর বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পাশাপাশি গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক শোভন চট্টোপাধ্যায়ও। বাড়িতেই সমস্ত জরুরি চিকিৎসার সরঞ্জাম এনে সাংসদের শারীরিক দেখভাল করা হচ্ছে।
কামালগাছি সিগন্যালে ঠিক কী ঘটেছিল?
শনিবার সঞ্জু কর্মকার নামে এক প্রয়াত তৃণমূল কর্মীর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে এবং সমবেদনা জানাতে সোনারপুরে গিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখান থেকে ফেরার পথেই কামালগাছি সিগন্যালের কাছে তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে ডিম ও কাদা ছোড়ার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার জেরে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায় এবং সাংসদ নিজেও শারীরিকভাবে অত্যন্ত বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন।
কেন হাসপাতালগুলি তাঁকে ভর্তি নিতে অস্বীকার করল?
তৃণমূল সুপ্রিমোর দাবি অনুযায়ী, রাজনৈতিক চাপের কারণেই বেসরকারি হাসপাতালগুলি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হাসপাতালের প্রধানদের ওপর বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন করে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল যাতে কোনওভাবেই ডায়মন্ড হারবারের সাংসদকে সেখানে ভর্তি রেখে চিকিৎসা না করানো হয়।
এখন কেমন আছেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ?
আপাতত বাড়িতে স্যালাইন এবং ব্যথার ওষুধের মাধ্যমে তাঁর চিকিৎসা চলছে। গত রাতের তুলনায় এখন তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও চিকিৎসকেরা তাঁকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন এবং সার্বিক পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছেন।
