স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা ও কার্ড ব্যবহারের নিয়মাবলি

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের প্রতিটি পরিবার বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসা পেতে পারেন। এই কার্ডের সুবিধা, আবেদনের যোগ্যতা এবং ক্যাশলেস চিকিৎসার খুঁটিনাটি জানতে আমাদের এই প্রতিবেদনটি পড়ুন।

পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাজ্য সরকারের একটি অনন্য উদ্যোগ হলো স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্প। আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলেও যাতে উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা থেকে কেউ বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যেই এই জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সূচনা। আপনি কি জানেন এই কার্ডের মাধ্যমে বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসা সম্ভব? আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা এই প্রকল্পের খুঁটিনাটি সুবিধা, আবেদনের যোগ্যতা এবং স্মার্ট কার্ড ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে শুরু হওয়া স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা এখন রাজ্যের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছে। এটি এমন একটি স্বাস্থ্য বিমা যেখানে সাধারণ মানুষকে কোনো প্রিমিয়াম দিতে হয় না, অথচ বিশাল অংকের চিকিৎসার নিশ্চয়তা মেলে। বিশেষ করে পরিবারের মহিলাদের ক্ষমতায়নের কথা মাথায় রেখে এই কার্ড বাড়ির বড় মহিলার নামে ইস্যু করা হয়। নিচে এই প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই স্বাস্থ্য প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য হলো রাজ্যের প্রতিটি মানুষের কাছে উন্নত এবং আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া। অনেক সময় দেখা যায়, পরিবারের কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে টাকার অভাবে সঠিক চিকিৎসা করানো সম্ভব হয় না। সেই কঠিন সময়ে স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা মানুষকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। এই কার্ড হাতে থাকলে বেসরকারি হাসপাতালেও একদম বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়া যায়।

আগে অনেক সরকারি প্রকল্প থাকলেও সেগুলোতে নানা জটিলতা থাকত, কিন্তু এই প্রকল্পটি অত্যন্ত সহজ এবং জনবান্ধব করে তোলা হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যের প্রায় কয়েক কোটি পরিবার এই পরিষেবার অন্তর্ভুক্ত। এই কার্ডের মাধ্যমে রাজ্যের সরকারি এবং তালিকাভুক্ত অসংখ্য বেসরকারি নার্সিংহোমে ক্যাশলেস অর্থাৎ নগদ টাকা ছাড়াই চিকিৎসার সুবিধা ভোগ করা যাচ্ছে।

বার্ষিক ৫ লক্ষ টাকার বিমা কভারেজ ও ক্যাশলেস পরিষেবা

এই প্রকল্পের সবথেকে বড় আকর্ষণ হলো এর আর্থিক সুরক্ষা। প্রতিটি পরিবার প্রতি বছর ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার খরচ সরকারের থেকে পেয়ে থাকে। আপনার যদি স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা নেওয়ার জন্য স্মার্ট কার্ডটি থাকে, তবে হাসপাতালের কাউন্টারে সেটি জমা দিলেই আপনার চিকিৎসার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। এখানে কোনো নগদ টাকা লেনদেনের প্রয়োজন পড়ে না, যার ফলে সাধারণ মানুষের হয়রানি অনেকটাই কমেছে।

এই ৫ লক্ষ টাকা শুধুমাত্র হাসপাতালের বেড ভাড়ার জন্য নয়, বরং অপারেশনের খরচ, ওষুধের খরচ এবং বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার খরচও এর অন্তর্ভুক্ত। সরকার সরাসরি হাসপাতালের সাথে এই খরচ মিটিয়ে দেয়, যার ফলে রোগীকে বা তার পরিবারকে পকেটের টাকা খরচ করতে হয় না। একেই বলা হয় ক্যাশলেস চিকিৎসা পরিষেবা।

পরিবারের সদস্য সংখ্যা ও বয়সের কোনো ঊর্ধ্বসীমা নেই

অনেকে মনে করেন বিমা মানেই হয়তো পরিবারের সীমিত কয়েকজন সদস্য সুবিধা পাবেন। কিন্তু এই সরকারি উদ্যোগের ক্ষেত্রে বিষয়টি একদম আলাদা। এখানে পরিবারের সদস্য সংখ্যার ওপর কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। স্বামী, স্ত্রী, সন্তান ছাড়াও বাবা-মা এবং শ্বশুর-শাশুড়িকেও এই কার্ডের আওতায় আনা যায়। এমনকি পরিবারের কোনো সদস্যের বয়স যদি অনেক বেশি হয়, তবুও তিনি সমানভাবে স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা পাবেন।

নিচে এই প্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হলো:

বিশেষত্ববিস্তারিত তথ্য
বার্ষিক কভারেজপরিবার প্রতি ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত
প্রিমিয়ামসম্পূর্ণ বিনামূল্যে (সরকার বহন করে)
কার্ডের মালিকানাপরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলার নামে
চিকিৎসার ধরনক্যাশলেস এবং পেপারলেস
হাসপাতালের ধরনসরকারি ও তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতাল

প্রি-এগজিটিং বা পুরনো রোগের চিকিৎসা সুবিধা

সাধারণত বেসরকারি কোনো স্বাস্থ্য বিমা কিনলে দেখা যায়, পুরনো কোনো রোগ থাকলে তার সুবিধা পেতে কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু আমাদের রাজ্যে প্রচলিত স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা পেতে গেলে আপনার কোনো দীর্ঘদিনের অসুখ থাকলেও তা প্রথম দিন থেকেই কভার করা হয়। অর্থাৎ, কার্ড পাওয়ার পর যদি দেখা যায় কারো হৃদরোগ বা কিডনির সমস্যা আগে থেকেই ছিল, তবে তিনিও এই কার্ডের মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা করাতে পারবেন।

এটি একটি অত্যন্ত মানবিক পদক্ষেপ কারণ ক্যানসার বা হার্ট সার্জারির মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা অনেক সময় সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে থাকে। সেই সমস্ত কঠিন রোগের চিকিৎসা এখন সরকারি ও বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালে কোনো বাধা ছাড়াই করা সম্ভব হচ্ছে।

প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং আবেদনের প্রক্রিয়া

আপনি যদি এখনও এই কার্ড না বানিয়ে থাকেন, তবে আপনার নিকটবর্তী ‘দুয়ারে সরকার’ ক্যাম্পে গিয়ে যোগাযোগ করতে পারেন। এর জন্য মূলত আধার কার্ড, ভোটার কার্ড এবং রেশন কার্ডের প্রয়োজন হয়। আবেদন অনুমোদিত হওয়ার পর দ্রুত স্মার্ট কার্ড প্রদান করা হয়।

এই প্রকল্পের বিশেষ কিছু সুবিধার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • হাসপাতালে ভর্তির আগে ও পরের ওষুধের খরচ।
  • ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার খরচ।
  • কার্ড থাকলেই ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন পরিষেবা।
  • মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে হাসপাতালের তথ্য জানার সুবিধা।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQs)

স্বাস্থ্য সাথী কার্ড কি পশ্চিমবঙ্গের বাইরে কাজ করে?

হ্যাঁ, এই প্রকল্পের অধীনে থাকা বেশ কিছু নির্দিষ্ট হাসপাতাল রাজ্যের বাইরেও চিকিৎসা সুবিধা দিয়ে থাকে। তবে মূলত পশ্চিমবঙ্গের সব সরকারি এবং তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালে এই স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায়।

একটি কার্ডে কি পরিবারের সবাই চিকিৎসা করাতে পারবে?

হ্যাঁ, পরিবারের সকল সদস্য যাদের নাম ওই কার্ডে বা তালিকায় নথিবদ্ধ আছে, তারা প্রত্যেকেই ৫ লক্ষ টাকার বিমা কভারেজের অধীনে চিকিৎসা পাওয়ার যোগ্য। সদস্য সংখ্যা নিয়ে কোনো কড়াকড়ি নেই।

কার্ড হারিয়ে গেলে কী করণীয়?

যদি আপনার স্মার্ট কার্ডটি হারিয়ে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়, তবে স্থানীয় বিডিও অফিস বা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে যোগাযোগ করে নতুন কার্ডের জন্য আবেদন করতে হবে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ফর্ম জমা দিলে নতুন কার্ড পাওয়া সম্ভব।

স্মার্ট কার্ডের ব্যবহার ও আধুনিক প্রযুক্তি

এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তি নির্ভর। অর্থাৎ, এখানে কাগজের কাজ নেই বললেই চলে। প্রতিটি কার্ডের সাথে বায়োমেট্রিক তথ্য যুক্ত থাকে, যা জালিয়াতি রোধ করতে সাহায্য করে। যখনই কোনো রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, তার কার্ডটি সোয়াইপ করার সাথে সাথে সরকারের পোর্টালে তথ্য পৌঁছে যায়। এই স্বচ্ছতার কারণেই স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পের সুবিধা সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে এবং মাঝপথে কোনো দুর্নীতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে না।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি ডেডিকেটেড মোবাইল অ্যাপও তৈরি করা হয়েছে যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ নিজেদের ব্যালেন্স চেক করতে পারেন এবং আশেপাশের কোন হাসপাতালে এই কার্ড গ্রহণ করা হয় তার তালিকাও দেখতে পারেন। এটি বর্তমান ডিজিটাল যুগের এক অনন্য উদাহরণ।

Leave a Comment

Created with ❤
Exit mobile version