টলিউডের একসময়ের চর্চিত জুটি রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রিয়াঙ্কা সরকারের সম্পর্কের সমীকরণ বরাবরই এক রহস্যময় রোমান্টিক থ্রিলারের মতো। পর্দার ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবির সেই অবুঝ প্রেম বাস্তবেও পা রেখেছিল বিয়ের পিঁড়িতে। যদিও সময়ের সাথে সাথে তাঁদের সম্পর্কে অনেক ঝড়-ঝাপটা এসেছে, তবুও এই দুই তারকার বিয়ের দিনটির বিশেষ মুহূর্তগুলো আজও ভক্তদের মনে এক আলাদা জায়গা দখল করে রেখেছে। সম্প্রতি নিজের লেখায় বিয়ের আসরের সেই অদ্ভুত এবং মজার অভিজ্ঞতাগুলো ভাগ করে নিয়েছেন অভিনেতা নিজে।
এক নজরে
রাহুল প্রিয়াঙ্কার বিয়ের গল্প এবং অদ্ভুত সেই অভিজ্ঞতার শুরু
রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কার সম্পর্কের শুরুটা হয়েছিল রাজ চক্রবর্তীর হাত ধরে। রূপালি পর্দার সেই প্রেম যখন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করল, তখন ভক্তদের উন্মাদনার শেষ ছিল না। তবে রাহুল প্রিয়াঙ্কার বিয়ের গল্প কিন্তু মোটেই কোনো গম্ভীর চিত্রনাট্যের মতো ছিল না, বরং তা ছিল হাসি-ঠাট্টা আর কিছু অদ্ভুত অভিজ্ঞতায় মোড়া। অভিনেতা তাঁর নিজের বই ‘রাহুলের স্ক্র্যাপবুক’-এ বিয়ের সেই বিশেষ দিনটির কথা তুলে ধরেছেন। যেখানে তিনি জানিয়েছেন যে, ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে তাঁদের এই চার হাত এক হয়েছিল।
দীর্ঘ দুই বছর লিভ-ইন সম্পর্কে থাকার পর তাঁরা দুজনেই যখন বুঝতে পারেন যে একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতা এতটাই বেড়েছে যে এখন সাত পাকে বাঁধা পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে, ঠিক তখনই বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়। ১৯শে নভেম্বর তারিখটি বিয়ের জন্য স্থির করা হয় এবং রাহুল-প্রিয়াঙ্কা দুজনেই কোমর বেঁধে নেমে পড়েন তোড়জোড়ে। মজার ব্যাপার হলো, সেই সময়ে তাঁদের বিয়ের লাইভ কভারেজ করার জন্য একটি নিউজ চ্যানেল পর্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করেছিল, যা তৎকালীন টলি-পাড়ায় বেশ শোরগোল ফেলে দিয়েছিল।
বিয়ের আসরের সেই অদ্ভুত কিছু কাণ্ডকারখানা এবং বিশৃঙ্খলা
বিয়ের আসর মানেই তো আনন্দ আর হুল্লোড়, কিন্তু রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কার ক্ষেত্রে তা মাঝে মাঝে অস্বস্তিকরও হয়ে উঠেছিল। রাহুল লিখেছেন যে, বিয়ের দিন ক্যামেরার সামনে মুখ দেখানোর জন্য তাঁদের কিছু আত্মীয় এবং পাড়ার লোক যে পরিমাণ হুড়োহুড়ি শুরু করেছিলেন, তা দেখে তিনি নিজেও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। রাহুল প্রিয়াঙ্কার বিয়ের গল্প এমন অনেক টুকরো ঘটনায় সমৃদ্ধ যেখানে সাধারণ মানুষের তারকাদের প্রতি অমোঘ আকর্ষণ ধরা পড়েছিল।
অভিনেতা মজার ছলে জানিয়েছেন, তাঁর এক দূর সম্পর্কের জামাইবাবু বিয়ের মণ্ডপে রাহুলের ঘাড়ের ওপর দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন যাতে তাঁকে ক্যামেরার ফ্রেমে দেখা যায়। এখানেই শেষ নয়, সেই আসরে উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক এবং জিতের মতো সুপারস্টারেরাও। তাঁদের দেখে পরিস্থিতি আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। রাহুলের মতে, প্রণাম করতে গিয়ে পাড়ার এক দিদি উত্তেজনার বশে রঞ্জিত মল্লিকের পা প্রায় খিমচে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে অভিনেতা জিতের জামার হাতা ধরে তাঁর ভাইপো এমনভাবে ঝুলছিল যে জিতের অবস্থাও নাজেহাল হয়ে গিয়েছিল।
সেলিব্রিটিদের উপস্থিতিতে বিয়ের আমেজ যখন চরম সীমায়
টলিউডের প্রথম সারির তারকাদের আগমনে রাহুল প্রিয়াঙ্কার বিয়ের গল্প এক অন্য মাত্রা পেয়েছিল। সেই সময়কার বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় দুই মুখ যখন বাস্তব জীবনে জুটি বাঁধছেন, তখন বিনোদন জগতের অনেকেই সেখানে আমন্ত্রিত ছিলেন। রাহুলের লেখনী অনুযায়ী, বিয়ের দিন বর-বউয়ের থেকেও বেশি মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছিলেন আমন্ত্রিত তারকারা। বিশেষ করে অভিনেতা জিতের আশেপাশে থাকা ভক্তদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল বাড়ির লোকেদের।
অভিনেতা জানিয়েছেন, বিয়ের সেই বিশেষ দিনটিতে প্রিয়াঙ্কার সাজও ছিল দেখার মতো। ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবির সেই ছোট্ট পল্লবী থেকে বেনারসী পরা নতুন বউ— প্রিয়াঙ্কার সেই রূপ পরিবর্তন দর্শকদের মোহিত করেছিল। তবে বিয়ের সেই হইচই আর বিশৃঙ্খলার মধ্যেও তাঁদের দুজনের ভালোবাসা ছিল অটুট। রাহুল তাঁর বইতে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, সেলিব্রিটি হয়েও বিয়ের পিঁড়িতে তাঁরাও আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই নানা বিড়ম্বনায় পড়েছিলেন।
রাহুলের জবানিতে বিয়ের বিশেষ মুহূর্তের কিছু অনুভূতি
বিয়ের দিনটির অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে অভিনেতা রাহুল জানিয়েছেন যে, জীবনের এই বিশেষ পদক্ষেপটি নেওয়ার সময় তাঁর মনে মিশ্র অনুভূতি ছিল। বিয়ের আগে তাঁরা বেশ কয়েক বছর একসঙ্গে কাটিয়েছিলেন, ফলে একে অপরকে চেনার কোনো খামতি ছিল না। তবুও শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজ ও পরিবারের সামনে সেই সম্পর্কের স্বীকৃতি পাওয়া তাঁদের কাছে ছিল পরম তৃপ্তির। অভিনেতা তাঁর লেখায় বারবার জোর দিয়েছেন যে, বিয়ের দিনটি কেবল তাঁর এবং প্রিয়াঙ্কার ছিল না, বরং তা ছিল তাঁদের চারপাশের সেই বিশৃঙ্খল অথচ মজার মানুষগুলোর।
আসলে রাহুল প্রিয়াঙ্কার বিয়ের গল্প যতটা প্রেমের ছিল, ততটাই ছিল হাসির খোরাক জোগানো কিছু ঘটনার সমষ্টি। অভিনেতা মনে করেন, বিয়ে মানেই এক বড় উৎসব যেখানে বর-বউ ছাড়া বাকি সবাই বোধহয় বেশি মজা পান। তাঁদের বিয়ের লাইভ স্ট্রিমিং হোক বা ভিড়ের মধ্যে জিতের জামার হাতা টানাটানি— সব মিলিয়ে সেই রাতটি ছিল মনে রাখার মতো একটি জমকালো অনুষ্ঠান।
রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কার সম্পর্ক নিয়ে কিছু সাধারণ প্রশ্ন
রাহুল ও প্রিয়াঙ্কার বিয়ে কবে হয়েছিল?
২০১০ সালের ১৯শে নভেম্বর রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। বিয়ের আগে তাঁরা প্রায় দুই বছর একসাথে ছিলেন।
রাহুল তাঁর বইতে বিয়ের কোন মজার ঘটনার কথা লিখেছেন?
রাহুল তাঁর বইতে লিখেছেন যে, তাঁদের বিয়ের আসরে আমন্ত্রিত বড় তারকাদের দেখতে আসা ভিড় এতটাই উন্মত্ত ছিল যে অভিনেতা জিতের জামার হাতা ধরে কেউ ঝুলছিল এবং রঞ্জিত মল্লিককে প্রণাম করতে গিয়ে একজন তাঁর পা খিমচে দিয়েছিলেন।
কেন তাঁরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?
রাহুল জানিয়েছেন, দুই বছর একসাথে থাকার পর তাঁরা যখন অনুভব করেন যে একে অপরের সাথে থাকাটা একরকম অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখনই তাঁরা সামাজিকভাবে এক হওয়ার কথা ভাবেন।
বিয়ের আসরে নিউজ চ্যানেলের ভূমিকা কী ছিল?
রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কার জনপ্রিয়তা সেই সময় তুঙ্গে ছিল, তাই একটি নিউজ চ্যানেল সরাসরি তাঁদের বিয়ের আসর থেকে লাইভ কভারেজ করার প্রস্তাব দিয়েছিল।
সম্পর্কের চড়াই-উতরাই এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট
বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই তাঁদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তির মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল। একসময় তাঁদের এই রূপকথার সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার মুখে পৌঁছেছিল এবং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে সব অভিমান মুছে গেছে। তাঁদের একমাত্র সন্তান সহজের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কা আবার একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাহুল প্রিয়াঙ্কার বিয়ের গল্প যেমন মজার ছিল, তাঁদের ফিরে আসার গল্পটিও ঠিক ততটাই অনুপ্রেরণামূলক।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই পুরনো বিশৃঙ্খল বিয়ের স্মৃতিগুলো রাহুলের কাছে যেমন একরাশ হাসি নিয়ে আসে, প্রিয়াঙ্কার কাছেও সেগুলো জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের বিয়ের সেই ছবিগুলো আজও সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা গেলে ভক্তরা নস্টালজিক হয়ে পড়েন। রাহুল তাঁর লেখায় সেই বিয়ের রাতের ছোট ছোট খুঁটিনাটি খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের সম্পর্ককে আরও বেশি কাছের করে তুলেছে।
